kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

হঠাৎ বন্যায় বিপর্যয়

কূল-কিনারা পাচ্ছে না বিপর্যস্ত মানুষ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৯ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কূল-কিনারা পাচ্ছে না বিপর্যস্ত মানুষ

পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যার ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে এখন সিলেটের মানুষ। গতকাল সিলেট রেলস্টেশন থেকে তোলা। ছবি : আশকার আমিন রাব্বি

সুনামগঞ্জ টানা তিন দিন বিদ্যুত্হীন। সিলেটেরও অর্ধেকের বেশি এলাকা বিদ্যুত্হীন। নগরের কিছু উঁচু এলাকা শুকনা ছিল, গতকাল শনিবার সেগুলোও ডুবে গেছে। সুনামগঞ্জের মতো সিলেটও এখন প্রায় বিচ্ছিন্ন।

বিজ্ঞাপন

চলছে নিত্যপণ্যের হাহাকার। মোমবাতি পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্টারনেট সেবা প্রায় বন্ধ। চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না মুঠোফোনে। খাবার, সুপেয় পানির তীব্র অভাব। পানিবন্দি মানুষ খুঁজছে আশ্রয়।

নেত্রকোনা, শেরপুর, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কুড়িগ্রামেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনেক গ্রামে পানি উঠেছে। এরই মধ্যে দেশের মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় ঢুকছে পানি।

সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পর রেলও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের একাংশ ডুবে গেছে। মানুষ কী করবে, ভেবে পাচ্ছে না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, ১০ জেলার ৬৪টি উপজেলা বন্যাকবলিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না ঘুমিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে। গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, এরই মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে ৮০ লাখ করে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে চিড়া, মুড়ি, বিস্কুটসহ শুকনা খাবার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দুই এলাকায় দেড় হাজার টন চাল পাঠানো হয়েছে। হাতে পাঁচ কোটি টাকা রয়েছে। আরো ২০ কোটি টাকা জিআর থেকে চাওয়া হয়েছে।

বিদ্যুতের সাবস্টেশনে পানি ওঠায় এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, সিলেটের বন্যাদুর্গতদের জন্য শুকনা খাবার পাঠানো হচ্ছে। আর মন্ত্রণালয় থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। গতকাল বিকেলে মিন্টো রোডে সরকারি বাসভবনে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমন কালের কণ্ঠকে জানান, জেলায় পানি কমতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র কম থাকায় দুর্গতদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাখা হচ্ছে। কিছু মসজিদেও মানুষজনকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল থেকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দুর্গত মানুষের মধ্যে প্রতিদিন ৩০ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলায় গতকাল সারা দিন থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিন দিন ধরে বিদ্যুত্হীন থাকায় এবং সড়কপথ বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় অন্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে জেলাটি। গতকাল পর্যন্ত পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে জেলার ১১টি উপজেলার সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। উপজেলাগুলোতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে সেনাবাহিনী সিলেট থেকে রওনা হলেও তারা সুনামগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। গতকাল তারা গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। বিষয়টি জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. জাকির হোসেন।

এদিকে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর মানুষের আশ্রয় নিশ্চিত করতে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন। যদি কোনো দোতলা ভবন তালাবদ্ধ থাকে, সেগুলোর তালা ভেঙে মানুষকে আশ্রয় দিতে নির্দেশ দিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

সেনাবাহিনীর টোল ফ্রি নম্বর চালু

সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সেনাবাহিনী কিছু টোল ফ্রি নম্বর চালু করেছে। এসব নম্বরে বিনা মূল্যে যোগাযোগ করা যাবে। নবম্বরগুলো হলো : ০১৭৬৯১৭৭২৬৬, ০১৭৬৯১৭৭২৬৭, ০১৭৬৯১৭৭২৬৮, ০১৮৫২৭৮৮০০০, ০১৮৫২৭৯৮৮০০, ০১৮৫২৮০৪৪৭৭, ০১৯৮৭৭৮১১৪৪, ০১৯৯৩৭৮১১৪৪, ০১৯৯৫৭৮১১৪৪, ০১৫১৩৯১৮০৯৬, ০১৫১৩৯১৮০৯৭, ০১৫১৩৯১৮০৯৮।

রেল বন্ধ ঘোষণা

গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কালের কণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, রেললাইন ডুবে যাওয়ায় এবং রেলস্টেশনে পানি ওঠায় সিলেটের রেল চলাচল আপাতত বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তবে সিলেটের মাইজগাঁও স্টেশন পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সচল রাখা যায় কি না, সে বিষয়টি দেখা হচ্ছে।

খাবার, মোমবাতির তীব্র সংকট

সিলেট নগরের বেশির ভাগ এলাকা ডুবে যাওয়ার পর খাবার কেনা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ডাল, আলু, চিড়া, মুড়ির মতো পণ্য নেই বেশির ভাগ দোকানে। পণ্যের সংকটের সুযোগ ইচ্ছামতো দাম হাঁকছেন ব্যবসায়ীরা। নগরের হাওয়াপাড়া এলাকায় মদনমোহন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হাফিজ হাসান বলেন, ‘বিদ্যুৎ নেই। বিকেলে বের হয়েছি মোমবাতি কিনতে। নগরের নয়া সড়ক, কাজিটুলা, জেল রোড, বারুদখানা ঘুরে হাওয়াপাড়া এসেছি। কোথাও মোমবাতি নেই। সব যেন হাওয়া হয়ে গেছে। ’

নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকার গুল্লু স্টোরের ব্যবসায়ী শফিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দোকানে যেটুকু ছিল সেগুলো দুপুরের মধ্যে বিক্রি করে দিয়েছি। ’ কয়েকটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ডালের যে বস্তা গত সপ্তাহে দুই হাজার ৪৮০ টাকায় কিনেছি, আজ সেখানে চাচ্ছে তিন হাজার টাকা। একইভাবে তিন হাজার ৮০০ টাকা বস্তা চিনির দাম এখন চার হাজার ৪০০ টাকা। আলু নেই কোথাও। যাদের কাছে আছে তারা খুচরা বিক্রি করছে ৩০ টাকা কেজিতে। মোমবাতির বক্স ৬০ টাকার জায়গায় ১০০ টাকা। ’

পানির তীব্র সংকট

অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির কারণে গতকাল দুপুরের দিকে কুমারগাঁও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে তীব্র পানির সংকট দেখা দেয় নগরজুড়ে। বিকেলে টিলাগড়ের বালুচর এলাকার বাসিন্দা রাহেল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘বাসার পাশের নলকূপও ডুবে গেছে। পরিবারের শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের জন্য সার্বক্ষণিক খাবার পানি দরকার। অথচ ঘরে পানি শেষ হয়ে গেছে। ’

চৌকিদেখি এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা জিনিসপত্র নষ্ট হতে শুরু করেছে। রান্না করার জন্য পর্যাপ্ত পানিও সংগ্রহে নেই। বুঝতে পারছি না কী করব। ’

কিশোরগঞ্জে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত

কিশোরগঞ্জের হাওরের ছয় উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম গতকাল প্লাবিত হয়েছে। ইটনায় ধনু নদীর পানি উপচে প্লাবিত হতে শুরু করেছে গ্রাম, হাট-বাজার ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। গত কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে জনজীবনে বিপর্যয় ঘটেছে। গবাদি পশুগুলোর খাদ্য ও আশ্রয় সংকটে পড়েছে মানুষ। একদিকে গত চার দিনে হাওরের পানি অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে, অন্যদিকে টানা বর্ষণ ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাওরে ভীষণ ঢেউ। ব্যাহত হচ্ছে নৌচলাচল। জেলেরা মাছ ধরতে পারছেন না।

নেত্রকোনায় ভাঙল রেল সেতু

বন্যার পানির তোড়ে নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ রেলপথের বারহাট্টা উপজেলার ইসলামপুর এলাকার ৩৪ নম্বর রেল সেতু সকাল ৮টার দিকে ভেঙে যায়। এতে নেত্রকোনার সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহসহ সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বারহাট্টার রায়পুর ইউনিয়নের বড়ধলা গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেকের বাড়ির সব ঘরে পানি চাল ছুঁই ছুঁই। তাঁর পরিবারের সব সদস্য আশ্রয় নিয়েছে অন্য গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। তিনি ঘরের ধান আর ১২টি গরু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নেত্রকোনা-ঠাকুরাকোনা-কলমাকান্দা সড়কে। তিনি বলেন, ‘পেডে খাওন নাই। গরুর মায়ায় সড়কে পরইয়্যা রইছি। কেউ খবর লয় না। ’

নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর ইউএনও এ এইচ এম আরিফুল ইসলাম জানান, আজ রবিবার থেকে উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করবেন।

শেরপুরে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত

জেলায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল কিছুটা কমলেও গতকাল ভাটির দিকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ঢলে রাস্তাঘাট, নদীর বাঁধ, সেতু-কালভার্ট ভেঙে গেছে। ঝিনাইগাতীতে পৃথক স্থানে পাহাড়ি ঢলে নিখোঁজ হওয়ার ১৫ ঘণ্টা পর গতকাল সকালে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের সদস্য মো. জাহিদুল হক মনির জানান, পানিবন্দি মানুষজনকে উদ্ধারে প্রশাসনের নির্দেশে ফায়ার সার্ভিস ও স্কাউট সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন।

শুক্রবার রাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নালিতাবাড়ীর নন্নীবন্দ ভাটপাড়া এলাকার এক কিশোর নিহত হয়েছে।

হবিগঞ্জের তিন উপজেলা প্লাবিত

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লুকড়া ইউনিয়নের গোপালপুর এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ গতকাল সন্ধ্যায় ভেঙে গেছে। হাওরে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কাশীপুর গ্রামের বাসিন্দা সুরত আলী জানান, বাঁধ ভাঙায় হাওরে পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক বাড়িঘর তলিয়ে যাবে। এরই মধ্যে হবিগঞ্জ সদর, আজমিরীগঞ্জ ও নবীগঞ্জ উপজেলার বেশ কিছু অংশ প্লাবিত হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক আশিক পারভেজ জানান, বৃষ্টি ও বন্যায় জেলার ১৩ হাজার হেক্টরের রোপা আমন, দুই হাজার হেক্টরের আউশ ও ৪০০ হেক্টরের শাক-সবজির ক্ষতি হয়েছে।

মৌলভীবাজারে ৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি

মৌলভীবাজারের সব নদ-নদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে জেলায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ মোট ৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে।

মৌলভীবাজার পাউবো জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার কমলগঞ্জ, সদর, রাজনগর, জুড়ী, বড়লেখা, কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। )



সাতদিনের সেরা