kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সাগরে নিম্নচাপ

১৭ ট্রলারডুবি দুই জেলের মৃত্যু নিখোঁজ অনেকে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২০ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



১৭ ট্রলারডুবি দুই জেলের মৃত্যু নিখোঁজ অনেকে

সাগর উত্তাল : নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ করে ট্রলার নিয়ে তীরে আশ্রয় নিয়েছেন। গতকাল পটুয়াখালীর কুয়াকাটার মৎস্যবন্দর আলীপুরের মহীপুর আড়তঘাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। বৈরী আবহাওয়ায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া কয়েকটি ট্রলার ডুবে গেছে। দুই জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে বেশ কিছু ট্রলার ও জেলে।

বিজ্ঞাপন

বহু ট্রলার সুন্দরবনসহ উপকূলে এসে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে।

নিম্নচাপের প্রভাবে সুন্দরবন, ভোলা, বাগেরহাট, নোয়াখালীসহ উপকূলীয় এলাকায় নদ-নদীর পানি এক থেকে দেড় ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলসহ চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে দমকা ঝোড়ো বাতাস ও বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে নিম্নাঞ্চল। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোকেও ২ ও ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখানো হয়েছে। আজ শনিবার রাত ১টা পর্যন্ত ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ওপর দিয়ে ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। বায়ুচাপ ও নিম্নচাপের কারণে উপকূলীয় খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।  

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে বিস্তারিত :

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের কাছে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ধমারচর এলাকায় গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ঝড়ের কবলে পড়ে এমবি সিরাজ নামের মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। ট্রলারে ১৬ জন জেলে ছিলেন। এঁদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন। অন্য একটি ট্রলারের জেলেরা ১২ জনকে উদ্ধার করেছেন। গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত দুজন নিখোঁজ ছিলেন।

নিহত দুই জেলে হচ্ছেন জাহাজমারা ইউনিয়নের আমতলী গ্রামের মাইন উদ্দিন এবং নতুন সুখচর গ্রামের মো. রাফুল। নিখোঁজ জেলেরা হচ্ছেন শরীফ (৩২) ও বেলাল (২৪)।

জানা যায়, গভীর সমুদ্র থেকে বৃহস্পতিবার রাতে ট্রলারটি তীরের উদ্দেশে ফিরছিল। সকালে উত্তাল সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে এটি ডুবে যায়। জোয়ারের তোড়ে ডুবে যাওয়া ট্রলারটি পাশের একটি চরে গিয়ে আটকে পড়ে। সেখানেই ক্ষতিগ্রস্ত ট্রলারের ভেতর থেকে মাইন উদ্দিন ও রাফুলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

কোস্ট গার্ড হাতিয়া স্টেশন কমান্ডার বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা সকালেই উদ্ধার অভিযানে যাই। নিখোঁজ দুই জেলের সন্ধান বিকেল ৫টা পর্যন্ত মেলেনি। তবে দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডুবে যাওয়া ট্রলারটি এখনো চরে আটকে আছে। ’

হাতিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাঞ্চন কান্তি দাশ বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে রয়েছে। নিখোঁজ জেলেদের কোস্ট গার্ডের সহায়তায় খোঁজা হচ্ছে। ’

বরগুনা প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ২৫ জেলেসহ এফবি মায়ের দোয়া ও এফবি আল্লাহর দান নামের দুটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুই ট্রলারে থাকা ২৫ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করেছেন স্থানীয় জেলেরা। উদ্ধার পাওয়া জেলেরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁরা এখন পাথরঘাটায় আছেন।

এফবি মায়ের দোয়া বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে এবং এফবি আল্লাহর দান গতকাল সকাল ১০টার দিকে ডুবে যায়। ট্রলার দুটির মালিক হলেন মজনু মিয়া ও জাফর সিকদার। তাঁদের বাড়ি তালতলী উপজেলার নিদ্রা এলাকায়।

এ ছাড়া পাথরঘাটা উপজেলার এফবি হাওলাদার নামের একটি ট্রলার ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা চৌধুরী। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে তিনটি ট্রলার ডুবেছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি নিখোঁজ আছে। সাগরে রয়েছে আরো বহু ট্রলার।

পাথরঘাটা কোস্ট গার্ডের স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা একটি ট্রলারডুবির খবর পেয়েছি, সেটা বরগুনা জেলার নয়। সাগর খুব উত্তাল থাকায় আমরা উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে পারছি না। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আমরা উদ্ধার অভিযান চালাব। ’

