kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

ইসিতে সংলাপ শেষ

ইভিএমে পুরো নাকি অর্ধেক ভোট হবে, সিদ্ধান্ত পরে

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৯ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইভিএমে পুরো নাকি অর্ধেক ভোট হবে, সিদ্ধান্ত পরে

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের শেষ দিনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা ইভিএমের অন্ধ গ্রাহক ছিলাম না। সব আলোচনা লিপিবদ্ধ করেছি। আমাদের সামর্থ্য কতটুকু, তা দেখব। এরপর সিদ্ধান্ত নেব, সম্পূর্ণ বা ফিফটি ফিফটি করব কি না।

বিজ্ঞাপন

আগস্ট থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করব, তখন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আমরা কিন্তু কোনো বাজে মতলব নিয়ে আসিনি বা আমাদের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো আশ্বাসও কেউ কাউকে দেননি। কোনো রাজনৈতিক চাপও আমাদের ওপর নেই। ’

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা ইভিএম চাই। ৩০০ আসনে ইভিএম হলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ’

গতকাল মঙ্গলবার মোট ১৪টি দলকে সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ  সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট ও গণফোরাম সংলাপে অংশ নিয়েছে। গণফোরাম গত ১৯ জুনের সংলাপের জন্য আমন্ত্রিত ছিল। কিন্তু ওই সংলাপে উপস্থিত না হতে পারায় সময় চাইলে ইসি গতকালের আমন্ত্রিতদের সঙ্গে দলটিকে যুক্ত করে।

গতকালের বৈঠকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) অংশ নেয়নি। এর আগে গত ১৯ জুন ও ২১ জুনের বৈঠকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) অংশ নেয়নি। সব মিলিয়ে অংশ নেয়নি মোট ১০টি দল। আবার যে ২৯টি দল অংশ নিয়েছে তাদের মধ্যে জাতীয় পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দল ইভিএমের বিপক্ষে মত দেয়। গতকাল অংশ নেওয়া ১০টি দলের মধ্যে মাত্র চারটি দল ইভিএমের পক্ষে মতামত দেয়।

সিইসি গতকালের সংলাপের শুরুতেই বলেন, ‘আমরা যখন দায়িত্ব নিই, কিছু দিন পর থেকেই ইভিএম নিয়ে কথাবার্তা পত্রপত্রিকায় চাউর হয়েছিল। এর বিপক্ষেই বেশি কথাবার্তা হয়েছে। আমাদেরও শুরু থেকে ইভিএম সম্পর্কে সে রকম ধারণা ছিল না। আমরা এরই মধ্যে ইভিএম নিয়ে অনেক কাজ করেছি। এখন আমাদের মোটামুটি ধারণা আছে। ’

সিইসি আশ্বস্ত : সংলাপে সমাপনী বক্তব্যে ওবায়দুল কাদেরের উদ্দেশে সিইসি বলেন, ‘আমরা আশা করব, আপনারা সরকারে থেকে আমাদের সরকারি সাহায্য-সহায়তা দেবেন। আমরা যে সহায়তা চাইব তা-ও সাগ্রহে প্রদান করবেন। ’

এ সময় ওবায়দুল কাদের সম্মতিসূচক মাথা নাড়লে সিইসি বলেন, ‘যাক, আপনি বলেছেন, এ জন্য আমরা আশ্বস্ত বোধ করছি এবং এই আশ্বাস নিয়ে আমরা আগামী দিনে কাজ করে যাব। নির্বাচনের মাঠ সামগ্রিক একটা বিষয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামষ্টিক একটা বিষয়। কাজেই আমাদের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। নির্বাচন কমিশন একাকী সফলতা অর্জন করতে পারবে না, যদি না অংশীজনরা তাদের দিক থেকে সহায়তার হাত সম্প্রসারণ করেন। ’

সিইসি আরো বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, সেই সময় (নির্বাচনের সময়) সরকার থাকবে, কিন্তু আওয়ামী লীগ থাকবে না। সরকার আর আওয়ামী লীগ এক নয়। আমরা সরকারের কাছ থেকে হেল্প নেব। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আমরা কোনো হেল্প নেব না। প্রশ্নই আসে না। কাজেই আমরা বিশ্বাস করি, সরকার ও আওয়ামী লীগের মধ্যে যে বিভাজন আছে, সেই বিভাজন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমি ?উচ্চারণ করতে শুনেছি। উনি এ ব্যাপারে খুবই স্পষ্ট। সরকারের তরফ থেকে আমাদের সহায়তা দেওয়া হবে। ’

কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা সেই সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। সেই সহায়তা আমরা আদায় করে নেব। যে সহায়তা আমাদের প্রাপ্য সে সহায়তা আমাদের দিতে হবে। সে সহায়তা যদি দেওয়া না হয়, আপনারা যদি শুধু আশাই করেন যে সুন্দর ইলেকশন হবে, তাহলে সুন্দর ইলেকশন হয়তো হবে না। আরেকটা জিনিস হলো, আমরা আপনাদের মাঝে ঐক্য চাচ্ছি। নির্বাচনের মাঠে সবাই থাকবেন। বিভিন্ন পার্টির উপস্থিতি কিন্তু এক ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টি করে নির্বাচনের মাঠে। ’

