kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জোয়ারে ভাসছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ

► নির্মাণাধীন ১৪টি জলকপাটের কাজ ৮০ থেকে ৯৫% সম্পন্ন
► বাকি ২৬টির কাজ হয়েছে ৬ থেকে ৫০% পর্যন্ত
► প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে একাধিকবার

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জোয়ারে ভাসছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ

কর্ণফুলী নদী থেকে জোয়ারের পানি নগরের চাক্তাই খালের প্রবেশমুখে স্লুইস গেট দিয়ে ঢুকছে। ছবিটি গত রবিবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশের অন্যতম প্রধান ভোগ্য পণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রাম নগরের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা জোয়ারের পানি থেকে রক্ষায় নির্মাণাধীন দুটি জলকপাটের (সু্লইস গেট) ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে প্রায় তিন মাস আগে। ১৫ শতাংশের কাজ আটকে থাকায় জলকপাট দুটি চালু হচ্ছে না। এতে জোয়ারের সময় ভাসছে দুই বাজারসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। এ ছাড়া আরো ৩৮টি জলকপাট নির্মাণাধীন।

বিজ্ঞাপন

গত রবিবার দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দুই জলকপাটসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জলকপাট খোলা থাকায় কর্ণফুলী নদী থেকে জোয়ারের পানি সমানে নগরে ঢুকছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জসহ বাকলিয়া, মোহরা, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ সিডিএ এবং অন্যান্য এলাকা জোয়ারের পানিতে একাকার হয়ে যায়। কর্ণফুলী নদী থেকে খাল ও উপখাল হয়ে জোয়ারের পানি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক-আবাসিক এলাকা এবং বিভিন্ন সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান জমে থাকে।

চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এখানে ২০ হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে জোয়ারের পানির কারণে পাঁচ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার জন্য চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মুখে স্লুইস গেট নির্মিত হওয়ার পরও আমরা জোয়ারের পানি থেকে মুক্তি পাচ্ছি না। গত এক সপ্তাহ ধরে কখনো সকাল আবার কখনো দুপুরের পর জোয়ারের পানিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। জোয়ারের পানি ঢোকার পর প্রায় তিন-চার ঘণ্টা জলাবদ্ধতা হচ্ছে। পানি সড়ক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকছে। ’

স্থানীয় লোকজন জানায়, দেড় বছর থেকে প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনটি মেগাপ্রকল্পের অধীনে স্লুইস গেটের নির্মাণকাজ চললেও তা এত দিনে শেষ না হওয়ায় জোয়ারের পানির কবল থেকে মুক্তি পাচ্ছে না নগরবাসী। অনেকে মনে করছেন, সব স্লুইস গেটের (৪০টি) নির্মাণকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এর সুফল পুরোপুরি মিলবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে স্লুইস গেটগুলোর নির্মাণ শেষ হচ্ছে না। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বড় দুটি প্রকল্পের (জলাবদ্ধতা নিরসন) নির্মাণকাজের মেয়াদ গত জুলাই মাস থেকে আরো দেড় থেকে দুই বছর বাড়ানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম নগরকে বৃষ্টি, জোয়ারের পানি ও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে বর্তমান সরকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার তিনটি মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ২০১৭ সালের জুন মাসে সিডিএর অধীনে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই মেগাপ্রকল্পের অধীনে পাঁচটি স্লুইস গেট আছে।

সিডিএর অধীনে কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু হয়ে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক ও ১২টি রেগুলেটর বা স্লুইস গেট নির্মাণ প্রকল্পে দুই হাজার ৩১০ কোটি টাকার আরেকটি মেগাপ্রকল্প বরাদ্দ দেয় সরকার। এই প্রকল্পের মধ্যে আছে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা জোয়ারের পানি থেকে রক্ষায় নির্মাণাধীন দুটি জলকপাটও। প্রকল্প দুটির নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর মেয়াদ এক বছর করে দুই দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ গত জুলাই মাস থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আরো দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু হয়ে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক এবং ১২টি রেগুলেটর নির্মাণ প্রকল্পে। সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং একটি মেগাপ্রকল্পের পরিচালক রাজীব দাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের অধীনে ১২টি স্লুইস গেটের মধ্যে ৯টির স্ট্র্যাকচারের কাজ শেষ। এ পর্যন্ত ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ’ প্রায় ৭০০ মিটারের ব্যবধানে চাক্তাই ও রাজাখালী এই দুই খালের মুখে দুটি বড় জলকপাট চালু না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই দুটি স্লুইস গেটের নির্মাণকাজ প্রায় তিন মাস আগে ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশ (নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি) থেকে গেট, পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দেশে আসার অপেক্ষায়। বাকি কাজ (১৫ শতাংশ) সম্পন্ন করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দুটিসহ প্রকল্পের আরো সাতটি স্লুইস গেট চালু করতে পারব। ’

একইভাবে সিডিএর অধীনে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পটির মেয়াদ গত মাস থেকে দেড় বছর বাড়িয়ে আগামী বছরের (২০২৩ সাল) জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আহমদ মঈনুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের মেগাপ্রকল্পের অধীনে পাঁচটি স্লুইস গেট আছে। এসবের নির্মাণকাজ ৯৫ শতাংশ হয়েছে। বাকি থাকা ইলেকট্রো মেকানিক্যালের কাজ শেষ হতে দুই-তিন মাস লাগবে। ’

এ ছাড়া এক হাজার ৬২০ কোটি টাকা ব্যয়ে অন্য মেগাপ্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটি একনেক থেকে অনুমোদন করা হয়। এই প্রকল্পের মধ্যে ২৩টি স্লুইস গেট নির্মাণ করার কথা। পাউবো সূত্রে জানা যায়, ২৩টির মধ্যে ১৩টির নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে দুটির ৭০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। সব মিলে ওই ১৩টিতে গড়ে ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

জোয়ারের পানিতে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ২৩টি এবং সিডিএর দুই মেগাপ্রকল্পের অধীনে ১৭টি স্লুইস গেট নির্মিত হচ্ছে। এখনো এসব স্লুইস গেটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন না হওয়ায় জোয়ারের পানি ঢুকছে নগরে। আমাদের এখনো একটি স্লুইস গেটও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর আরো দুই বছর রক্ষণাবেক্ষণ করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন সংস্থাগুলো। মেগাপ্রকল্প অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করে আগামী বর্ষার আগে যাতে জোয়ার ও জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা উনারা করবেন। ’

 



সাতদিনের সেরা