kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

সাক্ষাৎকার

উন্নয়নকাজের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সড়কে

১৩ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উন্নয়নকাজের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সড়কে

শামছুল হক

যানজটে রাজধানী অচল হওয়ার চিত্র এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সড়ক না বাড়লেও গাড়ি বেড়ে কমেছে গতি। গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা, ভঙ্গুর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি, সমন্বয়হীন উন্নয়ন, অপ্রতুল সড়ক, বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা না থাকা, ছোট যান মোটরসাইকেলের অতিরিক্ত নিবন্ধন রাজধানীতে যানজটের প্রধান কারণ। যানজট নিয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক।

বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজিব ঘোষ

 

কালের কণ্ঠ : যানজটের এই অসহ্য বাস্তবতা আমরা কি মেনে নিয়েছি?

শামছুল হক : আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অহেতুক যানজটকে মেনে নেয়নি। জীবনের সুন্দর সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে রাস্তায়, এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনার পর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল তারা। শুধু দুর্ঘটনা কিংবা যানজট নয়, তারা এই বিশৃঙ্খলা মেনে নেয়নি।  

 

কালের কণ্ঠ : যানজটের পেছনে সড়ক কতটা দায়ী? 

শামছুল হক : জোগান ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা যে ভিত্তির ওপর তৈরি হয়েছে, এরশাদ সরকারের পর সেই ভিত্তিতে আর কেউ হাত দেয়নি। এরশাদ সেই সময়ে বেড়িবাঁধ, রোকেয়া সরণি, বিজয় সরণি, মুক্তি সরণি, প্রগতি সরণি—এই প্রাথমিক সড়কগুলো যুক্ত করেছেন। এরপর আর কেউ বিকল্প সড়ক তৈরিতে কাজ করেনি। রাজধানী উন্নয়নের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরাও চাহিদার সঙ্গে জোগান বাড়ানোয় নজর দেননি।   

 

কালের কণ্ঠ : সড়কের আকার কি ছোট হয়ে আসছে?

শামছুল হক : সড়কের যে প্রশস্ততা ছিল, দিনে দিনে এর কার্যক্ষমতা কমে আসছে। সড়কের অপারেশনাল ক্ষমতাও কমছে। গবেষণা বলছে, ঢাকার সড়কের মাত্র আড়াই শতাংশ বাস চলাচলের জন্য উপযুক্ত।     

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে কি ব্যবস্থাপকের দায় দেখছেন?

শামছুল হক : যাঁরা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন, তাঁরা আরেক অন্ধ। সড়কের ধারণক্ষমতা না জেনে, ছোট ছোট গাড়ি নীতিমালার আওতায় না এনে ক্রমাগত নিবন্ধন দিচ্ছেন। বন্যার পানির মতো সড়কে ছোট গাড়ি বাড়ছে। নিবন্ধনের খরচ কমিয়ে মোটরসাইকেলকে আরো উৎসাহিত করা হচ্ছে। ছোট গাড়ি কিনতে সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে। তার মানে, আমি সড়কের সক্ষমতা তো বাড়ালামই না, ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণটুকুও করলাম না। ছোট গাড়ির জন্য বড় গাড়ি নিবন্ধন করছে না। কারণ যানজটে বড় গাড়ি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

কালের কণ্ঠ : গণপরিবহন...

শামছুল হক : আমি এই দিকেই আসছিলাম। গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খল করতে পারলে এর ধারণক্ষমতা আরো অনেক বাড়তে পারত।

 

কালের কণ্ঠ : গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ আছে?

শামছুল হক : অবশ্যই আছে। এতে কিছু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে সরকার তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিলে তাঁরা মেনে নেবেন। যানজটের কারণে বর্তমানে কমছে একটি বাসের ট্রিপের সংখ্যা। মালিকরা অনেক চাপে আছেন। পাঁচ-ছয়টা কম্পানির অধীনে রাজধানীর গণপরিবহন চালানো গেলে উন্নত মানের গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রচলন হবে।

 

কালের কণ্ঠ : সে ক্ষেত্রে তো প্রশ্ন উঠছে। নগর পরিবহনের পরীক্ষামূলক চলাচল তো সফল হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে কম্পানিভিত্তিক বাস চালানোর উদ্যোগে উৎসাহ তৈরি হবে?

শামছুল হক : এটা অবশ্য ঠিক। আমরা বারবার জানান দিচ্ছি, আমরা আদর্শ বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি করার যোগ্যতা রাখি না। আমরা একই করিডরে সব বাস চালাচ্ছি। অথচ ফ্র্যাঞ্চাইজ মানেই হচ্ছে ওই করিডরে অন্য কোনো কম্পানির বাস চলবে না। বাসের রুটে লেগুনার (হিউম্যান হলার) চলাচলও বাসের জন্য ক্ষতিকর।

 

কালের কণ্ঠ : অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজের জন্য সড়ক ছোট হয়ে আসছে। যানজট থেকে মুক্তির জন্য উন্নয়নকাজকে কি সমন্বিত করা যেত? 

শামছুল হক : অবশ্যই করা যেত। সব দেশেই উন্নয়ন হয়। কিন্তু আমাদের সমস্যাটা ভিন্ন জায়গায়। যাঁরা ফিজিবিলিটি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করে গেছেন, তাঁরা দুর্বল ফিজিবিলিটি করেছেন। এর ফলে সময়ের কাজ সময়ে হয়নি। এতে জটিলতা বাড়ছে। এভাবে সব প্রকল্পের একই অবস্থা। যাঁরা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আছেন, তাঁদের বলতে হবে, তাঁদের সক্ষমতা নেই। উন্নয়নকাজের নেতিবাচক প্রভাব রাজধানীর সড়কে পড়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : উড়ালসেতু হলে রাজধানী যানজটমুক্ত হবে—এমন একটা ধারণা ছিল। সেটা হয়নি। মেট্রো রেল, বিআরটি-৩, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কি যানজট থেকে মুক্তি দেবে?

শামছুল হক : মেট্রো রেলের করিডরে যারা থাকবে তারা বিকল্প পাবে। মেট্রো রেল তাদের জন্য আশীর্বাদ হবে। তবে যারা মেট্রো রেলের কাছাকাছি থাকবে না, তারা অন্য পরিবহনে উঠে মেট্রো রেলে গিয়ে নেমে ফের আরেক পরিবহনে উঠতে চাইবে না। এতে দ্রুততার জন্য মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর বিআরটি এমন একটা প্রকল্প, আমরা একটা জাতীয় মহাসড়কের মেরুদণ্ড হারালাম বলা যায়।

 

কালের কণ্ঠ : দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থার জন্য যানজট হচ্ছে, নাকি যানজটের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে?

শামছুল হক : পথচারীদের অহেতুক দোষ দেওয়া হয়। পৃথিবীর কোথাও রাস্তার মোড়ে ফুট ওভারব্রিজ বানানো হয় না। বিজ্ঞান বলে, সিগন্যালটা যদি কার্যকর হয় যানজট কমে আসবে। পুলিশ হাত দিয়ে সিগন্যাল দিলে মানুষ বুঝতে পারে না কখন কোন লেনের গাড়ি ছাড়া হবে। লাইট দিয়ে সিগন্যাল সচল রাখলে মানুষ বুঝতে পারত তার সিরিয়াল কখন আসবে। তাহলেই গাড়িগুলো স্বাভাবিকভাবে চলতে পারত।  

 

 



সাতদিনের সেরা