kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

আমদানি, উৎপাদনসহ সব ব্যয় বাড়বে

মাসুদ রুমী   

১৮ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমদানি, উৎপাদনসহ সব ব্যয় বাড়বে

দেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছে। খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) মার্কিন ডলারের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ডলারের সংকটও আছে বাজারে। ডলারের বাড়তি দামের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাড়ছে স্থানীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।

কার্ব মার্কেট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত সোমবার ৯৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ৩০ পয়সায় ডলার বিক্রি হয়েছিল। গতকাল মঙ্গলবার খোলাবাজারে দাম চার টাকা বেড়ে ১০২ টাকা হয়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত একেই ডলারের সর্বোচ্চ দাম বলে ধরা হচ্ছে। আন্ত ব্যাংকের সঙ্গে খোলাবাজারে ডলারের দামের ব্যবধান এখন সাড়ে ১৪ টাকা। ৯ মাসে টাকার বিপরীতে ডলারের দর বেড়েছে ৩.১৮ শতাংশ।

গতকাল রাজধানীর গুলশান, মতিঝিল, পল্টনের মানি এক্সচেঞ্জে প্রতি ডলার ১০১ থেকে ১০২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তার পরও পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে পারছে না মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও আন্ত ব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায়। গত সপ্তাহে এর দাম ছিল ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। এর আগে সোমবার দেশের ইতিহাসে টাকার মান নেমে গেছে রেকর্ড পরিমাণে। এক দিনে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ৮০ পয়সা।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানোর পর মুদ্রাবাজারে শক্তিশালী হচ্ছে ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময়ে ডলারের দাম বেড়ে দুই দশকে সর্বোচ্চ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেজারি ইল্ড (যে সুদের হারে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিভিন্ন মেয়াদে অর্থ ঋণ করে) বাড়ার পাশাপাশি চীনের লকডাউনে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে।

ডলারের চড়া দামে শুধু যে আমদানি খাতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে তা নয়, রপ্তানিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা। ব্যাংকে ডলারের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের পার্থক্য বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ার দাবি করেছেন তাঁরা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউক্রেনে যুদ্ধের পর আমদানিতে খরচ বৃদ্ধি শুরু হয়। এখন ডলারের দাম বৃদ্ধি আরো চাপ বাড়াচ্ছে। এর ভুক্তভোগী সবাই। ব্যবসায়ীরাও চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ভুগছে। আমাদের কয়েকটি ভোগ্য পণ্য শতভাগ আমদানিনির্ভর। ’ তিনি বলেন, এখন মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাও এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির দায় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপানোর একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যবসায়ীসহ সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সরকারকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে।

ডিসিসিআই সভাপতির পরামর্শ বাংলাদেশে ডলারের ব্যাংক, কার্ব মার্কেট, রপ্তানির ভিন্ন ভিন্ন রেট—এই বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পর্যটক ও চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী যাত্রীরা। দুশ্চিন্তায় রয়েছেন হজগামী যাত্রীরাও। মানি চেঞ্জার ও খোলাবাজারের মুদ্রা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ দেশের বাইরে ঘুরতে বা চিকিৎসার কাজে যাচ্ছে। ফলে ডলারের চাহিদাও অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় ডলারের সরবরাহ কম। এই কারণেও সংকট তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলারের বাজার স্বাভাবিক করতে আমদানিতে লাগাম টানা ছাড়া এখন আর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময় হারে যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে মুদ্রার আরো অবমূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। এতে প্রবাস আয় ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবারও ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের ১৬ মে পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বিক্রি করা হয়েছে ৫২১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। গত বছরের ২৪ আগস্ট রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল। অব্যাহতভাবে কমতে কমতে এখন রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেলসহ সব পণ্যের আমদানিই এখন বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পণ্য আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। একই সময় বিভিন্ন পণ্যের এলসি বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। ফলে আমদানিতে ডলারের চাহিদা বেশ বেড়েছে। কিন্তু ব্যাংকের কাছে ডলার আসার উৎস রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।

প্রবাস আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা ও আমদানি ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে গত বছরের আগস্ট থেকে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে ডলারের দাম। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ সোমবার ডলারের দর বেঁধে দিয়েছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু তাদের বেঁধে দেওয়া এ রেট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মানছে না। বর্তমানে আমদানি পেমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রতি ডলারের জন্য গুনতে হচ্ছে প্রায় ৯৭ টাকা। নতুন এলসি খুলতেও বেশি রেট দাবি করছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের কাছেও এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। তবে বাজারের অস্থিরতা ঠেকাতেই আবার ডলারের রেট বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া যখনই প্রয়োজন হচ্ছে তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাজারে ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে। ’

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। রেমিট্যান্স বাড়ানোর সব অস্ত্রই ব্যবহারের সময় হয়েছে। এটি দ্রুত করতে না পারলে প্রভাব আরো বাড়বে। কার্ব মার্কেটের সঙ্গে ব্যাংকের মধ্যে দামের পার্থক্য বেশি বাড়লে হুন্ডিও বাড়বে। হুন্ডি কমাতে এই গ্যাপ কমাতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ’

কিছু উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ঋণপত্র খোলার সময় নগদ জমার হার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ দেশে যে রিজার্ভ রয়েছে তা দিয়ে ভবিষ্যতের ছয় মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করা কঠিন হয়ে যাবে। পাশাপাশি ডলারের দাম বাড়ায় এবং রিজার্ভে টান পড়ায় এখন বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ঋণপত্র খোলার সময় নগদ জমার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলারের ব্যয় কমাতে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, এই মুহূর্তে আমদানির লাগাম টানা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই অবস্থায় মুদ্রার আরো অবমূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এভাবে ১০ থেকে ২০ পয়সা করে না বাড়িয়ে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক খুব ধীরে ধীরে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এটা আরো সময়োপযোগী হলে দেশের জন্য ভালো হতো।

বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতিকে ‘উভয় সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এত বেশি হস্তক্ষেপ করে, তাতে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের স্বচ্ছতা হারিয়ে গেছে। একই দিনে একই ডলারের একেক জায়গায় একেক দাম। এখানে ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আগে বৈদেশিক বাজারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে।

জাহিদ হোসেন বলেন, যে হারে ডলারের দাম বেড়ে যাচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে। এরই মধ্যে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। মূল্যস্ফীতি আরো বাড়লে, নিম্নবিত্ত মানুষ অনেক সমস্যায় পড়বে।

এই অর্থনীতিবিদের পরামর্শ, ডলারের দাম ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে ডলার বিক্রি করতে হবে। আর যেহেতু আমদানি খরচের তুলনায় রপ্তানি আয় বা রেমিট্যান্স বাড়ছে না, তাই ডলার বিক্রি করতে হলে চাপ পড়বে আমাদের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে। আর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে গেলে আমাদের রিজার্ভ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে ডলার বিক্রি করে টাকার মান ধরে রাখার চেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

 



সাতদিনের সেরা