kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

অভিমত

শব্দদূষণ রোধে সচেতন হতে হবে সবাইকে

আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার

২৯ মার্চ, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শব্দদূষণ রোধে সচেতন হতে হবে সবাইকে

আহমদ কামরুজ্জমান

শব্দদূষণে বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের দুটি শহর। একটি আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা এবং অন্যটি অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মহানগরী রাজশাহী।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘ফ্রন্টিয়ারস ২০২২ : নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন মতে শব্দদূষণে বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর প্রথম স্থানে রয়েছে ঢাকা।

বিজ্ঞাপন

ভারতের উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদ আছে দ্বিতীয় স্থানে আর তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ। এরপর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে আমাদের আরেক শহর রাজশাহী।

ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকার জন্য অনুমোদনযোগ্য শব্দের মাত্রা ৫৫ ডিবি (ডেসিবেল) এবং বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডিবি। সেখানে ঢাকায় শব্দের মাত্রা ১১৯ ডিবি এবং রাজশাহীতে ১০৩ ডিবি পাওয়া গেছে।

কয়েক বছর ধরে ঢাকা শহরের প্রায় সব ব্যস্ত এলাকায়ই শব্দ গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। ঢাকা ছাড়াও অন্যান্য জেলা শহরের শব্দদূষণের উৎস বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে শব্দের উৎসগুলো স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত যানবাহন চলাচলের শব্দ (হর্ন, ইঞ্জিন, চাকার ঘর্ষণ ও কম্পনের শব্দ), রেলগাড়ির শব্দ, বিমান ওঠানামার শব্দ, নির্মাণকাজ যেমন—ইট ও পাথর ভাঙা মেশিন ও টাইলস কাটার মেশিন থেকে শব্দ, ভবন ভাঙার শব্দ, কলকারখানার শব্দ, জেনারেটরের শব্দ, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের মাইকিংসহ ইত্যাদি উৎস থেকে শব্দ উৎপন্ন হয়। শহর এলাকায় শব্দদূষণের প্রভাব গ্রামাঞ্চল থেকে তুলনামূলকভাবে অনেকখানি বেশি। শুধু ঘরের বাইরে, রাস্তায়, কর্মস্থলে নয়, শব্দদূষণ ঘরের ভেতর আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন—ফুড ব্লেন্ডার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, প্রেসার কুকার ইত্যাদি থেকেও উচ্চ শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে।

শব্দদূষণের ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্নিত হওয়াসহ নানা রকম সমস্যা দেখা যায়। স্বল্পমেয়াদি শব্দদূষণ মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং আমরা সবাই বুঝি যে মানসিক চাপ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণ শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। শ্রবণশক্তি হ্রাসের ফলে বিরক্তি, নেতিবাচকতা, রাগ, ক্লান্তি, চাপা উত্তেজনা, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা বাড়ে এবং স্মৃতিশক্তি ও নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে উচ্চ শব্দ শিশু, গর্ভবতী মা, হৃদরোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শব্দদূষণের ফলে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আকস্মিক উচ্চ শব্দ মানবদেহের রক্তচাপ ও হৃত্কম্পন বাড়িয়ে দেয়, মাংসপেশির সংকোচন করে, পরিপাকে বিঘ্ন ঘটায়, শিরা ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) ১০ সদস্যের একটি গবেষকদল ২০২২ সালের মার্চ মাসে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ব্যবহারের ভিত্তিতে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে। গবেষণার অংশ হিসেবে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ১৭টি হাসপাতালের সামনে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৭টি হাসপাতালের সামনের রাস্তায় শব্দদূষণের মাত্রা সর্বনিম্ন ৬৯.৭ ডিবি এবং সর্বোচ্চ ৮৯.৯ ডিবি পর্যন্ত পাওয়া যায়, যেখানে নীরব এলাকা হিসেবে এসব এলাকায় শব্দের আদর্শ মান থাকা উচিত ছিল ৫০ ডিবি।

আমেরিকান স্পিস অ্যান্ড হিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (আশা) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ৭১ থেকে ৯০ ডিবি মাত্রার শব্দ তীব্রতর শব্দদূষণ হিসেবে পরিগণিত হয়। উল্লিখিত ১৭টি স্থানের মধ্যে শব্দের মাত্রা গড়ে ৮১.৭ ডিবি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৯টি স্থানেই শব্দের মাত্রা ছিল ৮০ ডিবির ওপরে।  

ইউএসএআইডি এবং এফসিডিওর অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় ক্যাপস ঢাকা শহরের ১০টি স্থানের শব্দ মানের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে। ওই গবেষণায় গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর যথাক্রমে আহসান মঞ্জিল, আব্দুল্লাহপুর, মতিঝিল, শাহবাগ, ধানমণ্ডি-৩২, সংসদ এলাকা, তেজগাঁও, আগারগাঁও, মিরপুর-১০ ও গুলশান-২-এর শব্দ মান সংগ্রহ করা হয়। শব্দদূষণ বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী ভূমির ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ঢাকা শহরকে পাঁচটি জোনের জন্য বিভক্ত করা হয়েছে এবং বিধিমালা অনুযায়ী পাঁচটি জোনের জন্য দিনে ও রাতের বেলায় পৃথক আদর্শ মান নির্ধারিত রয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে নীরব এলাকার জন্য শব্দের মাত্রা সপ্তাহের সাত দিনের কখনো আদর্শ মান ৫০ ডিবি ছিল না।

গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকাগুলো ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে, যার ফলে শব্দদূষণের পরিমাণ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকাগুলোকে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরিত না করা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরের সমন্ব্বয় সাধন করতে হবে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-এর শতভাগ বাস্তবায়ন, যানবাহনে ব্যবহৃত হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ করা, হর্ন বাজানোর শাস্তি বৃদ্ধি ও চালকদের শব্দসচেতনতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান করা শব্দদূষণ কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের আওতায় পরিবেশ ক্যাডার ও পরিবেশ পুলিশ নিয়োগ দিতে হবে। যানবাহনের চাপ কমানোর জন্য, গণপরিবহনব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ছাড়া জেনারেটর ও সব ধরনের শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতির মান ও মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। আমরা যারা শব্দদূষণ সৃষ্টি করছি তারাও এর ক্ষতির শিকার হই। কাজেই সরকার গৃহীত কর্মসূচির পাশাপাশি শব্দদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করার জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সরকার বা কোনো একটি সংস্থার পক্ষে এককভাবে এ সমস্যার সমাধান কঠিন। তাই সবাই মিলে শব্দদূষণ প্রতিরোধে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ; ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন

(বাপা) ও পরিচালক, স্টামফোর্ড [email protected]

 



সাতদিনের সেরা