kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৩০ সফর ১৪৪৪

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব

৫০ টনের ক্রেনে ৭০ টনের গার্ডার তুলছিলেন সহকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



 ৫০ টনের ক্রেনে ৭০ টনের গার্ডার তুলছিলেন সহকারী

রাজধানীর উত্তরায় গার্ডার পড়ে প্রাইভেট কার চাপা দেওয়ার ঘটনার সময় ক্রেনটি চালাচ্ছিলেন চালকের সহকারী রাকিব হোসেন। জসীমউদ্দীন সড়কে নির্মাণাধীন বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ক্রেন থেকে এই গার্ডার পড়ে শিশুসহ প্রাইভেট কারের পাঁচজন আরোহী নিহত হয়।

দুর্ঘটনার সময় সহকারীকে (হেল্পার) বাইরে থেকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন ক্রেনের মূল চালক (অপারেটর) আল আমিন। এ ছাড়া অন্যদের দায়িত্বহীনতার পাশাপাশি ব্যাপক অনিয়মের কারণেই পাঁচ নিরপরাধ ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

এ দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।

গত দুই দিনে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-১, ৩, ৪, ৬ ও র‌্যাব-১২-এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, কালশী, ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও গাজীপুর এবং সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা এই মর্মান্তিক ঘটনায় তাঁদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানায় র‌্যাব।

গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিরা হলেন ক্রেনের চালক মো. আল আমিন হোসেন ওরফে হৃদয় (২৫), তাঁর সহকারী (হেল্পার) রাকিব হোসেন (২৩), দুর্ঘটনাস্থলে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ফোর ব্রাদার্স গার্ড সার্ভিসের ট্রাফিকম্যান মো. রুবেল (২৮), মো. আফরোজ মিয়া (৫০), ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সেফটি ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলফিকার আলী শাহ (৩৯), হেভি ইকুইপমেন্ট সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত ইফসকন বাংলাদেশ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. ইফতেখার হোসেন (৩৯), হেড অব অপারেশনস মো. আজহারুল ইসলাম মিঠু (৪৫), ক্রেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিল্ড ট্রেড কম্পানির বিপণন ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং ম্যানেজার) তোফাজ্জল হোসেন ওরফে তুষার (৪২), প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন মৃধা (৩৩) ও মো. মঞ্জুরুল ইসলাম (২৯)।

তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, হেল্পার রাকিব দুর্ঘটনার সময় ক্রেনটি চালাচ্ছিলেন। বাইরে থেকে তাঁকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন ক্রেন অপারেটর আল আমিন। দুর্ঘটনার পর তাঁরা দুজনই সেখান থেকে পালিয়ে যান।  

ক্রেনের মূল চালক আল আমিনের হালকা গাড়ি চালানোর অনুমোদন থাকলেও ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ নেই। এ তথ্য জানিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, আল আমিন ২০১৬ সালে ক্রেন চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে দু-তিনটি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করেন। গত মে মাসে তিনি বিআরটি প্রকল্পে ক্রেন অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত লাভের জন্য অল্প পারিশ্রমিকে ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছাড়া আল আমিনকে অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেন। তাঁর সহকারী রাকিব তিন মাস আগে যোগ দেন। তাঁর ক্রেন চালনার কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।

দুর্ঘটনার দিন আল আমিন ও রাকিব দুপুর ২টা থেকে ক্রেন চালনা শুরু করেন। র‌্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, একটি গার্ডার স্থাপন শেষে দ্বিতীয় গার্ডার স্থাপনের সময় ক্রেনের ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ওজনের গার্ডার তোলার কারণে ক্রেনটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে গার্ডারটি প্রাইভেট কারের ওপর ছিটকে পড়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। দুর্ঘটনার পর তাঁরা দুজন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিআরটি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গেজুবা গ্রুপ কম্পানির (সিজিজিসি) তত্ত্বাবধানে ক্রেন দিয়ে এই প্রজেক্টের গার্ডার উত্তোলনের কাজ চলাকালে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। সিজিজিসি থেকে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের ওয়ার্ক অর্ডার পায় ইফসকন নামের একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। এর মালিক মো. ইফতেখার হোসেন এবং হেড অব অপারেশন আজহারুল ইসলাম ওরফে মিঠু।

