kalerkantho

শনিবার । ২৫ জুন ২০২২ । ১১ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৪ জিলকদ ১৪৪৩

শ্রমিকসংকট, ধান কাটতে বাড়তি খরচ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্রমিকসংকট, ধান কাটতে বাড়তি খরচ

মানিকগঞ্জ, জয়পুরহাট ও পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ধান কাটার শ্রমিকের সংকট চলছে। কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ করে শ্রমিক আনতে হচ্ছে। তার পরও ধান কাটতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক। এতে ধান আবাদে খুব একটা লাভ হবে না বলে আশঙ্কা কৃষকের।

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ লোকসানের শঙ্কায়ও আছেন। অনেকে ডুবে যাওয়া ধান কাটছেন না।

মানিকগঞ্জের কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই মৌসুমে জেলায় ৪৭ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ২০ থেকে ৩০ দিনের ব্যবধানে সব জমির ধান পাকে। ফলে একসঙ্গে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখানে এতসংখ্যক স্থানীয় শ্রমিক একসঙ্গে পাওয়া যায় না। বোরো ধান কাটার মৌসুমে মূলত নির্ভর করতে হয় উত্তরবঙ্গের শ্রমিকদের ওপর।

মানিকগঞ্জ শহরের বাসস্ট্যান্ড, শিবালয় উপজেলার আরিচা ঘাট ও জাফরগঞ্জ বাজার, সাটুরিয়া উপজেলার সাটুরিয়া বাজার, ঘিওর উপজেলার ঘিওর বাজার, হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা বাজার এলাকায় বসে শ্রমিক হাট। উত্তরবঙ্গ থেকে আগত এই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরিতে নিয়ে যান কৃষকরা।

গত বৃহস্পতিবার মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড শ্রমিক হাটে দেখা যায়, ভাড়ায় ধানকাটার জন্য কয়েক শ শ্রমিক অপেক্ষা করছেন। কয়েকজন জানালেন, মৌসুমের প্রথম দিকে প্রতিদিন পারিশ্রমিক পেয়েছেন হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। সঙ্গে তিন বেলা খাবার। তবে দুই দিন ধরে পারিশ্রমিক কমে বর্তমানে চলছে ৯০০ টাকা থেকে হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্যান্য শ্রমিক হাটেও একই ধরনের পারিশ্রমিক নেওয়া হচ্ছে।

শিবালয় উপজেলার দশচিড়া গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান জানালেন, এক পাখি (২৯ শতাংশ) জমির ধান এক দিনে কাটা এবং মাড়াই করতে প্রয়োজন হয় চারজন শ্রমিকের। তিনি এক হাজার টাকা করে চারজন শ্রমিক দিয়ে তার জমির ধান কেটেছেন। শ্রমিকদের তিন বেলা খাবারও দিতে হয়েছে। ধান পেয়েছেন ২৫ মণ। তিনি বলেন, বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করলে খুব সামান্যই লাভ থাকবে।

পাবনার ভাঙ্গুড়া কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় এই বছর ছয় হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে চলনবিলের দিলপাশার, খানমরিচ ও অষ্টমনিষা ইউনিয়নে প্রায় চার হাজার হেক্টর জমির ধান আবাদ হয়। এই অঞ্চলে রবি মৌসুমে সরিষা আবাদ করার কারণে দেরিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করে কৃষক। এতে আগাম বন্যায় আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায়।

উপজেলার চরভাঙ্গুড়া গ্রামের কৃষক টুকু প্রামাণিক বলেন, একদিকে ধান আধাপাকা। তার ওপর পানি প্রবেশ করে ডুবে যাচ্ছে। এরপর ধান কাটতে চেয়ে শ্রমিক পাচ্ছি না। কিছু শ্রমিক ছয় থেকে সাত হাজার টাকা বিঘাতে ধান কাটার চুক্তি নিচ্ছেন। তাহলে এত টাকা দিয়ে ধান কেটে ও নলকূপ মালিকদের চারভাগের একভাগ দিয়ে কৃষকদের কী থাকবে? এ কারণে অনেক কৃষকের ধান পানির নিচে নষ্ট হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, স্লুইসগেট (জলকপাট) ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের  ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে পানি বেড়ে ধান ডুবছে। তবে এ বছর শ্রমিকসংকট প্রকট আকার দেখা দিয়েছে। এটা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কাটাহার গ্রামের কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, শ্রমিক না পাওয়ায় তাঁর ১৫ বিঘা জমির ধান কাটতে এক সপ্তাহ বিলম্ব হয়েছে। এতে ঝড় আর দফায় দফায় বৃষ্টিতে জমিতেই প্রায় ৪০ মণ ধান ঝড়ে গেছে। বিঘাপ্রতি তিনি ছয় হাজার টাকা চুক্তিতে শ্রমিক দিয়ে ধান ঘরে তুলছেন। এ ছাড়া ধান মাড়াই করতে তার প্রতি বিঘায় খরচ পড়ছে ৪০০ টাকা।

ক্ষেতলাল উপজেলার হোপ গ্রামের কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে জিরাশাইল ধান চাষ করেছেন। কিন্তু ঝড়ে নুয়ে পড়ায় ধানগাছ পানিতে ডুবে আছে। শ্রমিকরা সেই ধান কাটতে আট হাজার টাকা নিয়েছেন। তিন বিঘা কাটার পর সেই ধান বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না। তাই তিনি দুই বিঘা জমির ধান আর কাটতেই যাননি।

ক্ষেতলালের বেলগাড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিমের বাড়িতে ধান কাটতে আসা নীলফামারীর ডোমার উপজেলার কৃষি শ্রমিক মোহসীন, আবুল ও মান্নান বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে শ্রমিকের দাম বেড়েছে, এটি সত্যি। কারণ নুয়ে পড়া ভেজা ধান কেটে জমি থেকে নিয়ে আসতে তাদের বেশি শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে এবার বিঘাপ্রতি শ্রমের মূল্য বেশি পড়ছে। জমি শুকনা হলে মজুরের দাম বেশি পড়ত না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ শফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় এবার ধানের ফলন ভালো হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাঠের জমিতে ধান নুয়ে পড়ায় পাকা ধানের ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের কারণে জেলায় এ পর্যন্ত উৎপাদিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮০ শতাংশ জমির ধান কাটা ও মাড়াই সম্পন্ন করেছেন কৃষকরা।



সাতদিনের সেরা