kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দুই সাফারি পার্কে দুই রকম চিত্র

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর ও ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া   

১২ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুই সাফারি পার্কে দুই রকম চিত্র

বেঙ্গল টাইগার। কক্সবাজারের ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাজীপুরের শ্রীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। গত শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টা। বাঘের বেষ্টনীতে ঢুকেছে পর্যটকবাহী একটি মিনিবাস। অদূরে একটি বাঘ বসে থাকতে দেখে মোবাইলে ছবি তুলছিলেন দর্শনার্থীরা; কিন্তু বাসের জানালা খোলা।

বিজ্ঞাপন

কারণ বাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র অকেজো। বাসের মতোই নানা অযত্ন-অবহেলার চিত্র চোখে পড়েছে পুরো সাফারি পার্ক ঘুরে।

মিনিবাসটির চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দর্শনার্থীরা প্রতিদিনই বিরক্তি প্রকাশ করেন। আটটি মিনিবাসের মধ্যে তিন নম্বরটি বিকল। শুক্রবার পাঁচটি মিনিবাসে দর্শনার্থী বহন করা হয়েছে, তার তিনটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিকল। দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষকে জানালেও মিনিবাসগুলোর এসি মেরামতে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বাসটি আফ্রিকান সাফারির ভেতর ঢোকার পর সরু সড়কে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। হেলেদুলে বাসটি ততক্ষণে ভালুকের বেষ্টনীর সামনে পৌঁছে যায়। চালক তখন বারবার জানালা বন্ধে তাগাদা দেন; কিন্তু গরমের কারণে দর্শনার্থীরা ঝুঁকি নিয়েই জানালা খুলে রাখেন।

ভালুকের বেষ্টনীর ভেতর ঢুকতেই দেখা গেল, ডান পাশে দুটি ভালুক শুয়ে আছে। বেষ্টনীজুড়ে আর কোনো ভালুক চোখে পড়েনি। সিংহ সাফারির ছোট বেষ্টনীর ভেতর সাদা সিংহের বাস। দেখা মেলেনি সাদা সিংহটির। বড় বেষ্টনীতে সড়কের ডান পাশের শেডে দুটি সিংহ। একটি খুঁড়িয়ে হাঁটছিল।

বাঘ সাফারির ভেতর প্রবেশের সময় দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় ফটক খোলার ব্যবস্থা কাজ করছে না। পরে ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে এসে এক কর্মী ফটক ঠেলে খুলে দেন। দ্রুতই ওই কর্মী ফের ওপরে উঠে যান। ঝুঁকি নিয়ে এভাবে হাতে ঠেলে ফটক খোলার কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মী জানান, মাঝেমধ্যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি কাজ করে না। তাই ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখে বাঘ দূরে থাকলে হাতে ঠেলে ফটক খুলতে হয়। বাঘ কাছে থাকলে দূরে যাওয়ার অপেক্ষা করতে হয়। দর্শনার্থী ইমরান হোসেন জানান, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার ফুলকী ইউনিয়নের নিড়াইল থেকে তিন পরিবারের ১২ জন এসেছেন তাঁরা। এর মধ্যে চার শিশু ও তিনজন নারী। ইমরান হোসেন বলেন, ‘ভেতরে সড়কের কী অবস্থা দেখলেন তো! মিনিবাসের এসি নষ্ট। গরমে অস্থির অবস্থায় কয়টাই বা প্রাণী দেখলাম!’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাফারি পার্কে বাঘ ও সিংহ আছে ৯টি করে। এর মধ্যে বাঘ দুটি ও সিংহ পাঁচটি নিজ নিজ বেষ্টনীর ভেতর উন্মুক্ত। বাকি সাতটি বাঘ ও চারটি সিংহ বন্দি থাকে। একটি সিংহ খুঁড়িয়ে হাঁটার কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, এটিই খুঁড়িয়ে হাঁটছে, তা নয়। বন্দি একটি সিংহও অসুস্থ। অসুস্থ একটি বাঘও।

গত ২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সাফারি পার্কে ১১টি জেব্রা এবং একটি করে বাঘ ও সিংহী মারা যায়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মারা যায় একটি লেমুর। সাফারি পার্কে একে একে প্রাণী মৃত্যু শুরু হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে গঠন করা হয় ছয় সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড। মেডিক্যাল বোর্ড গত ২৫ জানুয়ারি পার্কটির আফ্রিকান সাফারি পরিদর্শন করে প্রাণী সুরক্ষায় ১০টি প্রস্তাব দিয়েছিল।

গত ২৬ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি ২০ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। ২২ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনাসভা হয়। সভায় প্রাণী মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় মামলারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রাণী মৃত্যু রোধ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে তদন্ত কমিটি ১১টি স্বল্পমেয়াদি, চারটি মধ্য মেয়াদি এবং ৯টি দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করেছিল। মন্ত্রণালয়ের ওই সভায় পর্যায়ক্রমে ওই সব সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন কর্মকর্তা জানান, মেডিক্যাল বোর্ডের ১০টি প্রস্তাবের পাঁচটিই বাস্তবায়িত হয়নি এখনো। আর তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নেরও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

খাবার নিয়ে অবহেলা

কয়েকজন কর্মী নাম প্রকাশ না করে বলেন, পুরো সাফারি পার্কই ধুঁকছে। একজন কর্মচারী বললেন, ‘বিকেল ৪টায় বাঘ, সিংহ, জাগুয়ার ও শকুনকে খাবার দেওয়ার কথা। সোয়া ৪টায় এসে খোঁজ নিয়ে দেইখেন তো খাবার দেওয়া হয়েছে কি না?’

সেদিনই বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে বাঘ, সিংহ, জাগুয়ার ও শকুনকে খাবার দেওয়া হয়েছে কি না—জানতে সাফারি পার্ক অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। সাত থেকে আট মিনিট পর কোর সাফারির সামনে দেখা হয় পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রাণী তত্ত্বাবধায়ক আনিছুর রহমান খাবার নিয়ে গেছেন। কিন্তু দুই মিনিট পর দেখা গেল, আনিছুর রহমান মোটরসাইকেলযোগে কোর সাফারি থেকে বের হচ্ছেন। বাঘ, সিংহ, জাগুয়ার ও শকুনকে খাবার দিয়েছেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটু পরেই দিয়ে দেব। ’

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো কিছু তথ্য’র দরকার হলে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করুন। এখান থেকে কোনো তথ্য দেওয়া নিষেধ রয়েছে। ’ বাঘ ও সিংহ অসুস্থ কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাফারি পার্কের কোন কোন কালপিট আপনাদের তথ্য দেয় জানি না। ’

ডুলাহাজারায় বানরের খাবার অপ্রতুল : কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে দেশি প্রজাতির বানরের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এসব বানর কোলের সন্তান-সন্ততি নিয়ে পার্কজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। এর মধ্যে মাত্র ৭৯টি বানরের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে রেশনের ব্যবস্থা চালু আছে। সেই রেশনের খাবার দিয়ে এসব বানরের ক্ষুধা নিবারণ করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্ক কর্তৃপক্ষের জন্য।

ফলে অন্য প্রাণীর খাবারে ভাগ বসায় বানরের দল। শুধু তা-ই নয়, পার্কে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটক-দর্শনার্থীর হাতে খাবার দেখলেই কেড়ে নিতে চায় তারা। এর বাইরে বেশির ভাগ প্রাণী নিয়ে দর্শনার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক মো. মাজহারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পার্কের বন্য প্রাণী ও পশুপাখির জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত খাবার নিয়মিতই দেওয়া হয়ে থাকে। প্রাণীদের খাবার নিয়ে এখানে কেলেঙ্কারির কোনো সুযোগই নেই। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক পার্কের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকে। মূলত ওই দিনই প্রাণীদের খাবার দেওয়া হয় না এবং বরাদ্দও নেই। ’

পুরো একটি দিন প্রাণীরা অনাহারে কিভাবে বাঁচে—এমন প্রশ্ন করা হলে পার্কের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘প্রতিদিনই যদি একই নিয়মে প্রাণীদের খাবার দেওয়া হয় তাহলে শারীরিকভাবে প্রাণীগুলো সমস্যার সম্মুখীন হবে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সপ্তাহে এক দিন খাবার না খেলে প্রাণীগুলো সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকবে।

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা  রফিকুল ইসলাম চৌধুরী  বলেন, এখানে বন্য প্রাণী ও পশুপাখিগুলোর খাবার সরবরাহের সময় কমিটির সদস্যদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। তবে পার্কে বানরের সংখ্যা খুব বেশি। তাই সব বানরের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

 

 



সাতদিনের সেরা