kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

‘ওরা আমার এত বড় সর্বনাশ করল’

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৭ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘ওরা আমার এত বড় সর্বনাশ করল’

‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব? মা আমারে ছাইড়া চইলা গেল, বাবার মতো শ্বশুরও নাই, সবাই আমারে ছাইড়া চইলা গেল, আমার সব তো শেষ হইয়া গেল, ওরা আমার এত বড় সর্বনাশ করল!’

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে স্বজন হারানোর বেদনায় এভাবে আহাজারি করছিলেন রিয়ামণি। অথচ দুই দিন আগেই ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে নতুন জীবন শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন এই নববধূ।

গত সোমবার রাজধানীর উত্তরায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মা, শ্বশুর এবং কয়েকজন আত্মীয়কে হারিয়েছেন তিনি। তাঁদের লাশ বুঝে নিতে গতকাল যখন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ছিলেন, তখন তাঁর পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন রিয়ামণির স্বামী হৃদয়।

বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাবা-স্বজন হারিয়েছি, এই কষ্ট কিভাবে ভুলি!’

এ সময় পাশ থেকে রিয়ামণি বলেন, ‘এত কষ্ট নিয়ে কিভাবে বাকি জীবন বেঁচে থাকব!’

এখনো দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে এই দম্পতিকে। তাঁরা একটা মানসিক অবসাদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। স্বাভাবিক কোনো কিছু ভাবতে পারছেন না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইঙ্গিত করে হৃদয় বলেন, ‘রাস্তা খোলা রেখে তারা কেন এমন ঝুঁকির কাজ করবে? কেন নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে না?’

ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে হৃদয় বলেন, ‘আমরা যখন বিমানবন্দর পার হই, তখন প্রজেক্টের গার্ডার ঝুলে ছিল রাস্তার ওপর। সেটার নিচ দিয়ে সব গাড়ি যাচ্ছিল। অন্য গাড়ি যেভাবে যাচ্ছিল, আমাদের গাড়িও যাচ্ছিল। এ সময় গাড়ির ওপর গার্ডার আছড়ে পড়ে। গাড়ির গ্লাস ভেঙে স্থানীয় লোকজন আমাকে ও রিয়াকে বের করে। ’

দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা হৃদয় বলেন, ‘আমি আর বাবা সামনে ছিলাম। আর পেছনে আমার স্ত্রী ও অন্যরা ছিল। এয়ারপোর্ট রোডে ক্রেনে একটা বক্স গার্ডার ঝুলছিল। আমরা দূর থেকে এটা দেখেছি। কিন্তু রাস্তা খোলা ও স্বাভাবিক ছিল। একের পর এক গাড়ি এর নিচ দিয়ে যাচ্ছে। আমরা পেছনে পেছনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কখনো মনে হয়নি যে এটি আমাদের ওপর পড়বে। ’

তিনি বলেন, ‘যখন ওই জায়গা পার হচ্ছিলাম, তখনই গার্ডারটা আমাদের গাড়ির ওপর পড়ল। চালকের পাশে বাবা, বাবার বাঁ পাশে ছিলাম আমি। আমার পেছনের সিটে ছিল স্ত্রী। সে-ও বাঁ পাশে ছিল। ডান পাশে বাবাসহ যারা ছিল, সবাই সেখানে মারা যায়। ’

হৃদয় বলেন, ‘ভেতরে আমার পা আটকে ছিল। গাড়ির গ্লাস ভেঙে আমাকে উদ্ধার করা হয়। আমাকে উদ্ধার করতে ১০ মিনিট লাগে। আমার স্ত্রী পুরোপুরি আটকে ছিল। ওকে বের করতে অনেক সময় লাগে, আধাঘণ্টার মতো। ’

গতকাল দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে রিয়ামণির সঙ্গে যখন এই প্রতিবেদকের কথা হয়, তখন পাশেই ছিলেন রিয়ার মা, খালা, শ্বশুরসহ পাঁচ স্বজনের লাশ।

সাভার প্রতিনিধি জানান, সোমবারের দুর্ঘটনার খবরে মুষড়ে পড়েছেন শফিকুল ইসলাম। ফাহিমা বেগম যে বাড়িতে থাকতেন, তাঁর ব্যবস্থাপক তিনি। শফিকুল বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে আশুলিয়ার ভাড়া বাসা থেকে নববধূ রিয়ামণিকে আনতে গিয়েছিলেন মা ফাহিমা বেগম ও খালা ঝরনা। সঙ্গে ছিল ঝরনার দুই শিশু, রিয়ামণির ভাইসহ স্বজনরা। সন্ধ্যার পর খবর আসে যে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় ফাহিমা বেগম ও তাঁর বোন ঝরনা মারা গেছেন। মারা গেছে দুই শিশুও। এই বাড়ির ছাদে গত শনিবার রিয়ামণির বিয়ে হয় হৃদয় নামের এক ছেলের সঙ্গে। আমরাও উপস্থিত থেকে বিয়েতে সহযোগিতা করেছি। দাওয়াত খেয়েছি। শুনে খুবই খারাপ লাগছে। ’

মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, রুবেলের মৃত্যুর খবর ঘোড়ামারায় এসে পৌঁছালে সেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। রুবেলের মরদেহ একনজর দেখার জন্য আশপাশের গ্রাম থেকে স্বজনরা এসে ভিড় জমায় তাঁর পৈতৃক ভিটায়। এলাকায় তিনি আইয়ুব হোসেন নামে পরিচিত।

রুবেলের ভাইয়ের মেয়ে তানিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমাদের পরিবারটি চলত চাচার রোজগারে। আমরা এ ঘটনার সুষুম বিচার চাই। ’

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, গার্ডারচাপায় প্রাইভেট কারের নিহত পাঁচজন যাত্রীর মধ্যে চারজনের বাড়িই জামালপুরে। গতকাল দুপুরে শোকার্ত স্বজনরা ঢাকায় তাঁদের মরদেহ গ্রহণ করে জামালপুরের উদ্দেশে রওনা হন।

দুপুরে মেলান্দহের পয়লা গ্রামে ঝরনা আক্তারের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, পুরো বাড়িটি শোকে নিস্তব্ধ। অধিক শোকে কাতর হয়ে জাহিদুল ও তাঁর মা অসুস্থ হয়ে খাটে শুয়ে আছেন। জাহিদুল কথাই বলতে পারছেন না। জাহিদুলের মা জবেদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার দুইডা ছেলে। বড় ছেলাডা নির্মাণাধীন দালান থেইকা পইড়া মারা গেছে। জাহিদ আমার ছোট ছেলে। বেটার বউ  আর দুই নাতি মারা গেছে। এখন আমি কী করমু। আমার ছেলেডা পাগল হইয়া গেছে। অর কি অবো। ছেলের বাপও নাই। ভাইও নাই। এখন কোনো উপায় নাই। আমি কোনডাই কবার পাই না বাবা। আল্লায় কপালে এইডা কি দিলো। আমার মাথা ঠিক নাইখা। ’

 

 



সাতদিনের সেরা