kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

বিশেষ লেখা

পাচারকারীদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে

শরিফুল হাসান

৩০ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পাচারকারীদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে

শরিফুল হাসান

ভাবুন তো একবার, এত বড় এই পৃথিবীর কোনো এক শহরের ছোট্ট এক কক্ষে বন্দি আপনি। যেকোনোভাবে হোক, আপনি পাচারের শিকার। স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার তো নেই-ই, উল্টো নিয়মিত নিপীড়ন করা হয়। কখনো সেটা শ্রম শোষণ, কখনো বা যৌন নিপীড়ন বা অন্য কোনোভাবে নিপীড়ন।

বিজ্ঞাপন

মানবাধিকারের কী চরম লঙ্ঘন, তাই না?

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, আজকের পৃথিবীর অন্তত আড়াই কোটি মানুষকে এই ভয়ানক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, যারা কোনো না কোনোভাবে মানবপাচারের শিকার। আর এই মানবপাচারকে ঘিরে পৃথিবীতে লাখো কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে। কমবেশি কিছু উদ্যোগ নিলেও মানবপাচার রোধে ন্যূনতম যা করা প্রয়োজন, এই পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ সেটি করতে পারেনি।

এর মানে, পৃথিবীতে রাষ্ট্র বা সরকারগুলোর চেয়ে পাচারকারীরা এগিয়ে। আসলেও তাই। মানবপাচার একটা সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং পাচারকারীরা দেশে-বিদেশে সংঘবদ্ধ। কিন্তু সেই তুলনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা পিছিয়ে। ফলে পাচার বন্ধ হচ্ছে না।

না, কোনো একক দেশ নয়, মানবপাচার একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সাধারণত জোরপূর্বক শ্রম, যৌন দাসত্ব অথবা পাচারকৃত মানুষদের ব্যাবসায়িক যৌন শোষণমূলক কাজে নিয়োজিত করা কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পাচার হয়ে থাকে। একটা দেশের ভেতরে যেমন পাচারের ঘটনা ঘটতে পারে, তেমনি পাচার হতে পারে দেশের বাইরেও।

আসলে মানবপাচার হলো এমন এক ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ, যেখানে মানুষকে বাণিজ্যিক পণ্যের মতো ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। একে তাই আধুনিক দাস প্রথাও বলা হয়, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় পদে পদে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে শোষণ করা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ যৌন শোষণের শিকার। এসবের মাধ্যমে কয়েক শ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা চলছে।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কমবেশি পাচারের সমস্যা থাকলেও আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে যেখানে দারিদ্র্য ও সহিংসতা বেশি, সেখানে পাচারের ঝুঁকি অনেক বেশি। পাচারকারীরাও সেখানে অনেক বেশি সক্রিয়। করোনার বৈশ্বিক মহামারি মানুষকে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে ফেলেছে। ফলে মানবপাচারের ঝুঁকিও বেড়েছে।

দুঃখজনক হলো, বিশ্বে পাচারের শিকার মানুষের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী ও কিশোরী। মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের এক-তৃতীয়াংশই আবার শিশু। নিম্ন আয়ের দেশগুলো ধরলে সেখানে পাচারের শিকারের অর্ধেকই শিশু, যাদের বেশির ভাগকে জোরপূর্বক শ্রমের জন্য কিংবা যৌন শোষণের জন্য পাচার করা হয়।

এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার একাধিক অঞ্চলে চলমান সশস্ত্র সংঘাত এবং দরিদ্র সামাজিক অবস্থাই মানবপাচারের পেছনের কারণ। এই অঞ্চলের অনেক দেশ থেকে নারীদের সাধারণত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোতে পাচার করা হয়। সেখানে তাদের যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে নারী ও কিশোরীদের জোরপূর্বক শ্রমিক, যৌনদাসী বানানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এবারের প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে শরণার্থী যে দেশে পালিয়ে গেছে সেখানে পাচারের শিকার হতে পারে। এবারের প্রতিবেদনে ১২টি দেশের একটি পৃথক তালিকা রয়েছে, যারা শিশু সেনা নিয়োগ করে বা নিয়োগ দেওয়ার মধ্যে রাশিয়া এবং নতুন রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষক বিভাগে অন্তর্ভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশও রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অন্যদিকে এই প্রতিবেদন নিয়েও অনেক দেশ পাল্টা প্রশ্ন তুলছে। যেমন চীন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে সত্যকে উপেক্ষা করে ও বিশ্বকে প্রতারিত করার জন্য মানবপাচার বিষয়ে মিথ্যা ‘রিপোর্ট’ তৈরি করে আসছে। প্রকৃতপক্ষে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের এক নম্বর মানবপাচারকারী দেশ।