বাগেরহাট ও শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ছয়টি ফিশিং ট্রলারডুবি এবং একটি ট্রলার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার ভোররাত থেকে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালীসংলগ্ন সাগরের পক্ষীদিয়া, আমবাড়িয়া ও দুবলার চরসংলগ্ন ভেদাখালী এলাকায় এ ঘটনাগুলো ঘটে। একটি ট্রলারের ২০ জেলের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১৯ জেলে এখনো নিখোঁজ।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের অফিস খাল, ছোট ভেদাখালী, বড় ভেদাখালী ও কচিখালী এলাকার বনের বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে পাঁচ শতাধিক ট্রলার আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া সমুদ্রের কাছাকাছি কলাপাড়া উপজেলার নিদ্রা ছখিনা ও মহিপুর এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে আরো কয়েক শ ট্রলার। ঝড়ের কবলে পড়ে বিভিন্ন এলাকার বহু ট্রলার ডুবে গেছে। বন বিভাগ এবং শরণখোলা ও পাথরঘাটা মৎস্যজীবী সংগঠন সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের দুবলার চর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিলীপ কুমার মজুমদার জানান, গতকাল ভোর থেকে সুন্দরবনসহ দুবলার চর এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া শতাধিক ট্রলার নিয়ে সহস্রাধিক জেলে সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।

রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, গতকাল বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া উপজেলার চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের চরলতা গ্রামের ইদ্রিস মুন্সির মালিকানাধীন জেলে ট্রলার ১৩ জন মাঝিমাল্লাসহ ডুবে যায়। ট্রলার মালিক ইদ্রিস মুন্সির ভাই ইলিয়াস মুন্সি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ট্রলারে থাকা প্রত্যেক মাঝিমাল্লাকে অন্য ট্রলারের সাহায্যে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা সুন্দরবনে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে ডুবে যাওয়া ট্রলারের কোনো সন্ধান মেলেনি।

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, কুয়াকাটাসংলগ্ন উত্তাল বঙ্গোপসাগরে গতকাল পাঁচটি মাছ ধরা ট্রলার জেলেদের নিয়ে ডুবে গেছে। এর মধ্যে এফবি কুলসুম নামের ট্রলারটিতে ১৮ জেলে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ রয়েছেন অন্য জেলেরা।

কুয়াকাটা আলীপুর মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আনসার উদ্দিন মোল্লা জানান, এফবি মরিয়ম ট্রলারটি ১৪ জেলেসহ নিখোঁজ রয়েছে। এফবি কুলসুম, এফবি মামণি-৩, এফবি সাইফুল, আল মামুন ও এফবি আশ্রাফুল ট্রলারের নিখোঁজ রয়েছেন ১৪ জন জেলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের দক্ষিণ চরমোন্তাজ গ্রামের আজহারের ১২ জন, হালিম খানের ১৪ জন, মধ্য চরমোন্তাজের খলিল মুন্সির ১৪ জন, রহম আলী মৃধার ১৩ জন, বড় বাইশদিয়া ইউনিয়নের গাইয়াপাড়া গ্রামের আলাউদ্দিন গাজীর ১৩ জন এবং চরগঙ্গা গ্রামের আজহার দস্তুরের ১১ জন মাঝিমাল্লাসহ তাঁদের ছয়টি ট্রলার নিখোঁজ হয়। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ওই সব ট্রলার ও মাঝিমাল্লার সন্ধান মেলেনি।

এ ব্যাপারে রাঙ্গাবালী থানার ওসি নুরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি এবং কোস্ট গার্ডের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলব। ’ 

ভোলা প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল সকাল থেকে ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর পানি এক থেকে দেড় ফুট বৃদ্ধি পায়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস বইতে থাকে। জেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে দু-তিন ফুট জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পায়।

সমুদ্র উত্তাল থাকায় বঙ্গোপসাগরে থাকা মাছ ধরার ট্রলারগুলো গতকাল সকাল থেকে ভোলার মাছঘাটে আসতে শুরু করে। বিকেল পর্যন্ত ২০০ থেকে ২৫০টি ট্রলার ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটে ভেড়ে। তবে এ সময়ে সাগরে কোনো ট্রলারডুবির খবর পাওয়া যায়নি।

সামরাজ মাছঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী ও বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. তোফায়েল আহমেদ জানান, সামরাজ ঘাট থেকে ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকার ৪০০ থেকে ৫০০ ট্রলার গভীর সাগরে মাছ শিকারে যায়। বিকেল পর্যন্ত ২০০ থেকে ২৫০টি ট্রলার ঘাটে এসেছে। এ ছাড়া সমুদ্রে থাকা বাকি ট্রলারগুলো চট্টগ্রামসহ নিকটস্থ উপকূলে নিরাপদে অবস্থান করছে।

সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে ভোলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে দু-তিন ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়িবাঁধের বাইরের নিচু এলাকায়ও পানি বেড়েছে। ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর, চরফ্যাশনের ঢালচর, চর কুকরিমুকরি, চর নিজাম, চর পাতিলা, জাহানপুর ভাসানী আদর্শ গ্রাম, চর মাদ্রাজ ও হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের কিছু অংশ, মনপুরার কলাতলীর চর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার মানুষ চরম দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। তবে গতকাল রাতে পানি আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় লোকজন।

ভোলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক মো. মাহবুবুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ভোলায় ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভোলায় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার। এ বৈরী আবহাওয়া আজ শনিবার পর্যন্ত থাকবে বলেও জানান তিনি।

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান জানান, গতকাল দুপুর পর্যন্ত ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর পানি বিপত্সীমার নিচেই প্রবাহিত হচ্ছে এবং ভোলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে।



সাতদিনের সেরা