kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১১ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২৯ সফর ১৪৪৪

ঢাকার চার নদীতে ৭২ হাজার টন বর্জ্য

তামজিদ হাসান তুরাগ   

৫ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকার চার নদীতে ৭২ হাজার টন বর্জ্য

দূষণে কালো হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি। সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশের অনেক নদ-নদীই দূষণ-দখলসহ নানা কারণে মরতে বসেছে। রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা চার নদীও দূষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নানা ধরনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এসব নদীতে। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকার চার নদী ও খাল-বিলে পাওয়া গেছে ৭২ হাজার টনেরও বেশি বর্জ্য।

বিজ্ঞাপন

‘টুওয়ার্ডস আ মাল্টিসেক্টরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। সম্প্রতি এই সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ওই সমীক্ষা চালানো হয়। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় ওই সমীক্ষা চলে। রাজধানীর বর্জ্য পরিস্থিতিও ওই সমীক্ষায় আনা হয়।

এই পরিস্থিতিতে আজ রবিবার বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে জাতীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ৪৩টি জায়গায় পাওয়া গেছে ১১ হাজার ৫৬৪ টন বর্জ্য। এ ছাড়া শীতলক্ষ্যায় ৪৩ জায়গায় ৪৩ হাজার ১৮৩ টন, বালু নদের সাত জায়গায় দুই হাজার ১২ টন এবং তুরাগের ৩৬ জায়গায় ১৫ হাজার ৭৭১ টন বর্জ্য পাওয়া গেছে। এসব নদীতে দৈনিক ১১২ টন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ প্লাস্টিক ও পলিথিন।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন, নদী ও খাল দখলের পরই তার দূষণ হয়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নদীদূষণের বড় কারণ নদীর পারে স্থাপনা, কলকারখানার বর্জ্য এবং নদীতে চলাচলকারী যানবাহন। ঢাকার খাল বা নদী আগে দখল হয়। এরপর স্থাপনা, কলকারখানা গড়ে তোলা হয়। এরপর সব কিছুর বর্জ্য ফেলা হয় সেই নদী বা খাল-বিলে। ’

বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা প্রতিবেদন অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারের মন্তব্যকে সমর্থন করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার আশপাশের এসব নদীনালা দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী শিল্প-কারখানাগুলো। শিল্প-কারখানা আর শহরের পয়োনিষ্কাশনের সব বর্জ্য নিয়ে ফেলা হচ্ছে নদীতে। এ কারণেই একসময়ের স্বচ্ছ টলটলে পানির নদীগুলো ভয়াবহ দূষণের শিকার।

ওই প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকার বর্জ্য নিয়ে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন ছয় হাজার ৪৬৪ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহকারী সংস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ল্যান্ডফিলে যায়। ৮ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হয়। ১৪ শতাংশ ফেলা হয় ড্রেন ও অরক্ষিত এলাকায়। আর ৫ শতাংশ বর্জ্য ফেলা হয় নদী ও খালগুলোতে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে করোনা মহামারি প্লাস্টিকদূষণকে আরো বাজে অবস্থায় নিয়ে গেছে। মাস্ক, গ্লাভসসহ অন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীতে প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। এসব বর্জ্য আলাদা করা হচ্ছে না।

ঢাকার নদী ও খাল দূষণের প্রক্রিয়ার বিষয়ে কথা হয় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট কনসার্নের নির্বাহী পরিচালক মাকসুদ সিনহার সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকার নদীগুলো দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো পারে ময়লা ফেলা। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে কলকারখানার দূষিত পানি নদীতে মিশে যাওয়া। তাঁর মতে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হচ্ছে এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। পাশাপাশি জনসচেতনতাও খুব জরুরি। তিনি নদী ও খালগুলোর স্থায়ী সীমানা নির্মাণের প্রতিও জোর দেন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য পরিস্থিতি নিয়ে ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় (ডিএসসিসি) ৪২৬টি বর্জ্য সংগ্রহের স্থান রয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় (ডিএনসিসি) রয়েছে ২২৯টি। এ ছাড়া ঢাকা শহরের ৩৯টি খালের পাশে মোট এক হাজার ৮৩টি ভাগাড় রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি খালই রয়েছে ডিএনসিসি এলাকায়, সাতটি ডিএসসিসি এলাকায় এবং দুটি ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির মধ্যবর্তী এলাকায়। প্রতিবেদন বলছে, খালপারের এই ভাগাড়গুলোতে প্রতিদিন ৩৩ হাজার ৬১২ টন বর্জ্য জমা হয়। এর মধ্যে প্রতিদিন ২১৬.৬ টন বর্জ্য অনিয়মতান্ত্রিকভাবে এই স্থানগুলোতে ফেলা হয়।

ঢাকার নদীদূষণ পরিস্থিতি এবং নদীগুলো বাঁচাতে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে গতকাল পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুল হামিদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বেশ কয়েকবার। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। আরো দুজন কর্মকর্তাকে ফোন করা হলে তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই চার নদীর দূষণ প্রসঙ্গে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঢাকার যত মলমূত্র আছে, তার ৯৯.৯ শতাংশই এই চার নদীতে যায়। একই পাইপ দিয়ে মলমূত্র ও বৃষ্টির পানি গিয়ে পড়ছে নদীতে। তিনি বলেন, নদী রক্ষা কমিশন আগামী বছর মার্চের মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গী খাল, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী দূষণমুক্ত করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও চাক্তাই খালের ৯৭টি স্থানে মোট বর্জ্যের পরিমাণ এক হাজার ১২৮ টন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কর্ণফুলীতে ১২ শতাংশ প্লাস্টিক এবং চাক্তাই খালে ২১ শতাংশ প্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন, নদীগুলোকে দূষণ থেকে রক্ষায় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নদীর সঙ্গে পয়োনিষ্কাশনের নালার সংযোগ বন্ধ করে দিতে হবে। কলকারখানার বর্জ্যসহ সব পানিকে বিশুদ্ধকরণের পর নদীতে ফেলার উদ্যোগ নিতে হবে।



সাতদিনের সেরা