kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

বাজেট বিশ্লেষণ : জ্বালানি

দাম সমন্বয়ের প্রভাব সহনীয় থাকবে না

ম. তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

১১ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দাম সমন্বয়ের প্রভাব সহনীয় থাকবে না

২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের বিক্রয়মূল্য পর্যায়ক্রমে ও স্বল্প আকারে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ মাত্রায় সমন্বয় হলে দাম বাড়ার প্রভাব ভোক্তাদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে থাকবে না। এমনিতে নিত্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেশি। এ অবস্থায় জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ও সারের দাম বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি অবশ্যই বেড়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা আরো কঠিন হবে। তাই এ রকম অবস্থায় দাম সমন্বয়ের বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে।

তবে বাংলাদেশে কখনো বাজেটে ঘোষণার মাধ্যমে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ হয় না। আগে এটি সরকার নির্ধারণ করত। এখন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করে থাকে। বাজেটে যেটি সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে, সেটি বিইআরসির মাধ্যমেই করা হবে।

কথা হচ্ছে, কত দিন এই অবস্থা বিরাজ করবে? কত দিন সরকার ভর্তুকি দিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পারবে? এটা একটি চ্যালেঞ্জ। সরকার এখন পর্যন্ত ভর্তুকি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে কত দিন সরকার ভর্তুকি দিয়ে চালাতে পারবে, সেটাও দেখার বিষয়।

সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। সামনে বিদ্যুতের দাম বাড়বে। এখন সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করছে বিইআরসির দাম বাড়ানোর বিষয়টি। বিইআরসির দাম নির্ধারণের বিষয়টিতে কিছুটা হলেও যৌক্তিক ও স্বচ্ছতা আসে মানুষের কাছে।

কারণ আমরা গ্যাসের ক্ষেত্রে দেখেছি, বিতরণকারী কম্পানিগুলো গ্যাসের দাম ১১৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। বিইআরসি কারিগরি কমিটি ২০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও পিডিবি একইভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বিইআরসি এখন সেই বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।

বিইআরসি গ্যাস ও বিদ্যুতের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টিতে বরাবরই ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু বাস্তবায়ন করে না। আমাদের প্রতিবছর যে পরিমাণ গ্যাস চুরি হয়, তা বন্ধ করা গেলে হয়তো গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি চিন্তা করা লাগত না। আমি মনে করি, সরকার এখনো গ্যাস ও বিদ্যুতে দক্ষতা ও সাশ্রয় নিশ্চিতে পিছিয়ে আছে।

আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকায় আগামী অর্থবছরের জন্য বিদ্যুতের নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায়। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে আমাদের দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে এবারও তেমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। গত দুই বছরে আমাদের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। দুঃখের বিষয় হলো, এই উৎপাদন ধরে রাখার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তার কিছুই করা হয়নি। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যা যা করণীয় সরকারকে তাই করতে হবে। এই জায়গায় বরাদ্দ কম দিলে চলবে না। গ্যাস অনুসন্ধান ও পুরনো কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়াতে প্রয়োজনে বাজেটের বাইরে বরাদ্দ দিতে হবে। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স যে পরিকল্পনাগুলো নিয়েছে সেগুলোকে পূর্ণ সমর্থন দিতে হবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে এলএনজি আমদানির চাপ কমে যাবে।

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। তাই খুব দ্রুতই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে। তবে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ হিসেবে সরকার যদি এগুলো রাখতে চায়, তাহলে রাখতে পারে।

এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। কারণ এখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য অনেক বেশি। যেহেতু আমরা জায়গাস্বল্পতার জন্য বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না, তাই ছোট ছোট আকারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারকে উৎসাহ দিতে হবে।

 



সাতদিনের সেরা