kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দুই কারখানার দাহ্যে তীব্র হয় আগুন

এস এম আজাদ   

১৭ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুই কারখানার দাহ্যে তীব্র হয় আগুন

রাজধানীর চকবাজারের দেবীদাস ঘাটে সোমবার অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় ভবনটির নিচতলায় ‘বরিশাল হোটেলে’র রান্নার চুলা থেকে। এরপর উত্তর পাশ লাগোয়া ভবনে প্লাস্টিক কারখানা ও গুদামে তা ছড়িয়ে পড়ে। নিচের ও পাশের আগুন দ্রুত চারতলা ভবনটির দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলায় ছড়ায়।

ভবনের নিচতলা থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত প্লাস্টিকের খেলনা ও জুতার সোলের কারখানা ও গুদাম।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা প্লাস্টিক নামের প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. নজরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। এলাকাবাসী ভবনটিকে ঢাকা প্লাস্টিক ভবন নামেই চেনে। পাশের কারখানাটির নাম ‘সুন্দর প্লাস্টিক’। জুতার সোল তৈরির দোতলা ভবনের কারখানাটির ভেতরে পুরোটাই পুড়ে গেছে। ঢাকা প্লাস্টিক ভবনের নিচতলায় বরিশাল হোটেলের পাশেই প্লাস্টিকের দানা ও ফ্যানের মোটর তৈরি-মেরামতের দোকান। এই ভবনের পেছনের ভবনটির দ্বিতীয় তলাও আগুনে পুড়েছে। এই ভবনেও ছিল প্লাস্টিকের দানা তৈরির কারখানা।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। ঢাকা প্লাস্টিকসহ আশপাশের ভবনগুলোয় তালা ঝুলিয়ে সটকে পড়েছেন মালিকরা। সেখানে আছে পুলিশ পাহারা। তবে সুন্দর প্লাস্টিক থেকে পুড়ে যাওয়া জুতার সোলের বস্তা বের করছিলেন কিছু কর্মী।

গতকাল রেস্টুরেন্টের মালিক ফখর উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালত তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। ভবনটির মালিক রানাকে মামলায় আসামি করা হলেও গতকাল পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঢাকা প্লাস্টিক কারখানার মালিক নজরুল ও পাশের ভবনের সুন্দর প্লাস্টিক কারখানার মালিককে মামলায় আসামি করা হয়নি। হদিস নেই পেছনের প্লাস্টিক দানার কারখানার মালিকেরও।

অন্যদিকে গতকাল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিহত ছয় রেস্টুরেন্টকর্মীর লাশের ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শেষ হয়েছে। বিকৃত হওয়া সত্ত্বেও লাশের মুখ দেখে স্বজনরা লাশগুলো শনাক্ত করে নিতে চায়। দিনভর স্বজনদের অপেক্ষার পর গত রাতে তাদের কাছে লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

দুই প্লাস্টিকের কারখানায় ছড়ায় আগুন

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানায়, ঢাকা প্লাস্টিক ভবনের মালিক চকবাজারের রহমতগঞ্জের মৃত আলম। মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মো. রানা বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন। দুই বছর ধরেই ভবনটির নিচতলার একাংশ, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও টিনশেড দিয়ে তৈরি করা চতুর্থ তলায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের খেলনার কারখানা, জুতার সোলের কারখানা ও গোডাউন রয়েছে। এগুলোর মালিক নজরুল। ছয় মাস আগে নিচতলার একটি অংশ ভাড়া নিয়ে রেস্টুরেন্ট চালু করেন বরিশালের ফখর উদ্দিন। এই হোটেলের পাশেই কয়েকটি প্লাস্টিক দানার দোকান রয়েছে। বরিশাল হোটেলের ওপরে একটি ফলস সিলিং দিয়ে মাচার মতো তৈরি করে কাঠের পাটাতনে ঘুমানোর জায়গা ছিল। সেখানেই ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় আটকে পড়ে মারা গেছেন ছয় কর্মী। লাগোয়া সুন্দর প্লাস্টিকে দ্রত আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণে পাশের ভবনের দিকেও যেতে পারেননি আটকে পড়া কর্মীরা। নিচে আগুন থাকায় তাঁরা আবদ্ধ হয়েই মারা গেছেন।

দীন ইসলাম, কাজল ও মনির হোসেন নামের তিন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আগুন লাগার সময় হোটেলের কাছাকাছি ছিলেন তাঁরা। হোটেলের চুলার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। এরপর তাঁরা আগুন দেখেন। কিছুক্ষণ পর আগুন ওপরে ও পাশের ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের মতে, গ্যাসের লাইন লিকেজ বা সিলিন্ডার থেকে আগুন লেগেছে। তবে ওপরে ও পাশে আগুন গেছে দুই কারখানার প্লাস্টিকজাতীয় জিনিসপত্রের কারণে।

সুন্দর প্লাস্টিক কারখানার ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো দোতলা ভবনে প্লাস্টিক ও রাবারের জুতার বস্তা এবং মেশিন পুড়ে গেছে। ধসে পড়েছে ওপরের টিনের ছাদ। গতকাল কয়েকজন শ্রমিক সেগুলো সরাচ্ছিলেন। কারখানা ও ভবনের মালিকের নাম জানাতে চাননি তাঁরা। নিরাপত্তাকর্মী দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি কয়েক দিন এখানে চাকরি করি। মালিক কে তা জানি না। ’

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারি অনুমোদন না নিয়েই ভবনটি তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। রিপোর্ট পেলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

রেস্টুরেন্ট মালিক রিমান্ডে

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভবনের নিচে থাকা বরিশাল হোটেলের মালিক ফখর উদ্দিনকে গতকাল সকালে গ্রেপ্তার করেছে চকবাজার থানার পুলিশ। গত সোমবার রাতে নিহত রুবেলের ভাই মো. আলী অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় মামলা করেন। মামলায় ভবন মালিক মো. রানা ও হোটেল মালিক ফখর উদ্দিনসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করেন।

গতকালই মামলার তদন্তের স্বার্থে ফখর উদ্দিনকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রাজীব কুমার সরকার। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসীম এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার জাফর হোসেন বলেন, ‘ভবন মালিক ও প্লাস্টিক কারখানার মালিককে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ’

মুখ দেখে চিনে লাশ চায় স্বজনরা

সোমবার বিকেল থেকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গের সামনে ভিড় করে আছে নিহত ছয় রেস্টুরেন্টকর্মীর স্বজনরা। তারা মুখ দেখে লাশ শনাক্ত করে ছয়টি মৃতদেহ নিতে চায়। দিনভর কান্না আর অপেক্ষার পর রাতে তাদের লাশ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

রাজধানীর চকবাজারের দেবীদাস ঘাট লেন এলাকায় বরিশাল হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের বাকরুদ্ধ স্বজনরা।     ছবি : কালের কণ্ঠ

 

 



সাতদিনের সেরা