kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

সিলেটে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত, কষ্টে পানিবন্দি মানুষ

সিলেট অফিস   

১৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সিলেটে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত, কষ্টে পানিবন্দি মানুষ

উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়েছে। এতে মানুষের পাশাপাশি পশুপাখিও দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। গতকাল পানি থেকে গা বাঁচাতে বাঁশের বেড়ায় আশ্রয় নেয় একটি বিড়াল। ছবি : কালের কণ্ঠ

এক দিনের ব্যবধানে গতকাল সোমবার সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটের পর কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলার সব কটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ।

তিনটি স্থানে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে চলা সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী আগামী ২৩ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। আগামী শুক্রবার রাত থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি আরো জটিল করছে। পাহাড়ি ঢলে পানি বাড়ছে।

জৈন্তাপুর উপজেলায় আগের দিন পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও গতকাল ভোর থেকে পানি বাড়তে থাকে। সকাল ১১টার দিকে হঠাৎ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দর হাটি গ্রামের বাসিন্দা আলতাফুর রহমান বলেন, ‘বাড়িতে আজকে আমি একা। পানি থেকে বাঁচাতে সব মালপত্র টেনে টেনে ওপরে তুলে রাখতে হচ্ছে। সারা দিন ধরে এই এক কাজই করছি। ’ একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী বাড়ির মো. হানিফ ও হাফিজ আসাদের। তাঁরা বলেন, ১০ দিন ধরে পানি ওঠানামার মধ্যে আছে। দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁদের। তাদের দাবি, ১০ বছরের মধ্যে এমন বন্যা তাঁরা দেখেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জৈন্তাপুর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় সব কটি ইউনিয়ন জলমগ্ন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত হয়েছে ১ নম্বর নিজপাট ইউনিয়ন ও জৈন্তাপুর ইউনিয়ন। দুই ইউনিয়নের সব গ্রামে  পানি। চারিকাটা, দরবস্ত ও ফতেহপুর ইউনিয়নের অবস্থাও একই রকম। এসব ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ডুবে যাওয়ায় নৌকার পাশাপাশি কলাগাছের ভেলায় লোকজন যাতায়াত করছে।

জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-বশিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্যাকবলিত ছয়টি ইউনিয়নে এ পর্যন্ত সাড়ে ১৬ টন খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। আরো ১২ টন খাদ্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ১৩৪টি গ্রামের অন্তত ১২০টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি। উপজেলায় ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে মাইকিং করা হচ্ছে।

ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, ‘দুই দিন হয় বন্যার পানি ঘরের ভেতর। মা-বাবা, ভাই-বোনদের এখন ঘরে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কোলের শিশুকে কোথাও রাখা যাচ্ছে না, আতঙ্ক কাজ করছে। রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। ঘুমানোরও সুযোগ নেই। ’

উপজেলার তেলিখাল গ্রামের ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘তেলিখাল বাজারে পানি বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে দিন পার করছেন। গ্রামের বেশির ভাগ ঘরে পানি। আমার দুই হেক্টরসহ গ্রামের কৃষকদের প্রচুর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। ’

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুসিকান্ত হাজং বলেন, ‘আমার ছয়টি ইউনিয়নই কমবেশি আক্রান্ত। আমাদের জানা মতে এ পর্যন্ত উপজেলার ১৬৫টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাকবলিতদের জন্য ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা। ’

গোয়াইনঘাট উপজেলার ২৬৪টি গ্রামের অর্ধেকের বেশি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। ডোবাড়ি এলাকার বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘পরিবার নিয়ে পানির মধ্যে কত দিন বসবাস করা যায়। খাওয়া, ঘুমের তো ঠিক নাই-ই, বাচ্চা আর গবাদি পশু নিয়ে বাড়তি টেনশন। ’

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও কেউ আসতে চাচ্ছেন না এখনো।

একইভাবে কানাইঘাট বাজারে পানি থইথই করছে। পৌর শহরসহ আশপাশের এলাকার বাড়িঘরেও নতুন করে পানি ঢুকেছে। সুরমা ডাইকের (বাঁধ) গৌরীপুর-কুওরঘড়ি এলাকায় বেশ কয়েকটি ভাঙনকবলিত পয়েন্ট দিয়ে তীব্রগতিতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে মানুষ।

সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জে পাহাড়ি ঢল ও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে বারঠাকুরী, বীরশ্রী, কাজলসার, জকিগঞ্জ, সুলতানপুর ও মানিকপুর ইউনিয়নের একাধিক স্থানে সুরমা ও কুশিয়ারার ডাইক (বাঁধ) ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। পৌরসভা এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস ও বাসাবাড়ি তলিয়ে গেছে।

এদিকে বেড়িবাঁধ ভাঙার ঝুঁকি নিয়ে বীরশ্রী ইউনিয়নের সুপ্রাকান্দি ও বড় চালিয়া গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বৃষ্টি কমায় কয়েকটি এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে। সিলেট সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। একই রকম পরিস্থিতি সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকারও।

 



সাতদিনের সেরা