kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

নিরাপত্তায় গুরুত্ব নেই, বরাদ্দও নেই

সজিব ঘোষ   

১৭ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিরাপত্তায় গুরুত্ব নেই, বরাদ্দও নেই

রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ২০.৫ কিলোমিটার। ১০ বছর ধরে এই এলাকাজুড়ে চলছে নির্মাণকাজ। ব্যস্ততম সড়কের মাঝ বরাবর এই কাজ চলমান থাকলেও নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা। এমনকি নিরাপত্তা খাতে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যয় রাখা হয়নি বলে স্বীকার করেছেন প্রকল্পের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া নির্মাণকাজে গতি না থাকায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ পড়ে থাকছে দিনের পর দিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের কাজ চলমান, এটি যেন জাতীয় মহাসড়কের মেরুদণ্ডকে মহাঝুঁকিতে ফেলেছে। তাঁদের মতে, সড়কের মাঝ বরাবর নির্মাণকাজ করা সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী হয়ে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কটি দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক। আবার এই পথে যাতায়াতের বিকল্প কোনো সড়ক নেই। তাই নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দরকার ছিল।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের অধীনে ১৬ কিলোমিটার সড়কে সমতলে কাজ চলছে। বাকিটা উড়ালপথে। এই প্রকল্পে  সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া এই প্রকল্পটির মেয়াদ তিন দফা বাড়িয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।

বিআরটি হচ্ছে, দ্রুত বাস চলাচলের জন্য আলাদা লেনের একটি ব্যবস্থা। যে পথ দিয়ে শুধু নির্দিষ্টসংখ্যক বাস চলাচল করবে। ঢাকা বাস র‌্যাপিড কম্পানি লিমিটেডের অধীনে বিআরটির বাস পরিচালিত হবে।

বিআরটি প্রকল্প চলাকালে বিভিন্ন সময়ের দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে কারণ খতিয়ে দেখা হয়েছে; কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিমানবন্দর থেকে টঙ্গীমুখী প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ রয়েছে। এর ফলেও মানুষজন নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছে।

প্রকল্পে নেই নিরাপত্তা খাত ও ব্যয় 

সর্বশেষ গত সোমবার উত্তরায় প্রকল্পের নির্মাণকাজের দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর আগে গত ১৫ জুলাই উড়ালপথের গার্ডার চাপায় প্রকল্পের এক নিরাপত্তারক্ষী মারা যান। ওই ঘটনায় আরো দুজন আহত হয়েছিলেন। গত বছরের মার্চে বিমানবন্দর এলাকায় এক দুর্ঘটনায় প্রকল্পের দেশি-বিদেশি ছয়জন শ্রমিক আহত হন।

জানতে চাইলে ঢাকা বাস র‌্যাপিড কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এর থেকে কিছু ছোট দুর্ঘটনা আগে হয়েছে। তখন আমরা তদন্ত কমিটি করে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা স্বীকার করি পরে যে ধরনের ব্যবস্থা (নিরাপত্তাব্যবস্থা) নেওয়ার দরকার ছিল, সেটা আমরা নিতে পারিনি। এখন থেকে নিরাপত্তায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এই প্রকল্পের নিরাপত্তা খাতে আলাদা করে কোনো ব্যয় ধরা হয়নি। তবে নির্মাণকাজের সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁদের নিরাপত্তার জন্য যখন যা কিছু দরকার ছিল, তা নেওয়া হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ধরেন, নিরাপত্তার জন্য একটি দেয়াল নির্মাণ করতে হবে। এটির ব্যয় নির্মাণ খাতে দেখানো হয়েছে, নিরাপত্তা খাতে নয়। এই প্রকল্পে সুনির্দিষ্টভাবে নিরাপত্তার জন্য খাত ঠিক করা নেই, খরচও ঠিক করা নেই। সফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, নিরাপত্তার বিষয়টি বিআরটি প্রকল্প বা ঢাকা বিআরটির অধীনে নয়। এটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ।

জানতে চাইলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্পের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) নিরাপত্তা খাত নামে কোনো খাত থাকে না। তবে প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব। যদিও সড়কের প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নামে একটি কোড (খাত) থাকে। এই কোডে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। যাতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ ও যান চলাচল একই সঙ্গে নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে পারে। ’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই দি ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স (ফিডিক) আইন মেনে চলতে হবে। সেই আইনে নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অবহেলা করলে দুই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রথমটি হলো ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া, অন্যটি হলো দেশের প্রচলিত আইনে তার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।

ঠিকাদার কথা শোনেন না

দুর্ঘটনার পর থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে দায়ী করা হচ্ছিল। প্রকল্পের ঠিকাদারির দায়িত্বে রয়েছে জিয়াংসু প্রভিনশিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কম্পানি লিমিটেড (জেডটিইজি)। গতকাল মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, গাফিলতি পাওয়া গেছে। ’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বাস র‌্যাপিড কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঠিকাদারকে নিয়ে বড় একটা দুর্ভোগের মধ্যে আছি। আমরা তাঁদের অনেক কিছু মানাতে পারি না। তাঁরা কথা শোনেন না। ’

ছয় মৃত্যুর পর নিরাপত্তার উদ্যোগ

বিআরটি প্রকল্পে একাধিক দুর্ঘটনায় এই পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দুর্ঘটনাগুলোতে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবস্থা নেয়নি। তবে এখন থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গতকাল আলোচনায় বসে প্রকল্পের ঋণদাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ঢাকা বাস র‌্যাপিড কম্পানি লিমিটেড।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নিরাপত্তা না বাড়ানো হলে প্রকল্প থেকে সরে যাবে এডিবি। সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ঠিকাদারকে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে হবে। এখন থেকে নিরাপত্তার বিষয়ে ‘শূন্য সহনশীলতা’ দেখাতে বলেছে ঋণদাতা সংস্থা।

সড়কের প্রকল্পের নিরাপত্তা কেমন হওয়া দরকার—এমন প্রশ্নে পদ্মা সেতুর বিশেষজ্ঞ দলের প্রধানের দায়িত্ব পালন করা ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামীম জেড বসুনিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সাহস নয়, দুঃসাহস বেশি। শুধু বঙ্গবন্ধু টানেল ছাড়া দেশের কোনো প্রকল্পেই শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। এমনকি পদ্মা সেতুতেও নয়। একটা সড়কে ক্রেন দিয়ে গার্ডার তুলবে আর সেই ক্রেনের নিচ দিয়ে গাড়ি চলবে, এটা হতেই পারে না। ক্রেন ব্যবহারের ওই আধাঘণ্টা সময় রাস্তা বন্ধ রাখলেই হতো। ’



সাতদিনের সেরা