kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার ছাত্রদল-ছাত্রলীগ সংঘর্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার ছাত্রদল-ছাত্রলীগ সংঘর্ষ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ও দোয়েল চত্বর এলাকায় গতকাল ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে একে অন্যের দিকে ঢিল ছোড়েন। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আবারও ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষ হয়েছে। গত মঙ্গলবারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো ক্যাম্পাসে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল। গতকাল দোয়েল চত্বরে গিয়ে ধাওয়া ও হামলার শিকার হন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। ধাওয়া খেয়ে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ঢুকে পড়েন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

পরে সেখানেও তাঁদের ওপর হামলা হয়। পাল্টা জবাব দেন তাঁরাও। তবে সেখানে ছাত্রদলের কয়েকজন বেধড়ক পিটুনির শিকার হন। এ ঘটনায় দুই সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।

ছাত্রদল দাবি করেছে, তাদের ৫০ জনের মতো নেতাকর্মীকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। গুরুতর অন্তত পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ছাত্রলীগও দাবি করেছে, তাদের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

ঢাকার বাইরে খুলনায় বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দিতে গেলে উপস্থিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এতে ৩০ জনের মতো আহত হয়েছেন। পটুয়াখালী ও নড়াইলে বিএনপির কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ হামলা করেছে বলে দলটি দাবি করেছে।

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ডাকে বিএনপি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গলবারের হামলার প্রতিবাদে সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভের ডাক দেয় ছাত্রদল। তবে দেশের অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর পান্থপথে শমরিতা হাসপাতালে আহত ছাত্রদল নেতাদের দেখতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ তাণ্ডবে ঢাকা বিশ্ব্ববিদ্যালয়ে শতাধিক ছাত্রদল নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

এর আগে সকালে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ক্ষমতায় যেতে বিএনপি আবারও অন্ধকার চোরাগলি খুঁজে বেড়াচ্ছে। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টায় লিপ্ত।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, বিএনপি যাতে সভা-সমাবেশ করতে পারে তা দেখা হবে। তাদের সভা-সমাবেশে কোনো বাধা দেওয়া হবে না।

এরপর বিএনপি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সভা-সমাবেশ, কর্মসূচি বাড়িয়েছে। এসব কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য কোনো বাধার ঘটনা না ঘটলেও দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে হামলার শিকার হয়। ছাত্রদল ওই হামলার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করে। পরে ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের সংঘর্ষও হয়। তাতে ৩০ জনের মতো আহত হন। গতকাল আবার ক্যাম্পাসে যেতে চাইলে দোয়েল চত্বরে ছাত্রলীগের বাধার মুখে পড়ে ছাত্রদল। সেখান থেকে শুরু হয় সংঘর্ষ।

গতকালের ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার দেশের সব জেলা ও মহানগরে এবং রবিবার সব উপজেলা, থানা, পৌরসভা ও শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ছাত্রদল। গতকালের ঘটনায় বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদসহ আটটি বাম ছাত্রসংগঠন নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

ক্যাম্পাসে যেভাবে সংঘর্ষ

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সকালে হাইকোর্ট ও প্রেস ক্লাব এলাকায় জড়ো হতে থাকেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর ও শিশু একাডেমি এলাকায় অবস্থান নেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট মাজারের সামনে থেকে ছাত্রদলের একটি মিছিল দোয়েল চত্বরের দিকে রওনা হয়। দোয়েল চত্বরের কাছে যেতেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের মিছিলে বাধা দেন এবং ধাওয়া করেন। এক পর্যায়ে ধাওয়াধাওয়ি শুরু হলে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক ও রড নিয়ে পরস্পরের ওপর চড়াও হন। কিছু সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল ছোড়াছুড়িও হয়। এ সময় অন্তত একজনকে কোমর থেকে অস্ত্র বের করে প্রতিপক্ষের দিকে তাক করতে দেখা যায়। অবশ্য প্রত্যক্ষদর্শীরা গুলির শব্দ শুনেছেন বলেও দাবি করেন।

ধাওয়াধাওয়ির এক পর্যায়ে ছাত্রদলের কর্মীরা সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে ঢুকে পড়েন। সেখানেও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে চড়াও হন এবং দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আইনজীবী সমিতি ভবনের কাছে কয়েকজনকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতেও দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর আহত হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের কর্মী নাহিদ চৌধুরী। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, নাহিদকে মাটিতে ফেলে বেশ কয়েকজন বাঁশ ও রড দিয়ে এলাপাতাড়ি পেটাচ্ছেন। হামলাকারীদের দু-একজনকে আবার অন্যদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতেও দেখা গেছে।

সুপ্রিম কোর্টে সংঘর্ষ-ভাঙচুর

দেশের শীর্ষ আদালতের ভেতরে ছাত্রদল-ছাত্রলীগের ধাওয়াধাওয়ি, মারামারির পর সুপ্রিম কোর্ট, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী রবিবার থেকে সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের গেটগুলোতে মানুষের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা যাতে সুপ্রিম কোর্টে নির্বিঘ্নে, স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আদালত অঙ্গনে যাতে কোনো বহিরাগত লোক ঢুকতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

ছাত্রদলের দাবি আহত শতাধিক

৪৭ জন আহতের নাম প্রকাশ করে ছাত্রদলের নেতারা জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম, শাকির আহম্মদ, তানভীর আজাদী, কর্মী শাহিনুর রহমান ও শাহাবুদ্দিন আহমেদের অবস্থা গুরুতর। আহতদের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, শমরিতা হাসপাতাল, আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মাথায় গুরুতর জখম অবস্থায় ছাত্রদলকর্মী সাহাবুদ্দিনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন মূল দল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ছাত্রলীগের পাল্টা অভিযোগ

সংঘর্ষের ব্যাপারে পাল্টা অভিযোগ করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ছাত্রদল আবার তাদের পুরনো রূপে ফিরে আসতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই তাদের প্রতিহত করে এসেছে, ভবিষ্যতেও করবে। অছাত্র-বহিরাগতদের নিয়ে এসে ক্যাম্পাসের পরিবেশ উত্তপ্ত করার সুযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীরা দেবেন না।

মামলা

ক্যাম্পাসের মঙ্গলবারের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৪০০ জনকে আসমি করে বুধবার শাহবাগ থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আবার ক্যাম্পাসের ঘটনার প্রতিবাদে বুধবারে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মশাল মিছিল করে ছাত্রদল। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়াধাওয়ি হয়। পুলিশ ১০ জনকে আটক করে। ওই ঘটনায় গতকাল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এবং ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫০ জনকে আসামি করে পল্টন থানায় মামলা করেছে পুলিশ।

খুলনায় আহত ৩০

খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বিকেলে নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়, কেডি ঘোষ রোড ও থানা মোড় এলাকায় ছাত্রলীগ, বিএনপি-ছাত্রদল ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব শফিকুল আলম তুহিনসহ ১৭ জনকে আটক করেছে।

পটুয়াখালীতে আহত ২০

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, সকাল ১১টার দিকে শহরের বনানী রোড এলাকায় জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশে হামলার ঘটনা ঘটে।

 



সাতদিনের সেরা