kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

কুড়িগ্রাম-সিলেটে উন্নতি রাজবাড়ীতে অবনতি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কুড়িগ্রাম-সিলেটে উন্নতি রাজবাড়ীতে অবনতি

কুড়িগ্রাম ও সিলেটে গতকাল শুক্রবার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল। তবে কুড়িগ্রামে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নদীভাঙনের তীব্রতা। বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকট প্রকট হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে এক সপ্তাহ পর গতকাল পানি বেড়েছে। এতে চারটি উপজেলার বেড়িবাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল আরো পানিতে তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর খাদ্যের সংকট।

কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি কিছুটা কমলেও বিকেল ৩টায় ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার দুই সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম সদর ও উলিপুর উপজেলার অন্তত ৫০টি চর গ্রাম ও নদীসংলগ্ন গ্রামের নিম্নাঞ্চল, বিস্তীর্ণ এলাকার পাট, ভুট্টা, বীজতলা, সবজিসহ ফসলের ক্ষেত প্লাবিত রয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। যাতায়াতের রাস্তা ডুবে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে চরবাসীর।

চলমান বন্যায় তিস্তা নদীর ১৩টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ১৫ দিনে রাজারহাটের সরিষাবাড়ী, বুড়িরহাট, উলিপুুরের অর্জুন, বজরাসহ কয়েকটি এলাকায় শতাধিক বাড়ি ও কয়েক শ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের হকের চর, গুঁজিমারী, রৌমারী ও রাজীবপুরের কয়েকটি চরের মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজবাড়ীতে আরো প্লাবিত হওয়া উপজেলাগুলো হলো সদর গোয়ালন্দ, কালুখালী ও পাংশা উপজেলা (বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল)। চরাঞ্চলের মানুষরা যেসব ফসলি মাঠে গবাদি পশুর খাবার সংগ্রহ করত, সেসব পানিতে তলিয়ে আছে। এতে পশুর খাবার নষ্ট হওয়ায় মানুষ বিপাকে পড়েছে। নৌকায় করে দূর-দূরান্ত থেকে খাবার জোগান দেওয়া কষ্টকর হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর দৌলতদিয়া গেজ স্টেশন পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার পাঁচ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

খাবার সংগ্রহের জন্য গবাদি পশুগুলোকে নৌকায় করে চরাঞ্চলের উঁচু স্থানে নিতে হচ্ছে; কিন্তু পানি বেড়ে এসব এলাকাও তলিয়ে যাচ্ছে। বাজারে খাবারের দাম অত্যধিক। এতে খাবার চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

রাজবাড়ী কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলায় ৯ হাজার বিঘা বাদাম, কয়েক হাজার একর ফসলি জমি ও গবাদি পশুর চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চল ও আশপাশে গবাদি পশুর খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। পানি আরো বাড়লে সমস্যাও বাড়বে।

সুনামগঞ্জে সুরমা নদীসহ অন্যান্য নদ-নদী ও বানে ডুবে থাকা এলাকা থেকে ধীরগতিতে পানি নামছে। সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ছয় সেন্টিমিটার কমেছে। গত দুই দিন পানি বাড়ায় নতুন করে শহরের কয়েকটি রাস্তাঘাটসহ নিম্নাঞ্চলে আবার পানি বেড়েছে। তবে গতকাল সকালে বৃষ্টিপাত থাকলেও দুপুর থেকে রোদ ওঠায় পানি কিছুটা কমতে থাকে। বিকেলে সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ৭.৬৬ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হয়। এটি বিপত্সীমার ১৪ সেন্টিমিটার নিচে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকালও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বানভাসিদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বন্যার্তদের মধ্যে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা, এক হাজার ৩৫৬ মেট্রিক টন জিআর চাল, ১১ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ২৮ হাজার প্যাকেট বিশেষ খাবার, ১০ লাখ টাকার শিশুখাদ্য ও ১০ লাখ টাকার গো-খাদ্যের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বিআইডাব্লিউটিএ থেকে সাত হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায় থেকে ১৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা, দুই লাখ ৬১ হাজার ৯৩৬ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ২৬ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হচ্ছে। তবে পানি বিলম্বে নামছে। বৃষ্টিপাত না হলে পানি নেমে বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে।

সিলেটে গতকাল ভোরে বৃষ্টিপাত হলেও সারা দিন ছিল রৌদ্রজ্জ্বল। সুরমা ও কুশিয়ার নদীর পানি জেলার সব কটি পয়েন্টে আগের দিনের তুলনায় কমেছে। এতে জেলার ১৩টি উপজেলাতেই বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে শেষ চব্বিশ ঘণ্টায়। পাউবো সিলেটের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি কমেছে জকিগঞ্জের অমলসিদে কুশিয়ারার পানি। আগের দিনের তুলনায় নদীর পানি ১২২ সেন্টিমিটার কমে গতকাল সন্ধ্যায় বিপত্সীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কানাইঘাটে সুরমার পানি গতকাল বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আগের দিনের তুলনায় যা ১০ সেন্টিমিটার কম। বিপত্সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া সিলেট পয়েন্টে সুরমার পানি আগের দিনের তুলনায় গতকাল আরো চার সেন্টিমিটার কমেছে। এদিকে বিয়ানীবাজারের শেওলায় কুশিয়ারার পানি আরো তিন সেন্টিমিটার কমে গতকাল বিপত্সীমার ৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফেঞ্চুগঞ্জেও কুশিয়ারার পানি আগের দিনের তুলনায় এক সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ১০২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গোয়াইনঘাটের সারিঘাটে সারি নদীর পানি কিছুদিন ধরে বিপত্সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগের দিনের তুলনায় গতকাল নদীটির পানি ৫০ সেন্টিমিটার কমেছে।

নদীর পানি কমতে থাকায় আগের তিন দিন পানি বৃদ্ধিতে আতঙ্কে থাকা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পানি স্থানভেদে এক থেকে দেড় হাত নেমেছে। একইভাবে বাড়তির দিকে থাকা সিলেটের গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটের পানি কমেছে শেষ চব্বিশ ঘণ্টায়। অপরিবর্তিত থাকা বাকি উপজেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতি আগের দিনের তুলনায় গতকাল উন্নতির দিকে ছিল। প্রতিটি উপজেলায়ই বন্যার পানি কমবেশি কমেছে।

গোয়াইনঘাটোর তোয়াকুল ইউনিয়নের ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টি না হওয়ায় শুক্রবার সকাল থেকে সারা দিনই বন্যার পানি অল্প অল্প করে কমতির দিকে রয়েছে। বৃষ্টি না হলে হয়তো বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। ’

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট এবং কুড়িগ্রাম, রাজবাড়ী ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি]

 



সাতদিনের সেরা