kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

দুর্গম এলাকায় ত্রাণ যাচ্ছে না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্গম এলাকায় ত্রাণ যাচ্ছে না

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ প্রায় সবখানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সিলেট-সুনামগঞ্জে সরকারি-বেসরকারি প্রচুর ত্রাণ যাচ্ছে। কিন্তু কেউ পাচ্ছে তো কেউ পাচ্ছে না। সড়ক যোগাযোগ একরকম বিচ্ছিন্ন থাকায় নৌপথে ত্রাণ যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু নৌকায় দুর্গম এলাকায় যাওয়া যাচ্ছে না।

পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার্ত মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। অনেকে বাড়িঘরে ফিরলেও খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে আছে। বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ায় অনেকে ফিরতে পারছে না। অনেক এলাকায় মাছ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কিছু এলাকায় তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে অনেকের ঘুম হারাম।   

এদিকে ত্রাণের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ‘রিলিফ ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে। গতকাল সোমবার জেলা প্রশাসন সভা করে এটিকে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত  নিয়েছে।

জানা গেছে, অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ খুব একটা যাচ্ছে না। এমনকি বন্যার পানিতে আটকে পড়ার চারদিন পরও সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের পাটিমোড়া গ্রামে ত্রাণ যায়নি বলে অভিযোগ ওঠে। গ্রামের স্থানীয় পাটিমোড়া জামে মসজিদের কোষাধ্যক্ষ জমশেদ আলী বলেন, “ঘরের ভেতর চার দিন আটকা ছিলাম। এর মধ্যে কেউ ত্রাণ নিয়ে আসেনি। চার দিন পর ‘কলের গাড়ি’ নামে একটি সংগঠন ত্রাণ নিয়ে আসে। ”

শুধু জমশেদ আলীই নন, সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার বহু মানুষের অভিযোগ, তারা খুব একটা ত্রাণ পায়নি। বন্যার শুরু থেকেই এমন অভিযোগ করে আসছে দুর্গতরা। অভিযোগটি জোরেসোরে ওঠার পর ত্রাণের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওয়েবসাইটটি  (www.reliefmanagement.me) খোলেন। এই ওয়েবসাইটে ঢুকলে পাওয়া যাবে কোন উপজেলায় ত্রাণ গেছে, কারা দিয়েছে, কতটুকু দিয়েছে, কতজন পেয়েছেসহ নানা তথ্য। তেমনি কোথায় ত্রাণ পৌঁছায়নি সে তথ্যও মিলবে। ওয়েবসাইটের অন্যতম উদ্যোক্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আকরাম হোসাইন বলেন, ‘সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য দাতা সংস্থাগুলোর কাছে বাস্তবিক তথ্য প্রদর্শন করার তাড়না থেকে আমরা এ কাজ শুরু করি। ’

জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমানের সভাপতিত্বে গতকাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিলেটের সব বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সভা হয়। সভায় দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণ, ওষুধ সরবরাহ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন বিষয়ে সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মজর আলী বলেন, ‘আমাদের গ্রামের কোনো ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট পানি ওঠার বাকি ছিল না। আমাদের গ্রামটি ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গ্রাম হলেও ত্রাণ আসছে কম। এ ছাড়া ইউনিয়নের শান্তিপুর, তাজনগর, নরুল্লাসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ত্রাণ পাচ্ছে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নৌপথে আমাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। ’

গতকাল জেলার বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ত্রাণ বিতরণ করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তির উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হয়।

জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমরা এখন সব জায়গাতেই ত্রাণ পৌঁছানোর কাজ করছি। ’

মৌলভীবাজারে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা থেকে পানি নামলেও মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। গতকাল দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও ঘরের ভেতর কাদা, কোথাও আবার পচা পানির দুর্গন্ধ। কারোর বাড়ির রাস্তায় পানি, কারোর আবার খাবার পানির সংকট।

জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান জানান, জেলার ৪১টি ইউনিয়নের বন্যায় পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ৬০ হাজার ১১। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ১৪ হাজার ২০টি। ৪৪৭ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

কুড়িগ্রামে ঘরবাড়ি থেকে পানি নামলেও চরাঞ্চলের সড়ক এখনো নিমজ্জিত। অনেকে কলাগাছ ও ড্রামের ভেলা বানিয়ে হাট-বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। রাজারহাট উপজেলার নামা জয়কুমর গ্রামের বাসিন্দা ইনছাফুল হক জানান, একতা বাজার যেতে রাস্তাটি কয়েকটি স্থানে ভেঙে গেছে। গামছা পরে কেউ কেউ পানিতে ডুবে থাকা পথ পাড়ি দিচ্ছে। হাটে কোনো মালামাল বিক্রি করা যাচ্ছে না।   

এ ছাড়া ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গাধরের ৩০টি পয়েন্টে নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে তিস্তার ১৩টি পয়েন্টে বেশ কয়েকটি স্কুল ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের হুমকিতে আছে।

রাজবাড়ী সদর, গোয়ালন্দ, কালুখালী ও পাংশা উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে পদ্মাসংলগ্ন সাড়ে ৯ হাজার বিঘা বাদামসহ আরো কয়েক হাজার বিঘার তিল ও পাট পানির নিচে। অপরিপক্ব হওয়ায় এসব বাদাম তোলা যাচ্ছে না। পানিতে পচে যাচ্ছে। চন্দনী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বাদামচাষি আব্দুর রহিম বলেন, তাঁরা এখন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে।

নেত্রকোনায় পানি কমলেও খালিয়াজুরি, কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, দুর্গাপুর, মদন ও বারহাট্টা উপজেলাসহ জেলায় এখনো লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে রোগবালাই দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও চিকিত্সাসংকটে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গতকাল মোহনগঞ্জের মাঘান সিয়াদার ইউনিয়নের ঘোড়াউত্রা গ্রামে সেনাবাহিনী পাঁচ শতাধিক বন্যার্তকে ত্রাণ দিয়েছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় জানায়, জেলার আট উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো ২৯ হাজার ৯২৮ জন বন্যার্ত অবস্থান করছে। গতকাল পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষক ও মত্স্যচাষীদের।

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা

 



সাতদিনের সেরা