kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

বিশেষজ্ঞ মত

রনিলে আশা রেখে শান্ত সংকটময় শ্রীলঙ্কা

জথীন্দ্র আরিয়াপালা, শ্রীলঙ্কা থেকে

১৯ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রনিলে আশা রেখে শান্ত সংকটময় শ্রীলঙ্কা

জথীন্দ্র আরিয়াপালা

শ্রীলঙ্কা এখন এক অপেক্ষমাণ মানুষের সারি। এ অপেক্ষা জ্বালানি তেলের, ব্যাংক নোটের। ভেঙে পড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় পর পর বিদ্যুৎ ফিরে পাওয়ার আশা তো আছেই।

তবে শ্রীলঙ্কার জনগণ গত সপ্তাহে যে ক্ষোভ দেখিয়েছিল তা এখন অনেকটাই কমেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে শিক্ষিত বাসিন্দারা বুঝতে পারছে, যে সংকটে শ্রীলঙ্কা পড়েছে তাই এখন বাস্তবতা। সাধারণ জনগণও অনুধাবন করছে, সংকটের চোরাবালিতে তারা আটকে গেছে। এখন তাদের উদ্ধারে যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর কাজে বাধা দেওয়ার চেয়ে বরং সহযোগিতা করাই ভালো। সব সময় আন্দোলন, উসকানির ফল ভালো হয় না। জনগণ শান্ত আছে।

প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষের পদত্যাগের পর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। সংকট কাটানোর গুরুদায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। শ্রীলঙ্কার বাইরের অনেকে জেনে অবাক হতে পারেন, রনিল বিক্রমাসিংহে শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে তাঁর দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির একমাত্র সদস্য। আরো স্পষ্টভাবে বললে, ২২৫ সদস্যকে নিয়ে গড়া শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির এমপি মাত্র একজন। আর তিনি রনিল বিক্রমাসিংহে। পরিস্থিতির কারণেই জাতির কাণ্ডারি হওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ তিনি পেয়েছেন। পঞ্চমবারের মতো তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। অতীতে দুবার বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই, তাঁর এবারের দায়িত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক কঠিন।

প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে গত সোমবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছেন, সামনের দিনগুলো আরো সংকটময় হতে পারে। সহযোগিতা পাওয়ার আশায় তিনি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলেছেন।

আমরা আশা করি, শ্রীলঙ্কার ওপর থেকে সংকটের মেঘ কেটে যাবে।

পরিস্থিতি ভালো হবে। তবে এই আশা যে পূরণ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ধারণা, রনিল বিক্রমাসিংহের সঙ্গে বৈশ্বিক যোগাযোগ ভালো। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব অনেকটা পশ্চিমাপন্থী। তিনি পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারবেন। কলম্বোতে কেউ এখন তাঁর জন্য কোনো সমস্যা করছে না।

অন্যদিকে, গোতাবায়া এখনো ক্ষমতায়। সংকট মোকাবেলায় তিনি নিজে তেমন কিছু করতে পারছেন না। জনগণের দাবির মুখে নিজের ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়েছেন। এরপর রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অনুরোধ করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকে সমর্থন করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রনিলকে তাঁদের প্রয়োজন। বিরোধী দলগুলোও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে রনিলকে সমর্থন করতে সম্মত হয়েছে।

রনিল বিক্রমাসিংহে শ্রীলঙ্কায় জনপ্রিয় রাজনৈতিক কোনো নেতা নন। তাঁর মেধার কারণে গোতাবায়া তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। গোতাবায়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রথমে দিয়েছিলেন বিরোধী নেতা সজিত প্রেমাদাসাকে। কিন্তু সজিত প্রেমাদাসা এ ক্ষেত্রে কতগুলো শর্ত দিয়েছিলেন। এর একটি ছিল প্রেসিডেন্ট পদ থেকে গোতাবায়ার পদত্যাগ বা পদত্যাগের জন্য সময়সীমা ঘোষণা করা। গোতাবায়া তাতে রাজি হননি। রনিল বিক্রমাসিংহেও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কিছু শর্ত দিয়েছেন। কিন্তু সেই শর্তগুলো আমরা এখনো জানি না।

রনিল বিক্রমাসিংহেকে সফল হতে হলে অন্য দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন। এখন শ্রীলঙ্কার যে পরিস্থিতি তাতে বিদেশের সহযোগিতার ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর জন্য দেশ চালানো কঠিন। আমার মনে হয়, নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রনিলকে বেছে নেওয়ার পেছনে বিদেশি সমর্থন, সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টিই মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। রনিল বলেছেন, তিনি এখন শ্রীলঙ্কার জনগণের জন্য তিন বেলা খাবার নিশ্চিত করতে চান। এটিই তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার।

ভারত একমাত্র দেশ যে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটে বড় ধরনের সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারত ভবিষ্যতে আরো সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে। কিন্তু এত বড় সংকটে একটি দেশ এককভাবে কতটা সহযোগিতা করতে পারবে তা নিয়েও নানান ভাবনা আছে। আমার মনে হয়, প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সহযোগিতা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের এ-ও বিবেচনায় নিতে হবে যে এই সহযোগিতা যথেষ্ট নয়। অন্য দেশগুলো থেকেও আমাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী রনিল বলেছেন, তিনি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ সব দেশের সঙ্গেই এ বিষয়ে কথা বলবেন। আমি মনে করি, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান—এই চার দেশ এখন শ্রীলঙ্কার কাছে অগ্রাধিকার। এই দেশগুলো কোয়াড সদস্য, ইন্দো প্যাসিফিক কৌশলেরও অংশ।

আমি আগেই বলেছি, রনিল বিক্রমাসিংহের পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আমার ধারণা, পশ্চিমা দেশগুলো তাঁকে সহযোগিতা করবে। এটি তাঁর জন্য ইতিবাচক হবে।

অনেকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে মাহিন্দা রাজাপক্ষের বিদায়ের পর সারা দেশের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ভিন্ন বক্তব্যও আছে। বড় বিষয় হলো, জনরোষের পর মাহিন্দা রাজাপক্ষে এখনো শ্রীলঙ্কাতেই আছেন।

বড় কথা, শ্রীলঙ্কার জনগণ শান্ত আছে। তাদের একমাত্র প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোর পরিস্থিতি আজকের চেয়ে ভালো হবে। রনিল বিক্রমাসিংহে ব্যর্থ হলে দেশ সামনে আরো বিপদে পড়বে।

জথীন্দ্র আরিয়াপালা : শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ—ত্রিনকোমালির (সিএসএসটি) নির্বাহী পরিচালক।

 



সাতদিনের সেরা