kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

ব্রিটিশ সংস্থা এনসিএর অনুসন্ধান

এনআইডি প্রকল্পের কাজ নিয়ে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এনআইডি প্রকল্পের কাজ নিয়ে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি

বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির যে অভিযোগ তুলেছিল তার সত্যতা পায়নি ব্রিটিশ সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। ছয় বছরের অনুসন্ধান শেষে তারা এই তথ্য জানিয়েছে।

২০০৭ সালে বাংলাদেশি সফটওয়্যার কম্পানি টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেড জাতীয়ভাবে আট কোটি নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে। জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার।

বিজ্ঞাপন

এই তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। এ কাজটি প্রকল্প সহযোগী ডিএফআইডি, ইউএনডিপি ও ইইউর প্রশংসাও পায়।

২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক এনআইডি থেকে স্মার্ট কার্ডে উন্নীত করার প্রকল্পে খরচ জোগাতে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে নির্বাচন কমিশন এ কাজে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে। এসংক্রান্ত বিবরণী এবং সেই সঙ্গে দরপত্রের ফলাফল পর্যবেক্ষণ ও অনুমোদন দেয় বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পটি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক কাজের অগ্রগতি এবং কলাকৌশলগত দিকগুলো নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন মূল্য প্রস্তাব করে কাজ পায় ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান ওবারথুর টেকনোলজিস। ওবারথুর টেকনোলজিস ডেডিকেটেড সফটওয়্যার সরবরাহের জন্যে তাদের সাবঠিকাদার হিসেবে টাইগার আইটিকে বেছে নেয়। এ ছাড়া আরেকটি স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠান সিএসএল তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পায়।

নথিপত্রে দেখা যায়, ওই প্রকল্পে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ছিল স্যাফরান মরফোর নাম। এ প্রতিষ্ঠান পরে ওবারথুরের সঙ্গে একীভূত হয় এবং পরে তারা আইডিইএমআইএ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।  

বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন আইডি সিস্টেমের নকশা প্রণয়নে উল্লেখযোগ্যভাবে কম মূল্যে আইডি কার্ড তৈরি এবং খরচ বাঁচাতে টাইগার আইটির অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের স্মার্ট আইডি কার্ড এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে কম দামের পলিকার্বোনেট স্মার্ট আইডি। বাংলাদেশে একটি স্মার্ট আইডি কার্ডের দাম পড়েছে প্রায় ১.২৩ মার্কিন ডলার (কাস্টম, ভ্যাট এবং অন্যান্য ট্যাক্স ছাড়া নাগরিককে প্রদানের জন্য পুরো প্রস্তুত অবস্থায়)। পাকিস্তানে প্রতিটি স্মার্ট কার্ডের দাম ১.৬৯ মার্কিন ডলার, পেরুতে ১.৫২ ডলার ও গুয়াতেমালায় ১.৬০ ডলার।  

এ হিসাবের ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশ প্রতিটি কার্ডে কমপক্ষে ৭০ শতাংশ খরচ কম হয়েছে। ওই সময় এ কাজে আট কোটি নাগরিককে স্মার্ট আইডি প্রদানের আনুমানিক বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ১০ কোটি কার্ডের কার্যাদেশ দেয়।

সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্পটি পাওয়ার পর এবং এনআইডি সিস্টেমে টাইগার আইটির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আইডিইএমআইএ কৌশলে টাইগার আইটির ভূমিকা হ্রাস করে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে প্রকল্প থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেয়। এ কাজ সম্পাদনের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আইডিইএমআইএ থেকে টাইগার আইটির সব ধরনের পাওনা আটকে দেওয়া হয়। টাইগার আইটি তাদের কাজের জন্য ন্যায়সংগতভাবে প্রাপ্য পারিশ্রমিক আদায়ে বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা শেষে হাইকোর্টে মামলা করে। হাইকোর্টে ব্যর্থ হয়ে ওবারথুর তথা আইডিইএমআইএ বিষয়টিকে যুক্তরাজ্যের আদালতে নিয়ে যায়। সেখানকার আদালতে টাইগার আইটির মামলা আটকে দিতে তাৎক্ষণিক ইনজাংশন জারির অনুরোধ জানায় তারা। ২০১৯ সালে টাইগার আইটি যুক্তরাজ্যের আদালতে মামলা জিতে যায়। তার পরও আইডিইএমআইএর প্রকল্প থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

আইডিইএমআইএ তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি সিএসএলকেও সরিয়ে দেয়। আইডিইএমআইএ কাজটি তাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইফুর রহমানের মাধ্যমে করেছিল। সাইফুর তৎকালীন বিএনপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শোকরানার ভাই। বগুড়ার এই নেতা তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে তখন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। সাবঠিকাদার এবং স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে এই বিবাদ চলাকালে আইডিইএমআইএ এবং তাদের প্রকল্প বিশ্বব্যাংকের অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে।

নথিপত্রে দেখা যায়, এই দরপত্র ওবারথুরের পক্ষে যাওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মরফো (দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা) বিইসিতে ওবারথুরের বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করে। সেখানে পরস্পর সাংঘর্ষিক দুটি বিষয়ের অবতারণা ঘটে। একটি ওবারথুরের প্রস্তাবিত মূল্য ‘অযৌক্তিকভাবে কম’ এবং অন্যটি প্রকল্পের সম্ভাব্য দুর্নীতির অনুসন্ধানের অনুরোধ। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটি নিরীক্ষা করে। নিরীক্ষা চলাকালীন ওবারথুর ‘প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে যেতে এবং কাজ পেতে সাবঠিকাদারকে অনৈতিক অর্থ প্রদান করার’ কথা জানায়। একই সময়ে আইডিইএমআইএ বিশ্বব্যাংককে তথ্য দেয় যে প্রতিযোগিতা হ্রাস করে কাজটি পেতে আইডিইএমআইএকে সহায়তা করেছিল টাইগার আইটি। বিশ্বব্যাংক তাদের অভিযোগে জানায়, বাড়তি দুই কোটি কার্ডের লভ্যাংশের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ দুর্নীতি করা হয়েছিল।

কিন্তু যুক্তরাজ্যের পূর্ণ তদন্তের ফলাফল পাওয়ার আগেই ওবারথুরের নিজস্ব বিবৃতির ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক টাইগার আইটির ওপর ১০ বছর ছয় মাসের জন্য জাতীয় এবং বিশ্বব্যাপী তাদের কোনো ধরনের প্রকল্পে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

সূত্র জানায়, অবশেষে ছয় বছরের তদন্ত শেষে যুক্তরাজ্য এই বিষয়ে ‘নো ফারদার ইস্যু (এনএফএ)’ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের এনআইডি প্রকল্পে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ না পাওয়ায় মামলাটি ‘এখানেই শেষ করার’ সিদ্ধান্ত নেয়। এ তদন্তে যুক্তরাজ্য কাগজপত্র ও ইলেকট্রনিক নথিপত্র, ই-মেইল সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নিয়েছে।

বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের আগে বা পরে আইডিইএমআইএ টাইগার আইটি এবং সিএসএলকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে টাইগার আইটির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আইডিইএমআইএ বলেছে, ‘এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। ’



সাতদিনের সেরা