ওবায়দুল কাদের যা বললেন : সংলাপ শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকে যে রাজনৈতিক দলগুলো এখানে আসছে, আমার মনে হয়, বেশির ভাগই ইভিএমের পক্ষে বলেছে। আমরা সবার কথা শুনেছি। ইভিএম নিয়ে বিরুদ্ধেও বলেছেন দু-একজন। এটা তো গণতন্ত্র। বিউটি অব ডেমোক্রেসি। বিরুদ্ধে তো বলবেনই। ভিন্নমত থাকতেই পারে। সেটাতে কোনো অসুবিধা নেই। ’ 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, আমার বিশ্বাস যে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে। আমরাও চাই বিএনপি আসুক। আমরাও চাই একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। সে কারণে বিএনপির মতো একটা বড় দল বাইরে থাকবে, এটা আমরা চাই না। ’

বিএনপি নির্বাচনে আসবে কিভাবে জানলেন, আপনারা কি বিএনপির চাহিদার আংশিক পূরণ করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তারা অনেক কথাই বলে, শেষ পর্যন্ত আসল কথায় চলে আসে। আমি একটা কথা বলি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ এটা বিএনপির অধিকার। সরকারের সুযোগ বিতরণ নয়। এটা একটা সুযোগ নয় যে সরকার বিতরণ করবে। এটা হচ্ছে বিএনপির অধিকার। দল হিসেবে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে নির্বাচনে তারা আসবে। আমরা এটাই বিশ্বাস করি। ’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দল হিসেবে আমরা বলেই যাচ্ছি। আমরা পদ্মা সেতুতেও দাওয়াত দিয়েছি। দেখেন, আমাদের একটা পজিটিভ অ্যাটিচ্যুড আছে। সে কারণে আমরা তাই করি। তারা নিজেরাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবে। হয়তো শেষ বেলায়। ঘোলা করে খাবে আর কি। ’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমি অবাক হয়ে শুনি ফখরুল সাহেব বলেন, এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব না। ইলেকশন তো এই সরকারের অধীনে হবে না। ইলেকশন হবে ইলেকশন কমিশনের অধীনে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকার যে যে সহযোগিতা, ফ্যাসিলিটিজ দরকার, সরকার সেটা দেবে। সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস আমরা আগেও দিয়েছি। এখনো আমরা নির্বাচন কমিশনকে আশ্বাস দিয়েছি। আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব। ’

আপনারা কি সব আসনে ইভিএম চান—এ প্রশ্নে তিনি বলেন,  ‘আমরা চাই। আমরা যখন দেখেছি রাজশাহীর একটা ইউনিয়ন, একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা ইউনিয়ন, সেখানে দিনের আলোও ঠিকমতো যায় না, এই রকম একটা জায়গায় ইভিএমে ইলেকশন হয়েছে। প্রচুর উপস্থিতি এবং মহিলারা পর্যন্ত লম্বা লাইন দিয়ে ভোট দিয়েছে। কাজেই ইভিএম অজনপ্রিয়—এ কথা বলার এখন আর কোনো প্রয়োজন নেই। ’

ইভিএম নিয়ে চার মাস ধরে যা হচ্ছে :  কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গত ১৩ ও ২২ মার্চ এবং ৬ ও ১৮ এপ্রিল দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসে। ওই সংলাপে অংশগ্রহণকারী বেশির ভাগই বিতর্ক এড়াতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন।   পরে ওই চার দিনের সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচন কমিশন লিখিতভাবে জানিয়ে দেয়, ‘ইভিএমের শুদ্ধতা ও অপপ্রয়োগ রোধ নিশ্চিত করতে কমিশন এরই মধ্যে কয়েকটি সভা করেছে। পরীক্ষা ও পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যে আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশিষ্টজনদের নিয়ে আরো পর্যালোচনাসভার আয়োজন করা হবে। তারপর কমিশন আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার বা ব্যবহারের পরিধি ও বিস্তৃতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। ’

গত ৭ মে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সম্ভাবনার কথা জানান। এর পর থেকেই এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কতটা সক্ষম—এ প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, সব আসনে ইভিএমে ভোট নিতে হলে প্রায় সাড়ে চার লাখ মেশিনের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আছে দেড় লাখ মেশিন। সে ক্ষেত্রে কিনতে হবে আরো তিন লাখ এবং এতে ব্যয় হতে পারে ছয় হাজার কোটি টাকার ওপরে।

গত ২৫ মে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মতিন সাদ আবদুল্লাহ, মো. মাহফুজুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দিয়ে ইভিএম পরীক্ষা করায় নির্বাচন কমিশন। পরীক্ষা শেষে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘একটা মেশিন খুলে দেখেছি। এটা অত্যন্ত চমৎকার একটা মেশিন। আমার মনে হয়, পৃথিবীর কম দেশেই এই মূল্যবান জিনিস আছে। যাঁরা এটি তৈরি করেছেন, আমি তাঁদের অভিনন্দন জানাই। এটি অত্যন্ত সহজভাবে চালানো সম্ভব। ’

গত ৯ জুন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ শেষে সিইসি বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকলেও এটি ব্যবহার করে সহিংস নির্বাচনকে অহিংস করে তোলা সম্ভব। অনেকেই অর্ধেক আসনে হলেও ব্যবহার করতে বলেছেন। তবে আমরা এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। ’ ওই দিন মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান গোলাম রহমান ভুইয়া বলেন, ‘ইভিএমের ভেতরে জিনের উপস্থিতি আছে। সেই জিন দূর করতে হবে। ’

এরপর গত ১২ জুনের সংলাপে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও  সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তারা প্রায় সবাই ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দেন।   

 



সাতদিনের সেরা