kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

সাক্ষাৎকার

সবার জানা-বোঝার ঘাটতির কারণে এত বড় খেসারত

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহম্মেদ খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এস এম আজাদ

৬ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে





সবার জানা-বোঝার ঘাটতির কারণে এত বড় খেসারত

আলী আহম্মেদ খান

কালের কণ্ঠ : বিস্ফোরণটি এত বড় হলো কেন? আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আলী আহম্মেদ খান : দেশের ইতিহাসে রাসায়নিক থেকে এত বড় অগ্নিবিস্ফোরণ আগে ঘটেনি। এক দিন পরও আগুনের কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এটি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে হয়েছে। এই রাসায়নিকের ব্যারেল বা কনটেইনারে ‘ডেঞ্জার লেবেল’ লাগানো থাকে।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ এটি বিপজ্জনক। এগুলো গরম পেলে বিস্ফোরিত হতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকির বিষয়, এগুলো গরম হওয়ার পর পানি ছিটানো ও নাড়াচাড়া করাও বিপজ্জনক। উভয় সংকট। ফলে এই রাসায়নিক কতটা বিপজ্জনক তা সংশ্লিষ্ট কেউ তাত্ক্ষণিক বুঝতেই পারেনি। এ কারণেই ঘটনাটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : কনটেইনার ডিপোতে এই রাসায়নিক সংরক্ষণে কোথায় ত্রুটি ছিল বলে আপনি মনে করছেন?

আলী আহম্মেদ খান : এ ধরনের রাসায়নিক কাগজ, কাপড়সহ নানা কারখানায় ব্যবহার করা হয়। মূলত ব্লিচিং এফেক্ট বা কাঁচামাল পরিষ্কার করতে এটি কাজে লাগে। প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। আমদানি ও রপ্তানির সময় কিন্তু নিরাপত্তা বা সুরক্ষার নিয়ম মানতে হয়। তবে দেশে রাখার সময় যেনতেনভাবে রাখা হয়। কারণ এর জন্য সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। অতীতে ছোটখাটো ঘটনার সময় আমি এটি দেখেছি। এখন বড় ধরনের খেসারত দিতে হলো। এগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয়।

 

কালের কণ্ঠ : ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিহত ও আহত হয়েছেন। সংখ্যাটা বড়। এখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি বা কর্মীদের যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

আলী আহম্মেদ খান : ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিবেদিতপ্রাণ। অগ্নিকাণ্ড ঘটলেই দ্রুত তা নির্বাপণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু এবার তাঁদের জানা ছিল না যে এখানে কী ধরনের দাহ্য পদার্থ আছে। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডে পানি বা নাড়া পড়লে বোমার মতো অগ্নিবিস্ফোরণ ঘটায়। অন্য সাধারণ ঘটনার মতোই ফায়ারফাইটাররা ক্লোজ ফাইটিং (কাছাকাছি গিয়ে আগুন নেভানো) করেছেন। এখন বোঝা যাচ্ছে, নিরাপত্তা গার্ড নিয়ে দূরে থেকে ডিফেন্সিভ ফায়ার ফাইটিং করতে হতো। কিন্তু ততক্ষণে চরম মূল্য দিতে হলো আমাদের। আমি বলব, সবার জানা-বোঝার ঘাটতির কারণে বড় খেসারত দিয়েছি আমরা।

 

কালের কণ্ঠ : ফায়ার সার্ভিস শিল্প-কারখানায় অগ্নিঝুঁকি নিরূপণ করে, সনদ দেয়। এ ধরনের রাসায়নিক ডিপোর ব্যাপারে তাদের কী নীতিমালা বা নির্দেশনা আছে?

আলী আহম্মেদ খান : আমার জানা মতে, ডিপোতে রাসায়নিক সংরক্ষণের বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। আমি এটি আলোচনায় তুলছিলাম। ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এগুলো রাখা বা সংরক্ষণের জন্য সার্বিক নীতিমালা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর এখন এ ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : এই বিস্ফোরণে ক্ষয়ক্ষতির ধরন কেমন বলে আপনার মনে হয়?

আলী আহম্মেদ খান : এখানে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ একই সঙ্গে ঘটেছে। ফলে তাপ উৎপাদিত হয়েছে অনেক বেশি। মুহূর্তেই শ্বাসনালিসহ পুরো শরীর ঝলসে গেছে। এ কারণে হতাহতের সংখ্যা সাধারণ আগুনের চেয়ে অনেক বেশি। পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণও করা যাচ্ছে না। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণের পর সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত জানা যাবে।

 

কালের কণ্ঠ : এ ঘটনায় কোনো পক্ষের অবহেলা বা দায় দেখছেন আপনি?

আলী আহম্মেদ খান : আমি এককভাবে কারো দায় বলব না। মালিকপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণভাবে রেখেছে। দুর্ঘটনার পরও তারা পণ্যের ব্যাপারে সঠিক তথ্য দেয়নি। এটা বড় ধরনের গাফিলতি। তবে এ ধরনের পণ্য ডিপোতে সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখেনি। এ ব্যাপারে সবাই তো উদাসীনই ছিল, যার কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভাতে গিয়ে জীবন দিলেন।

 

 



সাতদিনের সেরা