kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

শেষমেশ ড্রই হলো চট্টগ্রামে

শ্রীলঙ্কা : ৩৯৭ ও ২৬০/৬, বাংলাদেশ : ৪৬৫, ফল : ড্র

সাইদুজ্জামান, চট্টগ্রাম থেকে   

২০ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শেষমেশ ড্রই হলো চট্টগ্রামে

‘নটে গাছটি মুড়ল’, চট্টগ্রাম টেস্ট ড্র হলো। শেষ দিনের শেষ সেশনে দুই দল মাঠে নামার আগেই প্রেস বক্সে অস্থিরতা—এই ম্যাচের আর কোনো মানে নেই। শেষ হলে স্বস্তিতে ঢাকায় ফেরার রাতের বাস ধরা যাবে যে! প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করা ক্রিকেটারদের মধ্যে নিরোশান ডিকভেলার ব্যক্তিগত ফিফটি ছাড়া আর কারো কোনো চাহিদা ছিল বলে মনে হয়নি। আইসিসির বাধ্যবাধকতা মাঠে নামিয়েছিল সবাইকে।

বিজ্ঞাপন

শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসের খেলা ন্যূনতম ৯০ ওভার হতেই হবে। আগের দিনের অসমাপ্ত ওভার গতকাল সকালে তাইজুল ইসলাম শেষ করায় ৯০তম ওভারের শেষ বলটি করেছেন মাহমুদুল হাসান, যা টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর প্রথম।

চট্টগ্রামের ফ্ল্যাট উইকেটে প্রায় দেড় ইনিংস অসমাপ্ত থাকা ড্র ম্যাচ সাদা চোখে ম্যাড়মেড়ে মনে হতে পারে, কিন্তু পাঁচ দিনের ক্রিকেটে রোমাঞ্চের ঘাটতি ছিল না। হারের সম্ভাবনা তাড়িয়ে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় জয়ের সরু আলোও দেখতে পাচ্ছিল বাংলাদেশ দল। গতকাল প্রথম সেশনের শেষ ঘণ্টায় মাত্র ৩৭ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে সেই সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন তাইজুল ইসলাম। আগের দিন সরাসরি থ্রোতে শ্রীলঙ্কার উদ্বোধনী জুটি ভাঙা এই বাঁহাতি স্পিনারের চার শিকার হয়ে গেছে ততক্ষণে। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর সাকিব আল হাসানের লং হপ পুল করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দিয়ে ধনঞ্জয়া ডি সিলভা ষষ্ঠ ব্যাটার হিসেবে আউট হয়েছেন দলকে ১৬১ রানে রেখে।

যোগ-বিয়োগের ফল, তখন বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র ৯৩ রানে এগিয়ে সফরকারীরা। দীনেশ চান্দিমাল ও নিরোশান ডিকভেলার জুটি ভাঙতে পারলেই ম্যাচ প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়বে বাংলাদেশের দিকে, কিন্তু সেই সুযোগ আর দেয়নি লঙ্কার শেষ স্বীকৃত ব্যাটিং জুটি। প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি বাংলাদেশের বোলিং ইউনিটও। চান্দিমাল ও ডিকভেলা জুটি শেষ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন থাকেন দলের সংগ্রহে ৯৯ রান যোগ করে।

