kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

বন্যা পরিস্থিতি

দুর্ভোগ, ত্রাণের জন্য ছোটাছুটি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্ভোগ, ত্রাণের জন্য ছোটাছুটি

ত্রাণের জন্য বন্যার্তদের ভিড়। গতকাল সিলেট নগরের কলাপাড়া থেকে তোলা। ছবি : আশকার আমিন রাব্বি

সিলেটে তিন উপজেলা বাদে সব জায়গায় পানি কমছে। সুনামগঞ্জেও পানি নেমে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অনেকে পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে বাড়ি ফিরেই ক্ষয়ক্ষতি দেখে তারা বিপাকে। ত্রাণের আশায় সম্ভাব্য বিভিন্ন এলাকায় চলছে ছোটাছুটি।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল জানিয়েছে, বন্যাদুর্গত এলাকায়  ২৪ ঘণ্টায় আরো ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৭০।

শেরপুর, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে নতুন করে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কিশোরগঞ্জ, জামালপুর ও এলাকায় সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা চলছে।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গতকাল বৃহস্পতিবার বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। একই দিন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে।

সিলেট জেলায় পাঁচ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি কমতির দিকে। বিভিন্ন পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ছে। এতে সুরমাসংলগ্ন উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে কুশিয়ারাসংলগ্ন উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন বন্যা অবনতির দিকে যাচ্ছে। কুশিয়ারার পানি বাড়ায় জেলার জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা আগেই প্লাবিত হয়। এখন ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগরে বন্যা পরিস্থিতি অবনতির দিকে।

বন্যায় প্লাবিত হয়েছে সিলেটের ওসমানীনগরের আট ইউনিয়নের সব কটি। কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলায় পানি ঢুকতে শুরু করে। শনিবার উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পর রবিবার থেকে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত উপজেলায় এক লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে।

বালাগঞ্জ উপজেলার ছয় ইউনিয়নের সব কটিই প্লাবিত। এর মধ্যে সদর ইউনিয়ন ছাড়াও পশ্চিম গৌরীপুর, পূর্ব পৈলানপুর ও পূর্ব গৌরীপুরের অবস্থা বেশি শোচনীয়। উপজেলার লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের সব কটি বন্যাকবলিত।

জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট উপজেলায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি আছে। তবু মানুষজন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরছে। গোয়াইনঘাটের কান্দিগ্রামে শাহজাহান আহমেদ বলেন, ‘আমরা দুই দিন আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম, সেখানে কিছু ত্রাণ পেয়েছি। কিন্তু বাড়িতে আসার পর আমরা আর কোনো ত্রাণ পাইনি। ’

সুনামগঞ্জে সর্বস্ব হারিয়ে এখন দুর্গতরা ছুটছে ত্রাণের জন্য। ত্রাণবাহী নৌকা ভিড়লেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তারা। গতকাল আলাদাভাবে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন সেনাপ্রধান, র‌্যাবপ্রধান, পুলিশপ্রধান ও বিজিবিপ্রধান। তাঁরা বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন।

সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মঈনপুর গ্রামে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, এখনো অনেক পানিবন্দি আছে। যত দিন প্রয়োজন হবে সেনাবাহিনী সুনামগঞ্জে তত দিন থাকবে।

জেলার তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী ও রান্না করা খাবার বিতরণ করেন আইজিপি বেনজীর আহমেদ। বিজিবি মহাপরিচালক দুপুরে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন।

কিশোরগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল। নতুন করে পানি না বাড়লেও বেড়েছে আশ্রিতদের দুর্ভোগ। হাওরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই দিনে নতুন করে অন্তত ৭৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলার ১০ উপজেলার ৬৪টি ইউনিয়নের মোট ৭৪৪টি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম কালের কণ্ঠকে জানান, নতুন ৩৭ মেট্রিক টন চালসহ মোট ১৭৭ মেট্রিক টন চাল বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

কুশিয়ারা ও হাকালুকি হাওরের পানি বৃদ্ধি পেয়ে মৌলভীবাজারে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। গতকাল সন্ধ্যায় সদর উপজেলার শেরপুর এলাকার খলিলপুর ইউনিয়নের হামরকোনায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর পর থেকে ভাঙন দিয়ে প্রবল বেগে কুশিয়ারা নদীর পানি ঢুকছে। স্থানটি সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মিলনস্থল হওয়ায় পানি খলিলপুর ইউনিয়ন হয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে।

হবিগঞ্জে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ছে। এখন পর্যন্ত জেলার সাতটি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন প্লাবিত। জেলার ২৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ২০ হাজার ৪৬৩ জন। এর মধ্যে ২০০ জন প্রতিবন্ধী।

গতকাল বিকেলে সদর উপজেলার লুকড়া ইউনিয়নের বেকটিটেকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয় ২০টি পরিবার। সেখানে কেউ ত্রাণ পায়নি। এই খবরে হবিগঞ্জ শহর থেকে ইনারহুইল ক্লাব সেখানে দুধ, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাবার বিতরণ করে।

নেত্রকোনায় পানি কমতির দিকে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহন লাল সৈকত জানান, পানি কমতে শুরু করলেও গতকাল কলমাকান্দার উব্দাখালি নদীর পানি বিপত্সীমার ৬৩ সেন্টিমিটার এবং খালিয়াজুরীর ধনু নদীর পানি বিপত্সীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল।

ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ রেলপথে সেতু ভেঙে রেল চলাচল বন্ধ হয় পাঁচ দিন আগে। গতকাল সকালে মোহনগঞ্জ থেকে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে।

জেলার কলমাকান্দায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল সকালে শিখা রানী দাস (২৫) নামের এক নারী ডায়রিয়ায় মারা গেছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৬ জুন থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ৩৬ জন চিকিৎসা নিয়েছে। অনেকে আবার প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ১২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।

শেরপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়া অব্যাহত থাকায় চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের সবজিক্ষেত তলিয়ে যাচ্ছে। সদর উপজেলার চরপক্ষীমারি ও চরমুচারিয়া ইউনিয়নের চুনিয়ার চর, ভাগলদি, কুলুরচর, খাসপাড়া, ডাকপাড়া গ্রামে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ২০ একর জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। কুলুরচর-বেপারিপাড়া গ্রামের নতুন চরের অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। চার শতাধিক পরিবার উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। কামারের চরের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকেছে।

জামালপুরে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। বুধবার থেকে যমুনা নদীর পানি কমতে থাকায় জেলার সাত উপজেলার নিচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। কয়েক দিনের বন্যায় জেলার সাত উপজেলায় গবাদি পশু, বিশেষ করে খামারি পর্যায়ে তেমন ক্ষতি হয়নি।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। ]



সাতদিনের সেরা