kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিশেষ সাক্ষাৎকার

কিছু পানির ক্ষেত্রে আপত্তি থাকছে না, এটাই লাভ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন ছিল অন্যতম। তিস্তা নিয়ে এবারও কিছু হয়নি। এ বিষয়ে কথা বলেছেন নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজিব ঘোষ

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কিছু পানির ক্ষেত্রে আপত্তি থাকছে না, এটাই লাভ

কালের কণ্ঠ : কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এটা কিভাবে দেখছেন?

আইনুন নিশাত : চুক্তি শব্দটা এক রকম, ‘আন্ডাস্ট্যান্ডিং’ শব্দটা আরেক রকম। বাংলা ভাষায় অনেক শক্তি আছে, যেটা ইংরেজি ভাষায় নেই। আবার অনেক দুর্বলতাও আছে।

বিজ্ঞাপন

আমি এখানে ইংরেজি শব্দটাই বলতে চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। একটি ‘এমওইউ’ হয়েছে। এটা আহামরি কিছু হয়নি। ইংরেজিতে আবার ‘ট্রিটি’ শব্দটা আছে। গঙ্গাতে ট্রিটি হয়েছে, চুক্তি হয়নি। ইংরেজিতে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট’ আছে, ১৯৭৭ সালে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট’ হয়েছিল। প্রতিটা শব্দের অর্থ আলাদা। এমওইউ বাধ্যতামূলক কিছু নেই। এখানে শুধু সাহায্য করা হয়।

 

কালের কণ্ঠ : এই ‘সাহায্যতে’ বাংলাদেশ কেমন লাভবান হবে?

আইনুন নিশাত : ভারতের বরাক নদ আমাদের সীমানায় এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুই ভাগ হলো। আজ থেকে ১০০ বছর আগে দুই দিকেই প্রাকৃতিকভাবে অর্ধেক অর্ধেক পানি যেত। এখন প্রাকৃতিকভাবেই মুখটা একটু ঘুরে গেছে। কারো দোষ দিচ্ছি না। এখন ৮০ শতাংশ পানি আসে কুশিয়ারাতে আর ২০ শতাংশ পানি যায় সুরমাতে। কুশিয়ারার বাঁ দিকের তীরে ভারত, ডান দিকের তীরে বাংলাদেশ। এখন ডান দিক ভেঙে কুশিয়ারা বাংলাদেশে ঢুকছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ এই নদীতে পাঁচ কিলোমিটার সীমানা পায়। কুশিয়ারা থেকে ২০১১ সালে বাংলাদেশ পানি আনতে চাইলে ভারত আপত্তি জানায়। এই এমওইউয়ের মাধ্যমে ভারত পানি তোলার সম্মতি দিল।

 

কালের কণ্ঠ : নিজ সীমানা থেকে পানি তুলতে কি কোনো আইনি সমস্যা আছে?

আইনুন নিশাত : এখানে তো কেউ আইন মানেই না। এই নদীর পানি নেওয়ার জন্য সিলেটের রহিমপুরে যখন একটা খাল কেটে পানি বাংলাদেশের ভেতর আনবেন; নদীটা কিন্তু তখন পুরোপুরি বাংলাদেশে। ২০ কিলোমিটার দুই দেশের মধ্যে। এরপর আরো পাঁচ কিলোমিটার পুরোটা বাংলাদেশের। সেখানে যখন খাল কাটার কাজ শুরু হলো তখন বিএসএফ (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী) বাধা দিল। এই হচ্ছে সমস্যা। গঙ্গাতে শুকনা মৌসুমে পানি অপর্যাপ্ত। এখানে তো তা না। তাহলে তখন কেন বাধা দেওয়া হলো? তখন এই পানি নিজে নিজেই বাংলাদেশে এসেছে, ভারত কিন্তু দেয়নি। এখন এমওইউ করার মানে হচ্ছে ভারত বলছে, তুমি নিতে চাও দেড় শ কিউসেক নাও। আমি আর আপত্তি করব না। আর যদি চুক্তি হতো, ট্রিটি হতো হতো; তাহলে বিষয়টা হতো এমন যে এই পানি ভারত তার ভাগ থেকে দিল; কিন্তু এখানে তো বিষয়টা তা নয়।

 

কালের কণ্ঠ : ভারতের কেন আপত্তি?

আইনুন নিশাত : ভারতের উদ্বেগের কারণ হলো, শুকনা মৌসুমে যেন ভারতের জাহাজ চলাচলে সমস্যা না হয়। আমরা ভারতের জাহাজ ঢোকার অনুমতি দিয়েছি। যেটা ভৈরব বাজার দিয়ে কুশিয়ারা হয়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারে। দেড় শর পরিবর্তে ২০০ কিউসেক পানি তুললে সেই জাহাজ চলাচলে সমস্যা হতো। দেড় শ কিউসেক দেখেই ভারতের কোনো আপত্তি নেই।

 

কালের কণ্ঠ : সমঝোতা অনুযায়ী, ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে বাংলাদেশ। নদীতে কী পরিমাণ পানি আছে?

আইনুন নিশাত : বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে যে পানি আসত সেটার পরিমাণ... আজকে কুশিয়ারা দিয়ে ফেঞ্চুগঞ্জে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি আসছে। শুকনা মৌসুমে এটা কমে হয়ে যায় দুই আড়াই হাজার কিউসেক। প্রতিবছর তো সমান আসে না।

 

কালের কণ্ঠ : এখন বাংলাদেশের কতটুকু লাভ হলো?

আইনুন নিশাত : বাংলাদেশ এখন মাত্র পাঁচ হেক্টর জমিতে সেচ করতে চাচ্ছিল। এই একটা লাভই শুধু হলো। এটা খুব আহামরি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হয়নি। তবে এখন কিছু পানির ক্ষেত্রে ভারতের আপত্তি থাকছেন না, এটাই লাভ।

 

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদী নিয়ে আলোচনা হলেই তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে কথা হয়। এটা নিয়ে এবারও কিছু হলো না। আপনি কী বলবেন?

আইনুন নিশাত : এটা খুবই সোজা। ভারত উচ্চ পর্যায়ে বলেছে, এটা বাস্তবায়ন করবে। তিস্তাতে এখন শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের জন্য পর্যাপ্ত পানি নেই। কাজেই এখন যতটুকু পানি আছে সেটা দুজনের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার একটা পদ্ধতি; কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ কারণে এটা হচ্ছে না। তিস্তার পানি পেতে হলে আমাদের চেঁচামেচি করতে হবে। সেই চেঁচামেচি আমরা ঠিক মতো করতে পারছি না। ‘অ্যাগ্রিমেন্ট’ হয়ে আছে। এখন চেঁচামেচি করে ভারতের কাছ থেকে এটা আমাদের আদায় করে নিতে হবে।     

 

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। সবটা নিয়েই কি আলাদা করে আলোচনা করতে হবে? একসঙ্গে কি আলোচনার সুযোগ নেই?

আইনুন নিশাত : ১৯৮৫-৮৬ সালে ভারত সব নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিল। তখন আমি বলেছিলাম, প্রতিটা আলাদা করে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটি একসঙ্গে করা যেতে পারে আবার কোনোটা পুরোপুরিভাবে আলাদা। তাই সিদ্ধান্তটা ওসব বিবেচনা করেই নিতে হবে।   

 

কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আইনুন নিশাত : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ পানিবণ্টনের আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্য।



সাতদিনের সেরা