বৈশ্বিক এই আলোচনা থেকে ফিরি বাংলাদেশে। একসময় মানবপাচারের উৎস দেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন ট্রানজিট ও গন্তব্য দুই হিসাবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত। অন্তত ৩০টি জেলা আছে যার এক পাশে ভারত আরেক পাশে বাংলাদেশ। ফলে খুব সহজেই বাংলাদেশের নারী ও কিশোরীদের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পাচার করে ভারতে নিয়ে যায় পাচারকারীরা।

বাংলাদেশের আরেক দিকে মিয়ানমার। সেখান থেকে অন্তত ১৫ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে। এই রোহিঙ্গারাও এখন পাচার হচ্ছে। ২০১৫ সালে সমুদ্রপথ দিয়ে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচার এবং গণকবরের কথা তো সারা বিশ্বে আলোচিত।  

বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ এখন বিদেশে। লোকজন ভাবে, বিদেশে চলে গেলেই ডলার কিংবা রিয়াল আয়। এই লোভের কারণে শ্রম অভিবাসনের নামে পাচার বাড়ছে। শুনে অবাক হতে পারেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যে দেশগুলোর লোক ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ এখন সেই তালিকায় তৃতীয়। ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১২ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি এভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। আর গত এক যুগে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছে প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশি।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের কথা বলে অনেককেই বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ আছে। দুবাইয়ে বিভিন্ন ডান্স ক্লাবে কাজের কথা বলে নারী পাচার করা হচ্ছে। এমনকি সিরিয়ায়ও অনেককে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তবে এর সঠিক কোনো তথ্য নেই।

একইভাবে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয় তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ভারতে পাচার হওয়া প্রায় দুই হাজার নারীকে গত ১০ বছরে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আমরা পাচারের শিকার ৬৭৫ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছি, ১৬ থেকে ২০ বছরের কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি পাচারের শিকার। এর পরই আছে ১১ থেকে ১৫ বছরের কিশোরীরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর শুধু ওই আইনেই সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ মামলারই কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। ভুক্তভোগীরা বলছে, সঠিক সময়ের মধ্যে বিচারকাজ শেষ না হওয়ায় এবং পাচারকারীদের শাস্তি না হওয়ার কারণে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। আর অসহায় হয়ে পড়েছে পাচারের শিকার লোকজন।

প্রশ্ন হলো, পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ কী করছে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ সরকার পাচার নির্মূলের সর্বনিম্ন মান পূরণ করতে পারেনি, তবে সেটি করার স্বার্থে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তি প্রদানে সরকারের প্রচেষ্টা বেড়েছে। এ ঘটনায় একজনের সংসদ সদস্য পদ বাতিল বহাল রয়েছে।

এ ছাড়া মানবপাচারের বিচারে ২০২১ সালের আগস্টে সাতটি ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। এ ছাড়া জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রম কনভেনশনের প্রটোকল অনুসমর্থন করেছে, যেগুলো প্রশংসনীয়।

সমস্যা হলো, সমাধান কী? মানবপাচার এমন একটি সংকট, যেটি কোনো দেশের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। পাচার প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি সবার কাজে সমন্বয়ও দরকার। লোকজনকে যেমন সচেতন করতে হবে, তেমনি পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে হবে, তাদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে, বিচার করতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। সারা পৃথিবীতে আজ ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বাড়ছে। পাচারকারীরাও দারুণ সক্রিয় সেখানে। যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক বিয়ে এবং অন্যান্য নিপীড়নের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফরমের মাধ্যমেও আজকাল পাচার হচ্ছে। এমনকি শিশুদেরও পাচার করা হচ্ছে।

একই ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশেও। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রগ্রাম এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় আমরা দেখেছি, পাচারকারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংকটে থাকা পরিবারের শিশু-কিশোরীদের পাচারের জন্য টার্গেট করছে। ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি কিংবা নায়িকা বা মডেল বানানোর লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাদের মানব পাচার চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

এ কারণেই বোধ হয় এ বছর মানবপাচারবিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘প্রযুক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার’। মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়টি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সিদ্ধান্ত হয়, ৩০ জুলাই সারা পৃথিবী মানবপাচারবিরোধী দিবস পালন করবে। বাংলাদেশে আজ প্রথমবারের মতো সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা সবার সমন্বয়ে দিনটি পালন করা হবে।

আর এই সমন্বয়টাই দরকার। অনলাইনে হোক কিংবা অফলাইনে, কী সরকারি সংস্থা কী বেসরকারি সংস্থা, হোক এশিয়ার কোনো দেশ কিংবা ইউরোপ, মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। সেই সমন্বয় যেমন হতে হবে দেশে দেশে, তেমনি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বেই সেই সমন্বয় থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, পাচারকারীরা যদি আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকে, তাহলে পাচার বন্ধ হবে না। কাজেই এগিয়ে থাকতে হবে আমাদেরই।

লেখক : শরিফুল হাসান, প্রগ্রাম হেড, মাইগ্রেশন প্রগ্রাম ও ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভস, ব্র্যাক

 



সাতদিনের সেরা