kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে, ব্যয় বেড়েছে

তামজিদ হাসান তুরাগ   

২০ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে, ব্যয় বেড়েছে

চলমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের নানা উপায় বেছে নিচ্ছে। জনগুরুত্বপূর্ণ খুব জরুরি প্রকল্প ছাড়া অন্য কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। এর পরও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এমন কিছু প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তুলনামূলকভাবে যেগুলোর প্রাক্কলিত ব্যয় বেশি।

একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা কমানো গেলেও কমছে না উন্নয়ন ব্যয়।

বিজ্ঞাপন

এসব প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর অর্থায়নও রয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, পরিকল্পনা কমিশন এখন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে দেশের বাইরে থেকে সরঞ্জাম আমদানি করতে হচ্ছে, সেসবের অনুমোদন দিচ্ছেন না একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২৩৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ফাইভজি প্রযুক্তি’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২ আগস্ট একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করে পরিকল্পনা কমিশন। যেহেতু এই প্রকল্পের ৮০ শতাংশ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে ডলার দিয়ে কিনে আনতে হবে, কাজেই ব্যয় সংকোচনে প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে ফিরিয়ে দেয় একনেক।

ওই দিন একনেক সভা-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আমরা কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রকল্পের ৮০ শতাংশ ব্যয় ফরেন কারেন্সির (বৈদেশিক মুদ্রা) মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। এতে রিজার্ভ থেকে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তাই এটা স্থগিত করা হয়েছে। এটা পরে বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য একনেক সভা থেকে বৈদেশিক ঋণ খুঁজতে বলা হয়েছে। ’

বিদায়ি অর্থবছরের (২০২১-২২) সর্বশেষ তিন একনেক সভা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই অর্থবছরে জুন মাসের তিন একনেক সভায় মোট ২৯টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এসব প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নসহ মোট অর্থায়ন হয়েছিল ১৫ হাজার ৭২৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। নতুন অর্থবছরে (২০২২-২৩) সর্বশেষ তিন একনেক সভায় ২১টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা কমলেও কমেনি উন্নয়ন ব্যয়। এসব প্রকল্পে সরকারের বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণসহ মোট অর্থায়ন ২০ হাজার ৩৬৮ কোটি ১২ লাখ টাকা।

কৃচ্ছ সাধনের এমন সময়ে তুলনা করে দেখা গেছে, দুই অর্থবছরে একই সময়ে অনুমোদিত সরকারি প্রকল্পে উন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে চার হাজার ৬৪০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তা পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকেই।

চলতি অর্থবছরে অনুমোদিত ২১টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টির  সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে। বাকি ১১টি নতুন প্রকল্প।

একনেক সভাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকার এখন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিচ্ছে মূলত সড়ক প্রশস্তকরণ ও সেতু নির্মাণের প্রকল্পগুলোকে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অতি জরুরি মনে করছে কমিশন। তবে বিদ্যুতের এই সংকটময় মুহূর্তে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উন্নয়নমূলক কোনো প্রকল্প নিয়ে আসেনি কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এখন সরকার প্রকল্প অনুমোদনে খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প, প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমণ, ড্রেজিং ও ড্রেজার কেনাসংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন না দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। উদ্ভাবন ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত প্রকল্পেরও অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। তবে যেসব পুরনো প্রকল্পকে সরকার অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, সেগুলোকে অনুমোদন দিচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প অনুমোদন ও সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় পরিকল্পনাসচিব মো. মামুন-আল-রশীদের সঙ্গে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বর্তমান কমিশন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে সতর্ক হচ্ছে। অতীব প্রয়োজনীয় প্রকল্প ছাড়া কোনো প্রকল্প অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। ’

এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘প্রকল্পে কৃচ্ছ সাধনের কোনো উপায় নেই, তবে আমরা আগে থেকে প্রকল্পের ব্যয়ের বিষয়টি বেশি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। আর বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক অবস্থানে আছি। বেশি প্রয়োজন না হলে আমরা বিদেশ ভ্রমণ বাতিল করছি। ’ 

কমিশন বলছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয়েও কাটছাঁট করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় চলমান প্রকল্পগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণিতে ভাগ করেছে। ৬৪৬টি প্রকল্প রাখা হয়েছে এ শ্রেণিতে। এগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে। বরাদ্দে কোনো কাটছাঁট করা হবে না। ‘বি’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে ৬৩৬টি প্রকল্প।

এসব প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সরকারি (জিওবি) অংশের ২৫ শতাংশ অর্থ কাটা হবে। ‘সি’ শ্রেণিতে থাকা ৯০টি প্রকল্পে কোনো অর্থ ছাড় দেওয়া হবে না। চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার দুই লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দে কাটছাঁটের মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে বলে আশা করছে সরকার।

পরিকল্পনা কমিশনের বর্তমান পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে আমরা একটা বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। দেশের অর্থনীতিতে একটা বিশেষ চাপ আছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা ঠিকই আছে। তবে একই সঙ্গে সরকারের যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্প চলমান, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। যাতে সেই প্রকল্পগুলোর কাজ সঠিক সময়ে সুশাসনের সঙ্গে শেষ করা হয়। পাশাপাশি সংশোধিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে জবাবদিহি থাকা উচিত যে কেন এসব প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে। ’



সাতদিনের সেরা