kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

বেঁচে থাকবেন একুশের গানে

শাহরিয়ার কবির

২০ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বেঁচে থাকবেন একুশের গানে

পরিণত বয়সে হলেও কারো কারো মৃত্যু কখনো কাম্য নয়—এমনই বিরলপ্রজ মানুষ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। লেখক, সাংবাদিক এবং পরিণত বয়সে কলাম লেখক হিসেবে জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন কিংবদন্তি। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তাঁর স্বচ্ছন্দ পদচারণ ছিল না। তবে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িকীর কলাম লেখক হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

৫০ বছরের সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি—গাফ্ফার ভাইয়ের মতো জনপ্রিয় ক্ষুরধার কলাম লেখক তাঁর অগ্রজ, সমসাময়িক কিংবা অনুজদের ভেতর দেখিনি।

তিনি জন্মেছেন ব্রিটিশ ভারতে। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম তাঁকে কিভাবে আকৃষ্ট করেছিল তাঁর শৈশব স্মৃতিতে সেসবের বিবরণ রয়েছে। তাঁর দুর্মর যৌবন কেটেছে পাকিস্তানের ২৪ বছরের কলোনিকালে। সাহসী কলমযোদ্ধা হিসেবে সে সময়ই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি। যে একুশের গানের রচয়িতা হিসেবে তিনি বিশ্বের ৩০ কোটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল স্বমহিমায় অবস্থান করবেন সেটি প্রথম ছাপা হয়েছিল সংবাদপত্রে। সংবাদপত্রের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল আমৃত্যু। গত কয়েক বছর এক রকম শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। কঠিন শারীরিক ব্যাধি তাঁর মনকে এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি। বিরামহীন লিখেছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন; এমনকি করোনাকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাঁর উপস্থিতি ছিল সরব। তিন মাস আগে তাঁর সঙ্গে একটি ওয়েবিনারে কথা প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলেন আমি কবে লন্ডন যাব। তাঁকে জুলাই মাসের কথা বলেছিলাম। মৃদু হেসে তিনি বলেছিলেন, তত দিন আমি বেঁচে থাকব না।

গত কয়েক বছরে তিনি তাঁর বন্ধু ও অগ্রজ সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের হারিয়েছেন। মৃত্যুর পর অবিচ্যুয়ারি লিখেছেন। প্রতিটি লেখায় তাঁর গভীরতম বেদনাবোধ প্রত্যক্ষ করেছি। ক্রমে একা হয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। জীবনসঙ্গিনীর মৃত্যু দেখেছেন তিনি। কিছুদিন আগে আত্মজার মৃত্যুশোকও তাঁকে সইতে হয়েছে। যখন তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনন্তলোকের যাত্রী হলেন তখন অবিচ্যুয়ারি লেখার যোগ্য সুহৃদ ও অগ্রজজনের তেমন কেউ আর বেঁচে নেই। আমাদের মতো কিছু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তাঁকে স্মরণ করার জন্য। চিকিৎসকরা তাঁকে ছ মাস আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন মৃত্যুর সময়সীমা। কথা প্রসঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় শিশুসুলভ সারল্যের সঙ্গে তিনি কৌতূহল প্রকাশ করেছেন—মৃত্যুর পর মানুষ তাঁকে মনে রাখবে কি না। বলেছিলাম—জাতি হিসেবে বাঙালি যত দিন বেঁচে থাকবে তত দিন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীও বেঁচে থাকবেন শুধু একুশের গানের জন্য, যেটি তিনি লিখেছিলেন ১৮ বছর বয়সে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমার সোনার বাংলা’ লিখেছেন ১৯০৫ সালে, যখন তাঁর বয়স ৪৪। গাফ্ফার ভাই তাঁর বিভিন্ন লেখায় বারবার রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেছেন, রবীন্দ্রপ্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন তিনি। আমাদের জাতীয় সংগীতের পর দুই বাংলায় সবচেয়ে বেশি যে গানটি গাওয়া হয় সেটি গাফ্ফার ভাইয়ের একুশের গান। ২০০৬ সালে বিবিসি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের যে তালিকা তৈরি করেছে তার প্রথম গান বলাবাহুল্য ‘আমার সোনার বাংলা’, এবং তৃতীয় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। একুশের প্রভাতফেরিতে রাজধানী ঢাকা থেকে আরম্ভ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব বয়সী মানুষ গাফ্ফার ভাইয়ের গান গেয়েই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরাসহ সমগ্র বিশ্বের বাঙালিরা অন্তত একুশে ফেব্রুয়ারিতে হলেও এই গানটি শোনেন। এ গানে শুধু বেদনা নয়, ক্রোধ ও দ্রোহের কথাও রয়েছে।