এ দুজনের তথ্যের বরাতে র‌্যাব জানায়, ইফসকনের কাছে বড় ক্রেন না থাকায় তারা ‘থার্ড পার্টি’ প্রতিষ্ঠান বিল্ড ট্রেড কম্পানির কাছ থেকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ক্রেনটি ভাড়া নেয়। ইফতেখার ও মিঠু ঘটনার দিন অপারেটরদের দক্ষতা এবং ক্রেনের ফিটনেস যাচাই না করেই জনবহুল সড়কে ভারী গার্ডার স্থাপনের কাজ শুরু করার অনুমতি দেন। এ সময় অতিরিক্ত একটি সহায়ক ক্রেন থাকার কথা থাকলেও তা ছিল না।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, থার্ড পার্টি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিল্ড ট্রেড ইঞ্জিনিয়ার লিমিটেড মাসিক ভাড়ার চুক্তিতে ক্রেন সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (গ্রেপ্তার) রুহুল আমিন ও বিপণন ব্যবস্থাপক (গ্রেপ্তার) তুষার ক্রেনের ভাড়া প্রদান, চুক্তি, চালক নিয়োগ ও ক্রেনগুলোর ফিটনেস যাচাইসহ অন্যান্য দায়িত্বে ছিলেন। রুহুল ২০১০ সালে এবং তুষার ২০১৫ সালে এ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। মূলত তাঁরাই অতিরিক্ত লাভের জন্য অল্প পারিশ্রমিকে আল আমিনকে নিয়োগ দেন।

দুর্ঘটনায় অন্যদের দায়িত্বহীনতা সম্পর্কে ব্রিফিংয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা ফোর ব্রাদার্স গার্ড সার্ভিসের ট্রাফিকম্যান আফরোজ ও রুবেল এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিজিজিসির সেফটি ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার আলী যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি। সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ভারী সরঞ্জাম সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা সিজিজিসির কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলামও সেদিন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। জুলফিকার (গ্রেপ্তার) সিজিজিসির বিআরটি প্রকল্পের সেফটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ২০২১ সালে যোগ দেন। তিনি মূলত এসএসসি পাস। এর পরও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নিরাপত্তা প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্ণিত প্রকৌশলবিষয়ক কোনো ধরনের দক্ষতা তাঁর নেই। তিনি প্রকল্পের বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকা থেকে উত্তরার আজমপুর এলাকা পর্যন্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। দুর্ঘটনার দিন ভারী গার্ডার স্থাপনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তিনি কোনো ধরনের নিরাপত্তাবেষ্টনী স্থাপন ও পর্যাপ্ত ট্রাফিক নিয়োগ দেননি। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হওয়া সত্ত্বেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য ডিএমপি ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি।

গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের মধ্যে রুবেল তিন মাস আগে এবং আফরোজ গত মাসে ফোর ব্রাদার্স গার্ডস সার্ভিস ট্রাফিকম্যান হিসেবে এ প্রকল্পে যোগ দেন। তাঁদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণও ছিল না। দুর্ঘটনার সময় তাঁরা সেখানে প্রকল্পের ট্রাফিকম্যান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

ক্রেনের ফিটনেস ছিল না

র‌্যাব জানায়, দুর্ঘটনার সময় ব্যবহার করা সেই ক্রেনের ফিটনেস নেই। ক্রেনটি ছিল অনেক পুরনো। ধারণক্ষমতা ৪৫ থেকে ৫০ টন। গার্ডারের ওজন ছিল ৬০ থেকে ৭০ টন। এটি তোলার সময় দুটি ক্রেন থাকার কথা থাকলেও ছিল একটি। যে ক্রেনটি ছিল, সেটিও ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, ইফসকন কম্পানি সিজিজিসি থেকে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের অনুমোদন পায়। গার্ডার বহনের ক্রেন এ প্রতিষ্ঠানের কাছে না থাকায় বিল্ড ট্রেডার্স নামের প্রতিষ্ঠান থেকে অপারেটর, হেল্পারসহ ওই ক্রেন মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে ভাড়া নেয়। ক্রেনের সর্বশেষ ফিটনেস যাচাই করা হয়েছিল ২০২১ সালে। চলতি বছর ক্রেনের কোনো ধরনের ফিটনেস যাচাই করা হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিজিজিসির কারো কোনো দায়িত্বহীনতা ছিল কি না, এ ব্যাপারে র‌্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, তাদের বিষয়েও অনেক তথ্য এর মধ্যে পাওয়া গেছে। সেসব যাচাই-বাছাই চলছে। এ দুর্ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা