kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা

আয়ু ফুরিয়ে যাওয়া সিংহ, গণ্ডার, ভালুক প্রদর্শনীতে

► নতুন প্রাণী সংগ্রহ করা হচ্ছে না
► জিরাফের খাঁচা আছে, জিরাফ নেই

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৮ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আয়ু ফুরিয়ে যাওয়া সিংহ, গণ্ডার, ভালুক প্রদর্শনীতে

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভোগা সিংহটিও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। গত বুধবার তোলা। ছবি : এস এম রানা

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। ভেতরে নান্দনিক পরিবেশ। পাহাড়-টিলা ধরে টাইলস বসানো পথ। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে ৪৭টি সিসিটিভি।

বিজ্ঞাপন

মজবুত চারপাশের সীমানাপ্রাচীর। চিড়িয়াখানায় ঢুকেই দেখা মেলে বাঘ-সিংহের।

এখানে বাঘের সংসারটা বেশ বড়। ১৬টি বাঘ নিয়ে রাজ-পরীর সংসার দেশের সর্ববৃহৎ বাঘ পরিবার। সম্প্রতি চারটি সাদা বাঘের বাচ্চা প্রসব করেছে পরী। সব মিলিয়ে আছে পাঁচটি সাদা বাঘ। বাঘের তর্জনগর্জন কিছুটা ভয় ছড়ালেও সিংহ যেন গর্জনই ভুলে গেছে। খাঁচায় দুটি সিংহ আছে বটে। দুটিই বয়সের ভারে ন্যুব্জ। হেঁটে চলার শক্তি হারিয়েছে। শুয়ে-বসে বার্ধক্য পার করছে তারা।

আরেকটু সামনে গিয়েই দেখা মেলে ভালুকের। চারটি ভালুক আছে খাঁচায়, যার দুটি বার্ধক্যে উপনীত। অবস্থা সিংহের মতো। যেন শেষ সময়ের প্রতীক্ষা। হাঁটতে হাঁটতে চিড়িয়াখানার শেষ প্রান্তে গিয়ে পাহাড়ের খাঁজে দেখা মিলে আরেকটি শূন্য খাঁচার। এখানে জিরাফ থাকার কথা। কিন্তু জিরাফ নেই। ‘আনব’ আনব’ করেও কর্তৃপক্ষ জিরাফ আনছে না।

বৃদ্ধ ও রোগাক্রান্ত প্রাণী প্রদর্শনীতে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিংহ দুটির বয়স এখন প্রায় ১৯ বছর। এগুলোর গড় আয়ু প্রায় শেষ। গণ্ডার দুটিও ২৩ বছর আগের। সেগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে। এই কারণে নতুন করে সিংহ, গণ্ডারসহ অন্য প্রাণী সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ’

দীর্ঘদিন আগে জিরাফ আনার ঘোষণা দিয়ে খাঁচা তৈরির পরও কেন জিরাফ আনা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জিরাফ বিদেশ থেকে আমদানির প্রক্রিয়া চলমান আছে। আর এক জোড়া জলহস্তী ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে প্রাণী বিনিময়ের মাধ্যমে সংগ্রহের প্রচেষ্টা চলছে। ’

সাধারণত মৃত্যুপথযাত্রী প্রাণীকে প্রদর্শনীতে রাখা হয় না। কারণ এগুলোর দূরবস্থা মানুষকে পীড়িত করে। দর্শনার্থী কাজি আবদুল আউয়াল বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন চিড়িয়াখানায়। গত মঙ্গলবার দুপুরে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রবাসী মানুষ। প্রায় ১০ বছর পর চিড়িয়াখানায় এলাম বাচ্চাদের নিয়ে। অনেক কিছু দেখে বাচ্চারাও খুশি। তবে খারাপ লাগছে অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী সিংহ দেখে। এমন প্রাণী কেন প্রদর্শনীতে রাখা হলো? সিংহের শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। চিড়িয়াখানায় শিশুদের বিনোদনের জন্য সুস্থ-সবল প্রাণী থাকার কথা। ’ চিড়িয়াখানায় প্রবেশের টিকিটের দাম ৫০ টাকা করা নিয়েও অসন্তোষ তাঁর।

জিরাফের খাঁচা শূন্য দেখে হতাশ স্কুলছাত্র নাঈমুর রহমান। বলল, ‘জিরাফ, জলহস্তী, লামা, উট, হাতি বা ওয়াইল্ডবিস্টের মতো এখানে প্রাণী নেই। আছে বাঘ, অজগর, দেশীয় পাখি আর খালি জিরাফের খাঁচা। আরো বেশি প্রাণীর দেখা পেলে ভালো লাগত। ’

প্রাণী কম থাকার তথ্য স্বীকার করে নিয়েছেন চিড়িয়াখানা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান। গত সোমবার (১ আগস্ট) চারটি সাদা বাঘের বাচ্চা প্রসবের পর তিনি চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করেন। তখন চিড়িয়াখানায় পর্যাপ্ত প্রাণী না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জিরাফসহ অন্য প্রাণী সংগ্রহের সিদ্ধান্ত আছে। কিন্তু করোনার জন্য প্রাণী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। আগামী দুই মাসের মধ্যেই প্রাণী সংগ্রহ করা হবে। তখন দর্শক আরো বেশি উপভোগ করতে পারবে। ’ তিনি জানান, চিড়িয়াখানার তহবিলে প্রাণী সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত টাকা জমা আছে।

কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে প্রায় ১১ একর জমির ওপর এই চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক এবং বর্তমান সময়ের পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘকাল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল এটি। বেসরকারি পর্যায়ের এই চিড়িয়াখানা পরিচালনার জন্য একটি পর্ষদ আছে। সেই পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদাধিকার বলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক।

দীর্ঘকাল জীর্ণ থাকার পর ২০১৫ সাল-পরবর্তী সময়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসচিবের দায়িত্ব পান। তিনিই মূলত এই চিড়িয়াখানার নিজস্ব তহবিলের টাকা দিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। ২০১৫ সাল থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে চিড়িয়াখানার ভৌত কাঠামো উন্নয়নে।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিলে প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি জমা আছে। চিড়িয়াখানায় ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মী নিয়োজিত আছেন। তাঁরা সরকারি কর্মীদের মতোই বেতন-ভাতাদি পান। চিড়িয়াখানায় ৩২টি শেডে ৬৬ প্রজাতির ৬২০টি প্রাণী আছে। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন দুই হাজার দর্শনার্থী আসে। গত শুক্রবারসহ ছুটির দিনে আসে প্রায় ৯ হাজার। প্রতিটি টিকিটের মূল্য রাখা হয় ৫০ টাকা। শুধু টিকিট বিক্রি করে চিড়িয়াখানা মাসে গড়ে আয় করে ৫০ লাখ টাকা। কর্মীর বেতন, পশু খাদ্যসহ অন্যান্য ব্যয় হয় প্রায় ১৮ লাখ টাকা। বাকি ৩২ লাখ টাকার মতো তহবিলে জমা হয় প্রতি মাসে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. মমিনুর রহমান বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ৪০ একর পাহাড়ে ‘নাইট জু’ চালুর উদ্যোগ নিতে চান তাঁরা। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পার্ট-২ হিসেবে এটি চালু করা হবে।



সাতদিনের সেরা