kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

সিলেট, সুনামগঞ্জে পানি কমছে

বন্যার্তদের ভাবাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি

► সিলেট, সুনামগঞ্জে ঘরে ফিরছে মানুষ
► কুলাউড়ায় রেললাইনে পানি
► শেরপুরে নদীভাঙনের আশঙ্কা, কিশোরগঞ্জে ডাকাত আতঙ্ক

ইয়াহইয়া ফজল   

২৩ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বন্যার্তদের ভাবাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি

বন্যার পানি কমছে। বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। ফিরে অনেকে দেখছে, কারো ঘরের সব ভেসে গেছে, কারো বা ঘর বিধ্বস্ত। গতকাল সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উড়াকান্দা আমিরপুর গ্রামে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সিলেট-সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার পানি কমছে। যেসব এলাকায় বসতভিটা থেকে পানি নেমে গেছে, সেসব স্থানে লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। বাড়ি ফিরলেও তাদের এখন ভাবাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি। ফেলে যাওয়া বাড়িঘরের আসবাবসহ বেশির ভাগ জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

জমানো ধান পানিতে ভেসে গেছে অথবা পচে গেছে।

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় রেললাইনে পানি উঠেছে। হবিগঞ্জ ও জামালপুরে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কিশোরগঞ্জে ডাকাত আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দুর্গত অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছে না। কুমিল্লা, রাজবাড়ীতে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। নেত্রকোনা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের অনেক এলাকা বন্যাকবলিত। কোথাও কোথাও পানি বাড়ছে। দুর্গত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা চলছে।

বন্যায় দুর্গতদের জন্য গতকাল বুধবার সরকার আরো এক হাজার ৮০০ মেট্রিক টন চাল এবং এক কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া ২৪ হাজার প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

গতকাল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা ঘুরে এবং বন্যাকবলিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বেশির ভাগ গ্রাম এখনো পানির নিচে। বন্যার পানি কমে গেলেও কমেনি দুর্ভোগ। সিলেটের যে কয়েকটি উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার একটি কোম্পানীগঞ্জ। সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ মূল সড়কের পানি শুকিয়ে গেলেও গ্রামগুলোর অবস্থা ভয়াবহ।   মানুষের ঘরে তীব্র খাদ্যসংকট। শেষ হয়ে গেছে মজুদের খাবারও।

সরেজমিনে উপজেলার জীবনপুর, চন্দ্রনগর, তেলিখাল, বর্ণি গ্রাম, ইসলামপুর গ্রাম, চাঁনপুর, বুড়দেও, রংপুর বস্তি, খালপার, লাছুখাল, বাউয়ার হাওর, কান্দাকাছা, বেতমুড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকায় বন্যার পানি কিছুটা কমেছে। তবে এখনো কোমর সমান পানি।

সকাল ১১টার দিকে কথা হয় বাউয়ার হাওর এলাকার বাসিন্দা এখলাছুর রহমানের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্যায় আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আমার বাড়িঘর সব পানির নিচে। পরিবার নিয়ে জীবন বাঁচাতে তখন এক কাপড়ে ঘর ছেড়েছিলাম। এখন পানি নামছে, কিন্তু ঘরের সব জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। কারো ঘরে খাবার নেই। এখন কী খাব আর ঘরদোর ও আসবাবপত্র মেরামতের টাকা কোথায় পাব, বুঝতে পারছি না। ’

একই সময়ে একই এলাকার আরেক বাসিন্দা আলী আব্বাস বলেন, ‘এই এলাকার সব রাস্তা পানির নিচে। চলাচলের বাহন একমাত্র নৌকা। তাই আমাদের এখানে মানুষ ত্রাণ নিয়ে কম আসে। বন্যার পানি যা নেওয়ার তা নিয়ে গেছে। ঘরের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এখন ত্রাণ পাওয়া গেলে টিকে থাকতে পারব আপাতত। বন্যা কমলে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করতে হবে। ’ বন্যার কারণে ঘর ছাড়ার সময় কিছু সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জান নিয়ে বাঁচতে পারছি, এটাই বেশি। সঙ্গে কিছু আনার সময়ই পাইনি। ’

সুনামগঞ্জে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বন্যায় সব ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেতে আরো সময় লাগবে। কারণ অনেক কিছু এখনো নিমজ্জিত।