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে নির্মিত গাফ্ফার চৌধুরীর সতীর্থ সুহৃদ বরেণ্য চিত্রনির্মাতা জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণদ্রোহের অভিব্যক্তি হিসেবে তিনটি গান ব্যবহার করা হয়েছিল। এর প্রথমটি রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’, দ্বিতীয়টি নজরুলের ‘কারার ওই লৌহকপাট’ এবং তৃতীয়টি গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। জহির রায়হানের ছবি এবং এসব গান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক পটভূমি নির্মাণ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের সাংস্কৃতিক স্কোয়াড থেকে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তুলে ধরে একটি গীতি-আলেখ্য রচনার। ‘রূপান্তরের গান’ নামের এই গীতি-আলেখ্যতে আমি গাফ্ফার ভাইয়ের একুশের গান পুরোটাই ব্যবহার করেছিলাম, যা প্রভাতফেরিতে শোনা যায় না। একুশের গানের চতুর্থ স্তবকে গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন—‘সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা/তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা/ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবিকে রোখে/ ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে/ওরা এদেশের নয়....। ’ গাফ্ফার ভাইয়ের এই গান শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরও কিভাবে উদ্দীপ্ত ও মোহিত করেছে মুক্তিযুদ্ধকালে তা প্রত্যক্ষ করেছি।

একুশ আর একাত্তরের শত্রুদের প্রকৃত চেহারা চিরকাল তিনি এভাবেই উন্মোচন করেছেন প্রচণ্ড সাহসের সঙ্গে। একুশ ও একাত্তরে বাঙালির প্রতিপক্ষ পাকিস্তানি আদর্শের ধারক মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যখনই সুযোগ পেয়েছে তাঁকে আক্রমণ করেছে।

১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যখন ’৭১-এর গণহত্যাকারী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াত-শিবির চক্রের মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের নাগরিক আন্দোলন আরম্ভ হয় তখন থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বাঙালির বিবেক হিসেবে পরিচিত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। গণহত্যাকারীদের স্বরূপ উন্মোচনসহ গণহত্যাকারীদের বিচারের পক্ষে জনমত সংগঠিত এবং তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী অতুলনীয় অবদান রেখেছে, যে কারণে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই তাদের গণমাধ্যমে তাঁকে কদর্য ভাষায় আক্রমণ করেছে। নাৎসিবাদের একনিষ্ঠ অনুসারী জামায়াত বিশ্বাস করে নাৎসি নেতা গোয়েবলসের মিথ্যাচারের নীতিতে। শুধু গাফ্ফার চৌধুরী নন, বর্তমান সরকারের আমলে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে রামুতে নিরীহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা থেকে আরম্ভ করে যাবতীয় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস এবং পরবর্তীকালে ‘নাস্তিক’ ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে তরুণ ব্লগারদের হত্যাকাণ্ডের অজুহাত সৃষ্টির জন্য হেফাজত-জামায়াত-বিএনপিরা (মুনতাসীর মামুনের ভাষায় হেজাবি) সব সময় কদর্য মিথ্যাচার অবলম্বন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশীদের আজরাইল ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।

বাংলাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির দৌরাত্ম্য যত দিন থাকবে তত দিন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক চেতনায় দীপ্ত রচনাবলি জাতির বিবেক হিসেবে আমাদের পথ প্রদর্শন করবে।

 

লেখক : সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি

 

 



সাতদিনের সেরা