kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ইউক্রেন পরিস্থিতি
এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

এ বিজয়ে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে

মারিওপোল দখলের মধ্য দিয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আজভ সাগর উপকূলের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে রাশিয়া। এতে পরিষ্কার, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে। কালের কণ্ঠকে এ কথা বলেছেন মস্কোর নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মহাপরিচালক আন্দ্রে কর্চুনফ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান

২২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এ বিজয়ে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে

আন্দ্রে কর্চুনফ

কালের কণ্ঠ : রাশিয়া মারিওপোলে বিজয় ঘোষণা করেছে। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে রাশিয়ার জন্য এ বিজয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ? অন্যদের জন্যও এটি কী বার্তা দেবে।

আন্দ্রে কর্চুনফ : আমার মনে হয়, রাশিয়ার মারিওপোল বিজয় প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাশিয়া এখন দাবি করতে পারে, আজভ সাগরের পুরো উপকূলই তার নিয়ন্ত্রণে।

বিজ্ঞাপন

সামরিক দিক থেকে এটি তাৎপর্যপূর্ণ বিজয়। তবে এই

 বিজয়ের মধ্য দিয়ে সংঘাত শেষ হচ্ছে না। অবশ্যই ইউক্রেন মারিওপোলে আবার তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত রাশিয়া দাবি করতে পারে যে তার সামরিক অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলছে।

কালের কণ্ঠ : এখন কি তাহলে যুদ্ধ নতুন মাত্রায় পৌঁছল?

আন্দ্রে কর্চুনফ : সামনে কী ঘটবে তা নিয়ে শুধু আমরা অনুমান করতে পারি। আমার ব্যক্তিগত ও আন্তরিক প্রত্যাশা, আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত থেমে যাক। মে মাসের শেষ নাগাদ বা জুনে যুদ্ধের একটি বিরতি দেখা যেতে পারে। কারণ উভয় পক্ষই ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের আবারও নিজেদের গোছানোর ও শক্তিসঞ্চারের বিষয় আছে। যুদ্ধে যে নতুন ‘ফ্রন্ট লাইন’ বা সম্মুখ রেখা তৈরি হচ্ছে, সেখানে উভয় পক্ষকেই অতিরিক্ত শক্তি মোতায়েন করতে হবে। বড় প্রশ্ন হলো, কিছুদিনের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি আসতে যাচ্ছে তা কূটনৈতিকভাবে

এই সংকট সমাধানে কতটা কাজে লাগানো যাবে? নাকি এটি কোনো রাজনৈতিক সমাধান ছাড়াই যুদ্ধবিরতি হবে?—এ বিষয়গুলো আমরা জানি না। আমরা আশা করতে পারি, যুদ্ধবিরতিকে জোরালো কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কাজে লাগানো হবে।

কালের কণ্ঠ : গত ফেব্রুয়ারিতে আপনি বলেছিলেন, এই যুদ্ধে রাশিয়ার অর্জনের সুযোগ কম। বরং হারানোর সম্ভাবনা বেশি। আজও কি তাই মনে করেন?

আন্দ্রে কর্চুনফ : হ্যাঁ। আমি আজও তাই মনে করি। আমি বিশ্বাস করি, যত দ্রুত সম্ভব এই যুদ্ধ শেষ হওয়া প্রয়োজন। উভয় পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। মুখ রক্ষা করে যুদ্ধ থামানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিও প্রমাণ করছে যে এই সংঘাত থামাতে কূটনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে ভালো উপায়।

কালের কণ্ঠ : ২০১৪ সালে আমরা ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তিকরণ দেখেছি। এবার যুদ্ধ শুরু দোনেত্স্ক ও লোহানস্কর স্বাধীনতা ঘোষণা করে রাশিয়ার সেনা পাঠানোর মধ্য দিয়ে। ক্রিমিয়ার মতো  দোনেত্স্ক ও লোহানস্কও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? ইউক্রেন নিশ্চয়ই দোনেত্স্ক ও লোহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেবে না।

আন্দ্রে কর্চুনফ : আমিও তাই মনে করি। ইউক্রেন তার ভূখণ্ডে নতুন কোনো রাষ্ট্রকে স্বীকার করবে না। আমাদের মনে রাখা উচিত, ক্রিমিয়া অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। সেখানে আগে থেকেই রাশিয়ার অনেক প্রভাব ছিল। তাই ক্রিমিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের অন্য অংশগুলোর তুলনা করা ঠিক হবে না। ইউক্রেনের যে অংশগুলোয় এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে অন্য কোনো সমাধান খুঁজতে হবে।

কালের কণ্ঠ : রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলো একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। রাশিয়া এতে কতটা সমস্যায় পড়েছে?

আন্দ্রে কর্চুনফ : নিষেধাজ্ঞা ভালো কোনো ব্যবস্থা নয়। রাশিয়ার অর্থনীতিতেও নিষেধাজ্ঞার দংশন আছে। তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার নেওয়া ব্যবস্থাগুলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোটামুটি সামাল দিতে পেরেছে। আমার মনে হয়, সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা রাজধানী মস্কো বা বড় শহরগুলোর বাইরে আছে, তারা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এখনো খুব একটা টের পাচ্ছে না। তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়তে আরো সময় লাগবে। হয়তো আগামী বছর তা পড়বে। এখন প্রভাব না পড়লেও তারা ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অনুভব করতে শুরু করবে।

কালের কণ্ঠ : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব তো সারা বিশ্বে পড়ছে। বাংলাদেশের মতো দেশেও পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়ছে। যুদ্ধ থামলে কি পণ্যের দাম কমবে?

আন্দ্রে কর্চুনফ : আমরা শুধু আশা করতে পারি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। অন্তত খুব দেরি হওয়ার আগেই তা হবে। সংঘাতের সমাধান হলে খাদ্য, কৃষিপণ্য ও জ্বালানির দামও কমে আসবে। তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। সংঘাতের যে ধাক্কা লেগেছে, তা আমাদেরই সামলে নিতে হবে। আমাদের মনে রাখা উচিত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতই একমাত্র কারণ নয়। নভেল করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বে মন্দাভাব দেখা দিয়েছিল। সেটিও মোকাবেলা করতে হবে।

কালের কণ্ঠ : রাশিয়ার কর্মকর্তারা বলছেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার জন্য অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এটি সুযোগ। আপনিও কি তা মনে করেন?

আন্দ্রে কর্চুনফ : পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার বাজার ছেড়ে যাওয়ার পর শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যস্থান বাংলাদেশসহ অন্যরা পূরণ করতে পারে। বেসরকারি খাতকে এখানে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সামর্থ্য ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় আছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এ সুযোগ কাজ লাগাতে পারে। তবে আমার ধারণা, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্ভাবনা জোরদারের ক্ষেত্রে বেশ সতর্কতার সঙ্গেই এগোবে।

কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আন্দ্রে কর্চুনফ : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ।



সাতদিনের সেরা