kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ আগস্ট ২০২২ । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১২ মহররম ১৪৪৪

কুড়িগ্রামে আবার বন্যা অবনতি সুনামগঞ্জে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কুড়িগ্রামে আবার বন্যা অবনতি সুনামগঞ্জে

এখনো বন্যার পানিতে ডুবে আছে অনেক ঘরবাড়ি। সুনামগঞ্জের নোয়াগাঁওয়ের নতুনপাড়া এলাকা থেকে গতকাল তোলা। ছবি : শামীম শামস

উজানের বৃষ্টি ও ঢলে আবার বন্যা দেখা দিয়েছে কুড়িগ্রামে। ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। ফলে গতকাল বৃহস্পতিবার নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম সদর ও উলিপুর উপজেলার অন্তত ৬০টি চর গ্রাম ও নদীসংলগ্ন গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।

বিজ্ঞাপন

দিনাজপুরেও নদ-নদীর পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে সুনামগঞ্জে।

সিলেট জেলার নিম্নাঞ্চল এখনো বন্যাকবলিত। এর মধ্যে নদীর পানি বাড়ছে তিন দিন ধরে। বন্যার পানিও বাড়ছে অনেক উপজেলায়। ফলে আতঙ্কে লাখো মানুষ। অবশ্য কিছু উপজেলায় আগের রাত থেকে পানি বাড়লেও গতকাল দুপুর থেকে কমছিল। পঞ্চগড়ে প্লাবিত এলাকাগুলোর ঘরবাড়ি থেকে এক দিন পরই পানি নেমে গেছে। নীলফামারীতে গতকাল তিস্তা নদীর পানি কমে বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে সিরাজগঞ্জ জেলায় যমুনা নদীর পানি আবার (তৃতীয় দফায়) বাড়ছে। অবশ্য বন্যার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

কুড়িগ্রামে ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় অনেকেই উঁচু ভিটা, রাস্তা ও বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। পাট, ভুট্টা, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত ডুবে গেছে। গ্রামীণ সড়কগুলোর ওপর পানি প্রবাহিত হওয়ায় যাতায়াতের ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ।

কুড়িগ্রাম পাউবো সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের উজানে বৃষ্টিপাত কমায় পানি কমতে শুরু করেছে। কয়েক দিন আরো পানি কমতে পারে। তবে রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সবুর জানান, ২ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মাঝারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউপির আতাউর রহমান মিন্টু জানান, তাঁর ইউনিয়নের মেকলি, পূর্ব ও পশ্চিম ধনিরাম, বড়ভিটা ও বড়লই গ্রামের বেশির ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় তিন হাজার পরিবারের ১৫ হাজার মানুষ। সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন জানান, কদমতলা, শিতাইঝাড়, নওয়াবশ, গোবিন্দপুরসহ ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় সব গ্রামে পানি ঢুকেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২০ হাজার মানুষ।

সুনামগঞ্জে ভারি বর্ষণে গতকাল সুরমা নদীর পানি আবার বেড়েছে। এতে আবার প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, সুনামগঞ্জ ও ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে। সুনামগঞ্জ পয়েন্টে গতকাল সন্ধ্যায় সুরমার পানি ৭.৭২ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। যদিও এখনো বিপত্সীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচে আছে। জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে। ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টা সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে।

এদিকে বন্যাকবলিতদের মধ্যে গতকালও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও পুলিশ। ‘দুর্যোগপীড়িতদের পাশে বাংলাদেশের লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী ও প্রকাশক’ সুনামগঞ্জের দেওয়াননগর, বৈষভেড়, নোয়াগাঁও ও কলাইয়া গ্রামে চার লাখ টাকা অর্থ সহায়তা দিয়েছে।

সিলেটে অনেক উপজেলায় পানি বাড়ায় রাতে নির্ঘুম থাকছে মানুষ। কারণ পানি নেমে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফেরা মানুষ ঘরদোর মেরামত ও পরিষ্কার শেষ করে ওঠার আগেই আবার ঘরে পানি ঢুকছে। অনেককে ফিরতে হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। তবে গতকাল সকালে নদীগুলোতে পানি বাড়লেও বিকেলে কমতে দেখা গেছে বেশির ভাগ পয়েন্টে।

