kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

সম্ভাব্য ড্রয়ের ম্যাচেও রোমাঞ্চের উঁকিঝুঁকি

সাইদুজ্জামান, চট্টগ্রাম থেকে   

১৯ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সম্ভাব্য ড্রয়ের ম্যাচেও রোমাঞ্চের উঁকিঝুঁকি

ইতিহাস গড়লেন মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্টে পা রাখলেন ৫০০০ রানের মাইলফলকে। ছবি : মীর ফরিদ

চতুর্থ দিনের শেষ দিকে স্পিনাররা সামান্য টার্ন পেয়েছেন। মোটের ওপর চট্টগ্রামের উইকেট এখনো ব্যাটারদের সাজানো বসার ঘর আছে। তাতে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সিরিজের প্রথম টেস্ট ড্রয়ের দিকেই ঝুঁকে। তবে গতকাল বুধবার ৬৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়বার ব্যাট করতে নামা সফরকারীদের দুই উইকেট তুলে নিয়ে স্বাগতিকদের উচ্ছ্বাসে প্রতিপক্ষকে অ্যাম্বুশ করার উল্লাসও মিশে ছিল।

বিজ্ঞাপন

আজ শেষ দিনে ২৯ রানে পিছিয়ে থাকা প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে যদি জয় তুলে নেওয়া যায়,  সেই ভাবনা নিশ্চয়ই আছে বাংলাদেশের। তার পরও ড্র-ই সম্ভাবনার রেসে এগিয়ে।

এমন ম্যাচ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত অর্জন অগ্রাধিকার পায়। দারুণ এক ল্যান্ডমার্ক পেরিয়ে যেমন স্পটলাইট নিজের ওপর টেনে নিয়েছেন মুশফিকুর রহিম। ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে অষ্টম টেস্ট সেঞ্চুরি ছাপিয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তাঁর পাঁচ হাজার রানের সিংহদ্বার খোলা নিয়ে বন্দনাগীতি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই ল্যান্ডমার্ক থেকে ১৫ রান দূরে ছিলেন মুশফিক। সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এটুকু পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি ৬৫ মিনিটে, ৪৮ বল খেলে। অবশ্য চট্টগ্রামে মুশফিকের পুরো ইনিংসটাই বিন্দু বিন্দু ঘামে কেনা। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা ব্যাট করা মুশফিক ১০৫ রান করতে খেলেছেন ২৮২ বল। অথচ বাউন্ডারি মাত্র চারটি। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞতম ব্যাটারের এটা সবচেয়ে ধীরগতির সেঞ্চুরি। বাউন্ডারির সংখ্যা বিবেচনায় যা বিশ্বরেকর্ডও। এত কম বাউন্ডারি নেই আর কারো টেস্ট সেঞ্চুরিতে।

টি-টোয়েন্টির জমানায় তাই মুশফিকের এই হাড়ভাঙা খাটুনির বিশেষ মূল্য নেই। বরং ধীরগতির এই ইনিংস সমালোচিত হয়েছে কোথাও কোথাও, বাংলাদেশের গেম প্ল্যান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন বাগে পেয়েও জেতার জন্য দ্রুততার সঙ্গে প্রতিপক্ষের ঘাড়ে রানের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো না। হলো না, মুশফিকের ধীরগতির ব্যাটিংয়ের কারণেই! টেস্টের স্ট্যান্ডার্ড আলোচনায় এই সমালোচনার ভিত্তি আছে। তবে বাংলাদেশ দলের টেস্ট মানে নেই। এই দলটিই তো সবশেষ সফরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশাল ব্যবধানে হেরে এসেছে। চলমান সিরিজের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আগের ২২ টেস্টে জয় মাত্র একটি, হার ১৪টিতে। এমন অবস্থায় আগে ড্র নিশ্চিত করার জন্য তো জীবনবাজি রাখবেই বাংলাদেশ। ভাগ্য ভালো যে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর টানা দুই বলে লিটন দাস ও তামিম ইকবাল আউট হওয়ার পর আরো গুটিয়ে গিয়েছিলেন মুশফিক। একই সেশনে সাকিব আল হাসান ফিরে যাওয়ার পর টেলএন্ডারদের নিয়ে খুব বেশি রান না করলেও সময় পার করেছেন মুশফিক, যা শ্রীলঙ্কাকে জয়ের মরিয়া চেষ্টার সুযোগও দিচ্ছে না। পাঁচ হাজার রানের মাইলফলক পেরোনোর জন্য উপহারের কেকটির সঙ্গে এই কৃতিত্বের বিনিময়ে একটি ক্রেস্টেরও দাবিদার মুশফিকুর রহিম। সে রকম কিছু হলে নিশ্চিতভাবেই তিনি পিঠ চাপড়ে দিতেন নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলামকে, শেষ দিকে উইকেট আঁকড়ে পড়ে থাকার জন্য।

