kalerkantho

রবিবার । ৩ জুলাই ২০২২ । ১৯ আষাঢ় ১৪২৯ । ৩ জিলহজ ১৪৪৩

সাকিবের তিন ঘণ্টার চ্যালেঞ্জই ভরসা

সাইদুজ্জামান   

২৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাকিবের তিন ঘণ্টার চ্যালেঞ্জই ভরসা

সাকিব আল হাসান

‘যে দুজন (মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাস) আছে, তারা যদি প্রথম সেশন কাটিয়ে দিতে পারে, এরপর আমি যদি তিন ঘণ্টা ব্যাটিং করতে পারি’— গতকাল আরেকটি ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে ঢাকা টেস্ট বাঁচানোর একটি চিত্রকল্প এঁকেছেন সাকিব আল হাসান। ব্যাটিংয়ের যে হালচাল, তাতে আজ সাকিবের তিন ঘণ্টা ব্যাটিংয়েই যদি শ্রীলঙ্কার কাছে আরেকটি সিরিজ হার এড়াতে পারে বাংলাদেশ!

চ্যালেঞ্জটা সাকিবের নিজেরও। প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে ফিটনেস থিওরিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দুই টেস্ট মিলিয়ে এরই মধ্যে ১০৪.১ ওভার বোলিং করেছেন তিনি। ৯ উইকেট নিয়ে দলের সফলতম বোলারও সাকিব।

বিজ্ঞাপন

তবে পঁয়ত্রিশ পেরোনো অলরাউন্ডারের কাছে বোলিংটা সোফায় গা এলিয়ে ভিডিও গেমস খেলার মতো ব্যাপার, কিন্তু ব্যাটিংয়ে সেই বিলাসিতা নেই। চট্টগ্রাম টেস্টের আগে পাওয়া একমাত্র প্র্যাকটিস সেশনে তাই শুধু ব্যাটিংই অনুশীলন করেছিলেন সাকিব। তবু ২৬ রানের ইনিংসে চেনা সাকিবের দেখা মেলেনি। ঢাকায় প্রথম ইনিংসে তো রানের খাতাই খুলতে পারেননি। সব মিলিয়ে ব্যাটসম্যানশিপের অগ্নিপরীক্ষা আজ সাকিবের। দলের সামনে হাঁ করে আছে হার। টানা বোলিং-ফিল্ডিংয়ে ভারী শরীর-মন নিয়ে সাকিব কি পারবেন চ্যালেঞ্জটা নিতে? আশার কথা, লক্ষ্যটা তিনি নিজেই নির্ধারণ করেছেন। নিজের ম্যাচ ফিটনেসের ওপর বাজি ধরে ‘জ্যাকপট’ জেতা তিনি ব্যাটিংয়ের চ্যালেঞ্জটাও জিতুন—সিরিজ বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম সম্ভবত এই প্রার্থনাই করছে।

টেস্ট ক্রিকেটটাই এমন রোমাঞ্চকর। গতকাল চতুর্থ দিন সকালেও ম্যাচ জয়ের পথ রচনা করতে পারত বাংলাদেশ দল। ৮৩ রানে পিছিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কার বাকি ৫ উইকেট দ্রুত তুলে নিতে পারলে সেই পথ চওড়া হতো, কিন্তু কিসের কী। আগের দিন বৃষ্টিতে একটা সেশন ভেসে যাওয়ায় গতকাল খেলা শুরু হয়েছিল আধাঘণ্টা আগে, সাড়ে ৯টায়। তাতে উইকেটে পেসারদের বাড়তি সুবিধা পাওয়ার কথা, কিন্তু এবাদত হোসেন ও খালেদ আহমেদরা দু’হাতে রান বিলিয়েছেন। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ ও দীনেশ চান্ডিমাল শুরুর জড়তা কাটিয়ে ওঠার পর কোনো বাংলাদেশি বোলারকেই বিশেষ পাত্তা দেননি। প্রথম সেশনেই বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস টপকে গেছে সফরকারীরা। দ্বিতীয় সেশনে যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে। চান্ডিমালের সহজাত আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে রানের ঘোড়া ছুটিয়েছে শ্রীলঙ্কা। অপর প্রান্তে ম্যাথুজ চট্টগ্রামের মেজাজে ব্যাটিং করেছেন। দুজনে মিলে ষষ্ঠ উইকেটে ১৯৯ রানের জুটি গড়েছেন। এবাদত দ্বিতীয় নতুন বলে চান্ডিমালকে তুলে নেওয়ার বহু আগেই ম্যাচ বাঁচানোর চিন্তার মেঘ জমে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। মাঠে মমিনুল হকদের শরীরী ভাষা অবশ্য বলছিল যে, প্রথম সেশনের পরই অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। হার এড়ানোর লড়াই শুরু হয়ে যায় চা বিরতির আগেই। সাকিবের নিয়ন্ত্রিত বোলিং আর এবাদতের দুটি স্পেল বাদ দিলে বাকি বোলাররা নিয়মরক্ষার মতো করে হাত ঘুরিয়েছেন। এই অকার্যকর বোলিংয়ের পুরো ফায়দা তুলেছে শ্রীলঙ্কা, নেতৃত্বে দুই সেঞ্চুরিয়ান ম্যাথুজ ও চান্ডিমাল। শৃঙ্খলার পুরস্কারও পেয়েছেন সাকিব, ক্যারিয়ারে ১৯তম বারের মতো ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছেন। তবে ম্যাচ পরিস্থিতি বিবেচনায় এই অর্জন নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস সাকিব নিজেও প্রকাশ করেননি। তাঁর তৃপ্তি বলতে বিনা প্রস্তুতিতে অবিশ্বাস্য ম্যাচ ফিটনেসের প্রদর্শনী করতে পারাটাই এক নম্বরে। এবাদত ৪ উইকেট নিয়েছেন, তবে ততক্ষণে ম্যাচ বাঁচানোর লড়াই বাংলাদেশের ভবিতব্যে লেখা হয়ে গেছে।