এই ড্র ম্যাচে উপভোগ্য ক্রিকেটের মসলা আরো আছে। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের কথাই ধরুন। দলের সবটুকু দায়িত্ব নিয়ে প্রথম ইনিংসে ১৯৯ রান করা এই ব্যাটার গতকাল আউট হয়েছেন রানের খাতা খোলার আগেই। ম্যাথুজের দায়িত্বশীলতার ছায়া তামিম ইকবালের ব্যাটে দেখেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ জেমি সিডন্স। সেই তিনি রিটায়ার্ড হার্ট থেকে ফিরে দ্বিতীয়বার নেমেছিলেন, কিন্তু আউট হয়েছেন নিজের ১৩৩ রানের ইনিংসের সঙ্গে কোনো রান যোগ না করেই। মুশফিকুর রহিমের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরির গতি মন্থরতা নিয়ে আক্ষেপ আছে। তবে তাঁর খেলা ধীরতম এই সেঞ্চুরি যে বাড়তি সময়টুকু শুষে নিয়েছে, তা বাংলাদেশের পক্ষেই গেছে। বিশেষ করে গতকাল সকালে কুশল মেন্ডিস যে গতিতে ব্যাট করছিলেন, তাতে শ্রীলঙ্কা বাড়তি সময় পেলে বিপাকে পড়তে পারত বাংলাদেশও। লিটন দাসের নান্দনিক ইনিংসের পরিণতি হয়েছে কি না আলস্যভরা এক শটে। তার চেয়েও বিস্ময়কর, চট্টগ্রামের উইকেটে লঙ্কান পেসারদের অভাবিত সাফল্য, যার নেতৃত্বে আবার ‘কনকাশন সাব’ কাসুন রাজিথা। বাংলাদেশ ইনিংসের মাঝপথে নেমে ৪ উইকেট নিয়েছেন এই পেসার। বাউন্সারে বাউন্সারে ৩ উইকেট নিয়েছেন আরেক পেসার আসিথা ফার্নান্ডো। পুরো ম্যাচে ৪৩ ওভার বোলিং করেও উইকেটহীন থেকেছেন বাংলাদেশ দলের দুই পেসার।

শুধু উইকেট ব্যবধানেই নয়, মানেও বাংলাদেশের পেস ডিপার্টমেন্টকে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। তবে প্রথম ইনিংসের ব্যবধানই বলে দেয়, চট্টগ্রামের উইকেটের সুবিধা বেশি কাজে লাগিয়েছে বাংলাদেশ দল। তবে শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংসে ফিরে গেলে মনে হবে এই ব্যবধান গড়ার অর্ধেক প্রশংসা বাংলাদেশের স্পিনারদের কৃতিত্ব। ক্যারিয়ারসেরা ১০৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটারের পুরস্কার জিতেছেন অফস্পিনার নাঈম হাসান। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা লঙ্কানরা যখনই অক্সিজেন পেয়ে বড় জুটি গড়ার পথে উঠেছে, তখনই তাদের ছিটকে ফেলেছেন তিনি। বিরামহীনভাবে উইকেট টু উইকেট বোলিং করে শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংসে রান আটকেছেন তাইজুল ইসলাম। আর স্পিনারদের এই সাফল্যে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাকিব আল হাসান। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছেন, ওভারপিছু রান দিয়েছেন ১.৮৮ করে। মোট বোলিং করেছেন ৬৪ ওভার। চট্টগ্রামের এই ভাপসা গরমে সাকিবের এই ওয়ার্কলোড সম্ভবত স্পোর্টস সায়েন্সের চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে!

ক্রিকেটে ছিলেন না প্রায় তিন সপ্তাহ। লাল বলের বিরতি চার মাসেরও বেশিদিনের। এরপর কভিড পজিটিভ। চট্টগ্রাম টেস্ট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে নেগেটিভ হয়ে পরদিন নেটে ৩৫ মিনিট ব্যাটিং করেই নিজেকে ফিট ঘোষণা করেন সাকিব, যা মোটেও ব্যাকরণসিদ্ধ নয়। তবে তিনি যে সাকিব, চট্টগ্রাম টেস্ট আবার সেটি মনে করিয়ে দিয়েছে।

দুই দলের নৈপুণ্য বিশ্লেষণে চট্টগ্রাম টেস্ট চিরায়ত একটি বিশ্বাসের জয়গান গেয়েছে, সেটি অভিজ্ঞতার। শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংস দানবীয় দৃঢ়তায় বয়ে নিয়েছিলেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে সেই রোলটা ভাগাভাগি করেছেন তামিম ইকবাল ও মুশফিক। বোলিংয়ে সফলতম অবশ্যই নাঈম, তবে তাঁকে এবং তাইজুলকে যেন পথ দেখিয়েছেন সাকিব। টেস্ট ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা এমনই অমূল্য।

 

 



সাতদিনের সেরা