kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

পশ্চিমবঙ্গ মনে করে তিস্তা চুক্তি ওদের স্বার্থের বিরুদ্ধে

২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন জানতে চেয়েছে কালের কণ্ঠ। নয়াদিল্লিতে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পশ্চিমবঙ্গ মনে করে তিস্তা চুক্তি ওদের স্বার্থের বিরুদ্ধে

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : সফর ভালোই হয়েছে। সাতটি সমঝোতা হলো। পাঁচটি প্রকল্প উদ্বোধন হলো। ভালো অগ্রগতি।

বিজ্ঞাপন

এখন আরো কাজ করতে হবে।

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের সম্পর্ক খুব ফলপ্রসূ পর্যায়ে চলে গেছে। অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা, কানেক্টিভিটি (সংযোগ), মানুষে মানুষে যোগাযোগই এ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। কারণ আমাদের দুই দেশেরই দারিদ্র্য, অশিক্ষার মতো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। উৎপাদনশীলতা, সমৃদ্ধি আনার জন্য উন্নয়ন দরকার। এর জন্য প্রয়োজনীয় সবই করা হচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : তিস্তা নিয়ে অগ্রগতির কোনো আশা কি দেখছেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : তিস্তার খসড়া চুক্তিতে পানির যে হিস্যা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পশ্চিমবঙ্গ সরকার মানবে বলে আমি মনে করি না। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দৃঢ় ধারণা হয়ে গেছে, তিস্তার পানিবণ্টনের প্রস্তাবিত ফর্মুলাটি ওদের স্বার্থের বিরুদ্ধে।

কালের কণ্ঠ : দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে চ্যালেঞ্জ আসলে কী কী?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : চ্যালেঞ্জ কিছু নিশ্চয় আছে। যেমন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানবপাচার, চোরাচালান, সন্ত্রাস। আবার যারা বাংলাদেশে ও ভারতে কাজ করে তাদের কেউ কেউ এদিক-ওদিক যায় এবং ধরাও পড়ে। ধরা পড়াটা দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা ও অন্যান্য সহযোগিতা যে আছে তার একটি নিদর্শন।

মূলত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক খুবই স্থিতিশীল, ভবিষ্যত্মুখী। এখন আবার শুরু হচ্ছে অনেক কিছু। কেননা কভিডের জন্য অনেক উদ্যোগ স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। তবে গত বছর মুজিববর্ষ, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী—দুজনই বাংলাদেশ সফর করেছেন। সম্পর্ক ভালোভাবেই এগোচ্ছে। একে এগিয়ে নেওয়ার আরো অনেক সম্ভাবনা আছে।

কালের কণ্ঠ : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাত্তরের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি সন্ত্রাস ও মৌলবাদ মোকাবেলায় দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসলে কী বলতে চেয়েছেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : সন্ত্রাস ও মৌলবাদ কিন্তু বিরাট বিপদ। আমরা মাঝেমধ্যেই দেখি, বাংলাদেশে উগ্রবাদীরা রাস্তায় নেমে আসে। এখানেও (ভারতে) লোকজন এমন চিত্রও দেখছে। ওদের এজেন্ডাটা কী তা তো আমরা সবাই জানি। এ কারণে আমাদের একসঙ্গে এগুলো মোকাবেলা করতে হবে।

কালের কণ্ঠ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লির বিমানবন্দরে ভারতের একজন প্রতিমন্ত্রীর অভ্যর্থনা জানানো নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে। এটাকে কিভাবে দেখেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : বাংলাদেশে ভারতবিরোধী একটি গোষ্ঠী আছে। ভারত কিছু করলেই তারা সমালোচনা করে। তারা পুরনো চিন্তাধারায় চলে। তারপর খানিকটা রাজনৈতিক বিষয়ও আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারবিরোধীরা তো এর সমালোচনা করবেই।

বাস্তবতা হলো—ভারতে যে প্রটোকল চর্চা করা হয় তা মেনেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী খুব ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানাতে যান। ভারতে রাষ্ট্রীয় অতিথিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয় রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনের ফোরকোর্টে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানেই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

কালের কণ্ঠ : আপনি ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। তখনকার তুলনায় এখন সম্পর্ক কতটা বদলেছে?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : অনেক বদলেছে। কানেক্টিভিটি অনেক বেড়েছে। আমার সময় দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী ট্রেন চালু হয়েছিল। এখন তো আরো কত ট্রেন হয়েছে। কত বাস চলছে। রেলওয়ের কানেক্টিভিটি বেড়েছে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের বাণিজ্যের হিসাব দেখলে অবাক লাগবে, কভিড মহামারির বাণিজ্য কতটা বেড়েছে।