১৪১ রানে পিছিয়ে থেকে দিনের শেষ ঘণ্টায় ব্যাটিং করতে নামলে বাংলাদেশ দল যে স্নায়ুচাপে নুয়ে পড়ে—এটা নতুন কিছু নয়। তার ওপর শ্রীলঙ্কার দুই তরুণ পেসার আসিথা ফার্নান্ডো ও কাসুন রাজিথা বাংলাদেশের কন্ডিশনকে দারুণ দক্ষতায় ব্যবহার করছেন। তাই বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হতেই প্রেসবক্স নোট নেওয়ায় গভীর মনোযোগী হয়ে পড়ে! দুইবার নিশ্চিত আউট হওয়ার হাত থেকে বেঁচেছেন মাহমুদুল হাসান। একবার স্লিপে ক্যাচ পড়েছে, আরেকবার লঙ্কানরা রিভিউ না নেওয়ায় বেঁচে যাওয়ার সৌভাগ্যকে কাজে লাগাতে পারেননি তরুণ ওপেনার। স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন তিনি। তার আগে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ‘পেয়ার’ পেয়েছেন তামিম ইকবাল। টেস্টে পাঁচ হাজার রানের ল্যান্ডমার্ক ছোঁয়ার জন্য তাঁর ১৯ রানের অপেক্ষা এতে আরো দীর্ঘায়িত হয়েছে। দুই ওপেনারের বিদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস্য একটি কাণ্ডও ঘটিয়েছে বাংলাদেশ দল। মাহমুদুলের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝিতে রান আউট হয়েছেন নাজমুল হোসেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মাহমুদুলের সঙ্গে রান নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে অন্য ব্যাটারদের। সবচেয়ে ভালো হয়, মাহমুদুল নিজে যদি দ্রুত প্রান্ত বদলের ব্যাপারটায় সঙ্গীদের সঙ্গে বোঝাপড়াটা ভালোভাবে করে নেন। দলের মরণাপন্ন অবস্থায় এমন অকারণ রান আউটের প্রভাব দলে ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক। তা ছাড়া মমিনুল নিজেও ফরমে নেই। মুখোমুখি হওয়া দ্বিতীয় বলে তাঁর উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেওয়া তাই অপ্রত্যাশিত মনে হয়নি।

এই বিপর্যয় মাথায় নিয়ে নতুন শুরু বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংয়ের। নতুন শুরুই তো। প্রথম ইনিংসে ২৪ রানে ৪ উইকেট পতনের পর হাল ধরেছিলেন মুশফিক ও লিটন। দ্বিতীয়বার তাঁরা জুটি বেঁধেছেন স্কোরবোর্ডে ২৩ রানে ৪ উইকেট দেখে। নানা ছলছুতায় সময় নষ্ট করেছেন, নিরাপদে কাটিয়ে দিয়েছেন দিনের বাকিটা।

আজ তাঁদের জন্য সাকিবের বেঁধে দেওয়া টাস্ক—পুরো একটি সেশন ব্যাটিং। তাঁদের একজন মুশফিক প্রায় পৌনে ৯ ঘণ্টা ব্যাটিংয়ের পর শ্রীলঙ্কার ১৬৫.১ ওভারব্যাপী প্রথম ইনিংসে ফিল্ডিংও করেছেন। আর লিটন ৬ ঘণ্টা ২৫ মিনিট ব্যাটিং শেষে উইকেট আগলেছেন ৪৬৫ মিনিট। এমন ক্লান্তিকে কি জয় করতে পারবেন তাঁরা? যদি পারেন, এরপর সাকিব কি পারবেন নিজেকে ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ জিততে?

শেষের প্রশ্নটাই সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের রোমাঞ্চই যে অন্য রকম! বাংলাদেশের শেষ লাইফলাইনও এটা। যদিও প্রতিপক্ষের কন্ডিশনকে নিজেদের করে নিয়ে ম্যাচের লাগাম এখন শ্রীলঙ্কার হাতে। ম্যাথুজ-চান্ডিমালের ব্যাটিং আর ফার্নান্ডো-রাজিথার দাপটও তো কম আকর্ষক নয়।

 



সাতদিনের সেরা