kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

সচেতন না হলে এর মূল্য চুকাতে হবে

খসরু চৌধুরী

২২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সচেতন না হলে এর মূল্য চুকাতে হবে

সম্প্রতি সুন্দরবনের একটি জলাধারে ভোঁদরের দেখা মেলে। ছবি : খসরু চৌধুরী

আজ বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস ২০২২।

এই দিনটি আমরা এমন একটা সময় পালন করতে চলেছি যখন আমাদের অবিমৃশ্যকারিতায় আমাদের ধাত্রী ধরিত্রীর নাভিশ্বাস উঠছে। আমাদের প্রশ্বাসের বায়ু দূষিত (আমাদের রাজধানী পৃথিবীর ‘দূষিততম’ নগরীর অন্যতম), আমাদের পানের জল আর্সেনিক, সিসা, নাইট্রোজেন সার সম্পৃক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিশ্র বৃষ্টিপাতের জঙ্গল যে হারে প্রতিবছর উজাড় হয়, আমাদের উজাড়ের হার তার দ্বিগুণ।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের বিশ্বের ঝুঁকি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে। প্রতিবেদনে পৃথিবীর ১৭৩টি দেশের মধ্যে পরিবেশ ঝুঁকির ক্রম নির্বাচন করা হয়েছে। তাতে বাংলাদেশ পৃথিবীর ষষ্ঠতম মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে গণ্য হয়েছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আসছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে।

প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, ভাবনা-চিন্তাহীন ভূত্বকের পরিবর্তন, অপরিণামদর্শী স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন, অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি—বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতন মানুষের জন্য ভয়াবহ দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুশ্চিন্তা দূর করতে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশ কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। এদের মধ্যে অন্যতম হলো, দেশের মোট সীমানার ২৫ শতাংশের বেশি বনভূমি রাখা, বায়োলজিক্যাল হটস্পটগুলো পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখা। উদ্দেশ্য জিনের মজুদ অবিকৃত রাখা।

কিন্তু বিশ্বমানবের দুর্ভাগ্য হলো, পৃথিবীর অন্যতম ধনী জিনব্যাংক হিসেবে প্রসিদ্ধ মিশ্র বৃষ্টিপাতের জঙ্গল, বৃষ্টিপাতের জঙ্গল, নিরক্ষীয় জঙ্গলগুলো ভৌগোলিক অবস্থান পেয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল, দরিদ্র প্রপীড়িত অঞ্চলে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জৈবপ্রাণের মূলধারা এই অঞ্চলগুলো। এই অঞ্চলগুলোর লাগাতার সমস্যা দারিদ্র্য, খাদ্যাভাব, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ফলে দ্রুত উন্নতির আশায় ব্যাপক হারে বনভূমি উজাড় করা হলো। সেখানে করা হলো রাবার, সয়াবিন, পাম অয়েলের বাগান। এসব বাগান থেকে প্রকৃতির কোনো লাভ হলো না—সে হারাল তার প্রাণবৈচিত্র্য। আর বন উজাড় করা কাঠের ভোক্তা হলো উন্নত দেশগুলো। ১৯৭০ সালের পর জৈব তেল বিস্ফোরণের যুগে পেট্রোডলারধারীরা বনজ সম্পদের বড় ভোক্তা হয়ে দাঁড়ায়।

বিষয়গুলো পৃথিবীর সহ্য-সীমানার শেষ প্রান্তে চলে আসে। বাধ্য হয়ে জাতিসংঘ প্রথমবারের মতো পৃথিবীর আসন্ন বিপদত্তারণের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করে। সেই অনুযায়ী ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে হিউম্যান এনভায়রনমেন্ট কনফারেন্স ডাকে। সম্মেলনে অনেক সমস্যা আলোচিত হলেও তা কিভাবে সমাধান করা হবে, কোনো প্রকল্প থাকলে সেটা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, কে অর্থ জোগাবে—এসবের কোনো টেকসই দিক-নির্দেশনা ছিল না। এফএও, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড, আইইউসিএন বিক্ষিপ্তভাবে কিছু প্রকল্পের কাজ করছিল, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি নগণ্য।