এখন জ্বালানি নিয়ে কথা হচ্ছে। নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল যাবে বাংলাদেশে। ট্রেনেও আসতে পারে জ্বালানি। এসব অগ্রগতি হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো হবে। ঝাড়খণ্ড থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ যাবে। বিদ্যুৎ না থাকলে কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নতি দ্রুত হয় না। তাই বিদ্যুৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কালের কণ্ঠ : দুই দেশের মধ্যে আস্থা কতটা বেড়েছে?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : আস্থা তো বেড়েছেই। আস্থা তো ধাপে ধাপে বাড়ে। ২০০৯ সাল থেকেই বাড়ছে। সে সময় আমি যখন হাইকমিশনার ছিলাম বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছি। ভুটান, নেপালের সঙ্গে গ্রিড সংযোগ হচ্ছে। আস্থা না বাড়লে কি এগুলো হয়।

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতার কারণ কী বলে মনে করেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : আমি বলব, এটি একটি ঐতিহাসিক ধারা। অনেকে মেনে নিতে পারেনি, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। এ রকম মনোভাব যাদের আছে তারা তো স্বাভাবিকভাবেই ভারতবিরোধী হবে। আমি বলব, তাদের মনোভাব পাকিস্তানের কাছাকাছি।

কালের কণ্ঠ : সম্ভবত, ভারতের দিক থেকে চেষ্টা ছিল বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা কমিয়ে আনার। যারা সরকারের বাইরে আছে বা বিরোধী তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখার চেষ্টা হয়েছে। সেই উদ্যোগ সফল হলো না কেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : যোগাযোগ তো এখনো আছে। ওরাও আসা-যাওয়া করে। কথাবার্তা বলে। ওখানে (বাংলাদেশে) মৌলবাদী কিছু ব্যাপার আছে। যে নীতি বিএনপি-জামায়াত সরকার অনুসরণ করেছিল সেটাতে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সম্পর্কটাই প্রায় লাইনচ্যুত হয়ে গিয়েছিল।

আপনি যদি বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকেন আর ভারতের বিরুদ্ধে কাজ করেন, তাহলে সম্পর্কটা কিভাবে ভালো থাকবে? আপনি ভারতের ক্ষতি করবেন, ভারতে উগ্রবাদীদের অস্ত্র সরবরাহ করবেন, তখন কি সম্পর্ক ভালো থাকতে পারে? আমাদের তো আর কোনো চাহিদা ছিল না। তবে ওই পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে।

কালের কণ্ঠ : প্রতিবেশী হিসেবে বর্তমান সরকারের ব্যাপারে ভারতের মনোভাব কী?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : ভারতে চানক্যের সময় থেকে আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলে উন্নতি হবে না বা শান্তি, স্থিতিশীলতা থাকবে না। চীনের এখন ভাবসাব বদলে গেছে। চীন বিশ্বকে দেখাতে চায় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেক্কা দেবে, যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে তারাই সবচেয়ে বড় দেশ, বড় শক্তি হবে।

চীন নিজেকে বিশ্বের কেন্দ্র মনে করছে। চীনের ধারণা, সবাই তার আশপাশে। এখন চীন চেষ্টা করছে সব জায়গায় ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)’ বা অন্যান্য মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে। চীন কানেক্টিভিটিতেও চেষ্টা করছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধান হতে পারত যদি চীন সহযোগিতা করত।

কালের কণ্ঠ : রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারত কতটা সহযোগিতা করতে পারে?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : ভারত চেষ্টা করছে। আজকালকার দিনে আমরা তো আর মিয়ানমারে সামরিক অভিযান চালাতে পারি না। মিয়ানমারকে বলা হচ্ছে অনেক কিছুই। আমরা বলছি, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাড়িঘর বানিয়ে দেব। এখন মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীই তো সব চালাচ্ছে। সেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শেষ। তারা কিছুতেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় না।

তাই আমি মোটেও আশাবাদী নই। আমি জানি না, কিভাবে ওদের ওপর চাপ দেওয়া যায়। কেউই ওদের ওপর বেশি চাপ দিতে চায় না। সবচেয়ে বেশি চাপ দেওয়ার ক্ষমতা আছে চীনের। ওরাও তা করছে না।

কালের কণ্ঠ : চীনের স্বার্থ কী?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : চীন মিয়ানমারে বঙ্গোপসাগরের তীরে বন্দর নির্মাণ করছে। চীনের এখন কৌশলগত লক্ষ্য বদলে গেছে। সব জায়গায় চীন নিজের সুবিধা চায়। বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি বাড়াতে চায়। হাম্বানটোটা বন্দরে তাদের ‘গোয়েন্দা জাহাজ’ গেল। শ্রীলঙ্কাকে প্রায় পথে বসিয়েই দিয়েছে। শিগগিরই পাকিস্তান পথে বসবে। একবারে খপ্পরে পড়েছে ওরা।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী : আপনাকেও ধন্যবাদ।



সাতদিনের সেরা