পাউবোর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গতকাল সকাল ৬টায় সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ৭৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সন্ধ্যা ৬টায় তা বিপত্সীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সিলেট পয়েন্টে সুরমার পানি গতকাল দুই সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমা ছুঁই ছুঁই করছে। জকিগঞ্জের অমলসিদে কুশিয়ারা নদীর পানি গতকাল বিকেলে বিপত্সীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। অথচ ভোর ৬টায় বিপত্সীমার ১০১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিয়ানীবাজারে কুশিয়ারা নদীর পানি গতকাল সকালে বিপত্সীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যা ৬টায় তা আট সেন্টিমিটার কমে। ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারার পানি সকালে বিপত্সীমার ১০৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যা ৬টায় কমেছে এক সেন্টিমিটার।

সিলেটে আগের রাতে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের পর গতকাল সকাল থেকেই সূর্যের দেখা পাওয়া যায়নি। নগর এলাকায় সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থাকলেও গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় সকালে অনেক বৃষ্টি হয়েছে। এতে নদ-নদীর পানি কিছু পয়েন্টে বেড়েছে। সকাল থেকে বিভিন্ন উপজেলায় পানি বাড়তে থাকলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। তবে বিকেল থেকে বন্যার পানি কমে।

কোম্পানীগঞ্জের পুটামারা গ্রামের তৈয়ব আলী বলেন, ‘ছয় দিন আগেও দোকান ও বাড়িঘরে কোমর সমান পানি ছিল। ধীরগতিতে পানি কমে ঘর ও দোকান থেকে সরে হাওর পর্যন্ত গিয়েছিল। কিন্তু দুই দিন ধরে পানি বাড়ছে। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না, কখন বাড়িঘর বা দোকানে পানি ওঠে। ’

গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, উপজেলায় বন্যার পানি আগের রাত থেকে বাড়লেও বিকেলে কমতে থাকায় কিছুটা স্বস্তিতে মানুষ।

তবে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

উজান থেকে আসা ঢলে বুধবার দুপুর থেকে দিনাজপুরে প্রধান তিনটি নদী পুনর্ভবা, আত্রাই ও ছোট যমুনার পানি বাড়ছে। সন্ধ্যায় আত্রাই নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে। গতকালও পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে বিভিন্ন স্থানে আত্রাইয়ের দুই তীরে ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীগর্ভে চলে গেছে অসংখ্য গাছ। ভাঙনের ঝুঁকিতে বহু বাড়ি।

দিনাজপুর পাউবোর পানি সার্ভেয়ার মাহাবুব আলম জানান, ২৪ ঘণ্টায় পঞ্চগড় জেলায় বৃষ্টিপাত বেশি হলে দিনাজপুরের নদ-নদীগুলোর পানি আরো বাড়বে। দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুর জেলায় হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে।

সিরাজগঞ্জ শহরের হার্ডপয়েন্ট এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিপত্সীমার ৮০ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার ৭০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

গতকাল বিকেলে পঞ্চগড় পৌর এলাকার নিমনগর, রামেরডাঙ্গা, তুলারডাঙ্গা, কামাতপাড়া, ইসলামবাগ, নিমনগর, খালপাড়া, কায়েতপাড়া, ডোকরোপাড়া, নতুনবস্তি খালপাড়া, পৌর খালপাড়া, সদর উপজেলার রাজমহলসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেছে। উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়া লোকজন ফিরেছে বাড়িতে। কারো কারো উঠানে-রান্নাঘরে রয়েছে কাদা। অনেকে ঘর পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। পানির দুর্গন্ধ থাকলেও তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি কারো। স্থানীয়রা নদীর দুকূলে উঁচু করে লোকালয় রক্ষাবাঁধ নির্মাণের দাবি জানায়। রাজমহলের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মাজেদা বেগম বলেন, ‘সরকারিভাবে ১০ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে আমাদের। ’

কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢলে পঞ্চগড়ে করতোয়াসহ বিভিন্ন নদীর পানি বেড়ে বুধবার প্লাবিত হয় বিভিন্ন এলাকা।

নীলফামারীর টেপাখড়িবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান মো. ময়নুল হক বলেন, বুধবার তিস্তা নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। বৃহস্পতিবার পানি কমায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়। তবে পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে বুধবার নদীর পানি বেড়ে বিপত্সীমার সাত সেন্টিমিটার ওপরে ওঠে। [প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]

 

 

 

 



সাতদিনের সেরা