স্টকহোম সম্মেলনের পর থেকে বিভিন্ন বিশ্ব সংস্থার বিজ্ঞানী, নানা দেশের বিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিদ, সাংবাদিক, প্রচারমাধ্যমে পৃথিবীর দৈন্য উঠে আসতে থাকলে জাতিসংঘ আবার নড়েচড়ে বসে। স্টকহোম সম্মেলনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিরাট পরিসরে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে সম্মেলন ডাকা হয় ১৯৯২ সালের ৩ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (UNCED), যার সহজ নাম আর্থ সামিট—এই সম্মেলন ডেকেছিল। এবার আর কর্তাব্যক্তিরা ভুল করেননি। এবার নিমন্ত্রণ পান ১৭৯টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনৈতিক, বিজ্ঞানী, গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা।

রিওতে একই সময় এনজিওগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা গ্লোবাল এনজিও ফোরামও সম্মেলন ডেকেছিল। এই ফল বেশ লাগসই হয়েছিল। এর পর থেকে এনজিগুলো তাদের মোটিভেশন কার্যকলাপের সঙ্গে পরিবেশ অঙ্গীভূত করে নেয়।

রিও সম্মেলনে পৃথিবীর রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতি ছিল সাফল্যের প্রতীক, কিন্তু আমেরিকা এই সম্মেলনে স্বাক্ষর করেনি। পরে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ ২৯ ডিসেম্বর তারিখটিকে জাতিসংঘ জীববৈচিত্র্য দিবস নির্ধারণ করে। ২০০০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২২ মে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস নতুন করে নির্ধারণ করে। তারিখটি পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে ২৯ ডিসেম্বর পশ্চিমা বিশ্বে ছুটি থাকে।

প্রতিবারেই জীববৈচিত্র্য দিবসের জন্য একটি স্লোগান থাকে। এবার ২০২২ সালের স্লোগান হচ্ছে, সর্ব জৈবপ্রাণের জন্য সুষম অংশী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

জীববৈচিত্র্য ও আমরা

এই পৃথিবী নানা জাতীয় জীবসত্তার সার্থক বাসস্থান। এই জীবসত্তাদের কেউ কেউ মহাকায়, আবার অনেককেই আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। কোনো নির্দিষ্ট জলবায়ুর এলাকার নির্দিষ্ট ও সমুদয় প্রজাতির মধ্যে জিনগত, প্রজাতিগত, বাস্তুতান্ত্রিক তারতম্য বা বৈচিত্র্য রয়েছে—তাকেই জীববৈজ্ঞানিক বৈচিত্র্য সংক্ষেপে জীববৈচিত্র্য বলা যায়।

বাংলাদেশ ১,৪৭,৪৭০ বর্গকিলোমিটারের ছোট একটি দেশ। আর এ দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় এক হাজার ২০০ মানুষ বাস করে। বাংলাদেশের ভূমির উচ্চতা প্রায় সমুদ্র সমতলের সমান। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে প্রথম কাতারে। বাংলাদেশ কর্কটক্রান্তির দেশ হলেও পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তরে পাহাড়শ্রেণি থাকায় এ দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আর্দ্র আবহাওয়া, জলজ প্রকৃতির কারণে এ দেশে জৈববৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

অনন্যসাধারণ গাছবৈচিত্র্যের কারণে এ দেশে ১৩৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, প্রায় ৬৫০ প্রজাতির পাখি, ১৬৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৯ প্রজাতির উভচর বাস্তুসংস্থান করতে পেরেছে। প্রায় ৩৫০ মাছ (মিঠে জল ও লবণ জল মিলিয়ে) ৩০৫ প্রজাতির প্রজাপতি, দুই হাজার ৪৯৩ প্রজাতির পতঙ্গ, ৩৮২ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া, ১৯ প্রজাতির খুদে রক্তশোষক, ১৬৪ প্রজাতির শৈবাল আমাদের দেশে আছে। কিন্তু অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে আরো অনেক।

আমাদের ভুললে চলবে না, গাছ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে আমাদের প্রশ্বাসের বায়ু শুদ্ধ করছে, জলাধার আমাদের সব প্রাণের উৎস। প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের প্রতিবেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শৃঙ্খল ভেঙে চলেছি—জ্ঞাতসারে বা অজান্তে। সচেতনতা সংশোধন করতে না পারলে এর মূল্য আমাদের চুকাতে হবে। আর সেটা কী ভয়াবহ হতে পারে, তা হয়তো আমাদের দুঃস্বপ্নেরও অতীত।



সাতদিনের সেরা