তবে দিনের স্ক্রিপ্টটা জনতার দাবি মেনেও হতে পারত। ৩ উইকেটে ৩১৮ রান নিয়ে গতকাল মাঠে নামা বাংলাদেশ প্রথম সেশন শেষ করেছে বিনা ক্ষতিতে। তৃতীয় দিন যেখানে শেষ করেছিলেন, মুশফিক ও লিটন গতকাল শুরু করেছিলেন সেখান থেকেই। সতর্ক তবে বিশ্বস্ত ব্যাটে লঙ্কান বোলার-ফিল্ডারদের প্রাণশক্তি শুষে নিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিরতির পর আচমকাই ছন্দঃপতন। ‘কনকাশন সাব’ হয়ে চট্টগ্রামে নেমে পড়া কাসুন রাজিথার প্রথম বলটা ছিল আড়মোড়া ভাঙার মতো কোনো রকমে ছেড়ে দেওয়ার মতো ডেলিভারিই। কিন্তু অফস্টাম্পের দেড় হাত বাইরে দিয়ে যাওয়া সেই বলই তাড়া করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছেন লিটন (৮৮)। বিশ্বাসই হচ্ছিল না ও রকম অকারণ বলে কোনো ব্যাটার আউট হতে পারেন। অবশ্য ব্যাটিংটা তিনি যেমন সহজ বানিয়ে ফেলেন তেমনই উইকেটও দেন সহজে।

লিটনের বিদায়ে ২০১ রানে চতুর্থ উইকেট জুটি ভাঙার পর ক্রিজে নামেন চট্টগ্রাম টেস্টের আরেক আকর্ষণ তামিম ইকবাল। পানিশূন্যতার কারণে আগের দিন ব্যক্তিগত ১৩৩ রানে সাজঘরে ফিরে গিয়েছিলেন। মুশফিকের খোলা নতুন ক্লাবে প্রবেশাধিকার পেতে মাত্র ১৯ রান চাই তামিমের। কিন্তু কিসের কী, উল্টো রাজিথার হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলেন তিনি। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে ভেতরে ঢোকা বলে তামিমকে ফাঁদে ফেলেছেন শ্রীলঙ্কান পেসার। ড্রাইভ খেলতে গিয়ে সেই ফাঁদে ধরাও দিয়েছেন বাংলাদেশি ওপেনার। ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে তাঁর স্টাম্প ভেঙেছেন রাজিথা। দীর্ঘ প্রস্তুতির অভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু ততক্ষণে নিষ্প্রাণ উইকেটে অনন্যোপায় লঙ্কান পেসাররা পাঁজরসোজা বোলিংকে সংকট থেকে উত্তরণের অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছেন। আসিথা ফার্নান্ডো এই পরিকল্পনার দারুণ বাস্তবায়নও করেছেন। সাকিবের হেলমেটে বাউন্সার ঠুকে পরের ওভারে আরেকটি বাউন্সারে বাংলাদেশের শীর্ষ তারকাকে (২৬) তুলেও নিয়েছেন আসিথা। একই পন্থায় তাইজুল ইসলামকেও ফিরিয়েছেন তিনি। নাঈম হাসানের উইকেটটি অফ স্পিনার ধনঞ্জয়া ডি সিলভা পেয়েছেন, তবে তাঁর প্রতিরোধের শক্তি শুষে নিয়েছিল লঙ্কান পেসারদের পাঁজর বরাবর ধেয়ে আসা বলগুলো। আরেকটি বাউন্সারে চোট নিয়ে শরীফুল ইসলাম মাঠ ছাড়ায় শেষ হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। ৪ উইকেট নিয়ে সফরকারীদের সফলতম বোলার রাজিথা।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ইনিংসের সাতটি উইকেট লঙ্কান পেসারদের দখলে গেছে, উইকেটের চরিত্র বিবেচনায় যা দারুণ ব্যাপার। বাংলাদেশ অবশ্য নিজেদের অভ্যস্ত ফর্মুলায়ই গেছে। নতুন বল উঠেছে নাঈম হাসানের হাতে। খালেদ আহমেদকে দিয়ে ১ ওভার করিয়ে সাফল্যের জন্য সাকিবের পর তাইজুলের দ্বারস্থ হয়েছেন মমিনুল হক। প্রথমে সরাসরি থ্রোতে ওসাদা ফার্নান্ডোকে রান আউট করার পর নাইটওয়াচম্যান এম্বুলদেনিয়াকে ফিরিয়েছেন তাইজুল। ব্যক্তিগত অর্জন ফোকাসে রেখে শুরু হওয়া দিনের শেষটা মোড় নিয়েছে দলীয় অর্জনের দিকে। শেষবেলায় ২ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে বাংলাদেশই। সম্ভাব্য ড্রয়ের পথে ধাবিত ম্যাচও শেষ দিনের আকর্ষণ ধরে রেখেছে।

 

 



সাতদিনের সেরা