কিশোরগঞ্জে লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ডাকাত আতঙ্কে বেশির ভাগ বন্যার্তই বাড়িঘর ফেলে রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাইছে না। গতকাল রাতে ইটনা ও মিঠামইনের কয়েকটি গ্রামে ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইটনার ছিলনী গ্রামের মসজিদের মাইকে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার ও সুপেয় পানির ঘাটতি পূরণে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।

জেলায় মোট আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ২৫৯। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাকবলিত ১৩ হাজার ৯ জনকে জায়গা দেওয়া হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

করিমগঞ্জের সুতারপাড়ার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘরবাড়ি ফালাইয়া থুইয়া ক্যামনে আশ্রয়কেন্দ্রে যাই। আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে মালামাল চুরি বা নষ্ট হতে পারে। তবে পানি বাড়লে শেষ পর্যন্ত না গিয়া উপায় নাই। ’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, গতকাল পর্যন্ত জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ১০টি উপজেলার ৬৪টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক লাখ সাত হাজার ৯৬০ জন। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তিনি জানান, মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৪০ মেট্রিক টন চাল ও দুই হাজার ৪০০ শুকনা খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ করা হয়। ত্রাণ দেওয়া হয় পাঁচ হাজার ১৫৫টি পরিবারকে।

ঢাকা-সিলেট রেল রুটে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ও ছকাপন রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে রেললাইনে পানি উঠে গেছে। পানি বাড়তে থাকলে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

হাকালুকি হাওরের তীরবর্তী কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। হাওরের পানি এখনো বাড়ছে।

কুলাউড়ার বরমচাল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সাজ্জাদ আলী সাজু জানান, ফানাই-আনফানাই নদী এলাকায় বন্যার পানি বাড়ছে। পানি বাড়তে থাকলে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিতে পড়বে।

হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এ পর্যন্ত জেলার সাতটি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত। জেলার ২২৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১৭ হাজার ৩৪৭টি পরিবার। সরকারিভাবে পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ২৩ হাজার ২৩৫। জেলা প্রশাসন জানায়, গতকাল পর্যন্ত ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং দুই হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে বন্যাদুর্গতদের জন্য। পাশাপাশি ৩০টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।

জেলার আজমিরীগঞ্জে মাছ ধরতে গিয়ে স্রোতে ভেসে গিয়ে এক জেলের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে তারা মিয়া (৫০) নামের ওই জেলের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজন।

নেত্রকোনায় বন্যার পানি কমতির দিকে। তবে জেলার ৮৬টি ইউনিয়নের ৭৫টিতেই এখনো পানি থইথই করছে। ৩৬২টি আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে লক্ষাধিক মানুষ নাওয়াখাওয়া ও ঘুমের ঘাটতিতে সময় কাটাচ্ছে।

মোহনগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, অনেক শিশু সর্দি-জ্বর ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত। এদিকে নেত্রকোনার মদনে পানিতে ডুবে হাফিজুর রহমান (৫৩) নামের এক স্কুল শিক্ষক মারা গেছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মদন পৌর সদরের ইমদাদপুর গ্রামের মসজিদের পাশে একটি ডোবায় পড়ে মারা যান তিনি।

শেরপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে পানিবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। চরাঞ্চলে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে সদর উপজেলার কুলুরচর বেপারীপাড়া এলাকার চরের শতাধিক বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। নকলা উপজেলার চন্দ্রকানা ইউনিয়নে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। নালিতাবাড়ীতে ভোগাই নদীর ভাঙনে রামচন্দ্রকুড়া-মণ্ডালিয়াপাড়া ইউনিয়নের উত্তর ফুলপুর গ্রামে ১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাঘবেড় ইউনিয়নের চেল্লাখালি নদীর দক্ষিণ সন্ন্যাসীভিটা এলাকায় এরই মধ্যে ৩০০ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে।

জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল যমুনা নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার কমলেও বিপত্সীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত কয়েক দিনের বন্যায় জেলার সাতটি উপজেলার বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলার দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী উপজেলায় নিচু এলাকায় ফসলি জমি প্লাবিত হওয়ায় বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। ]

 



সাতদিনের সেরা