kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা রোহিঙ্গা সংকট

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা রোহিঙ্গা সংকট

নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অঞ্চলের লক্ষ্যে যে অবাধ ও উন্মুক্ত ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের’ স্বপ্ন দেখে জাপান, তা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা সংকট।

ঢাকায় জাপান দূতাবাস গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে জাপান কাজ করবে এবং বাংলাদেশের পাশে থাকবে। এই সংকটের টেকসই সমাধান শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অঞ্চলের লক্ষ্যে অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক বাস্তবায়নের জন্যও প্রয়োজন।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির তিনটি ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এগুলো হলো : আইনের শাসন, ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি উৎসাহিতকরণ ও প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক অংশীদারি ও যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকার।

গত মার্চ মাসে লন্ডনে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের এক প্রকাশনায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, টোঙ্গা ও জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে ভাবনার তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মূল বিষয় হলো অর্থনৈতিক। এর উদ্দেশ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের বিকাশ ঘটানো, যাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি চীনের প্রভাব কমানো যায়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনসহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন। এখন জাপানও এর গুরুত্ব অনুধাবন করছে এবং নিজের কৌশল বাস্তবায়নে একে বাধা হিসেবে দেখছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার থেকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে জাপান। দেশটির সরকার গতকাল ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৭ কোটি ২১ লাখ টাকা) সহায়তা ঘোষণা করেছে। গত ৯ অক্টোবর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের দেখভালের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই এমওইউ স্বাক্ষরের পরও সেখানে দাতা দেশগুলোর অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এর অন্যতম কারণ হলো ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠীর আপত্তি। তবে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারের মতো ভাসানচরেও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত হতে দাতা দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। এর মধ্যে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের জন্য অর্থ সহায়তা ঘোষণার মাধ্যমে জাপান কার্যত এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হলো।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাদের জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না। এ কারণে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিও মিয়ানমার ব্যবহার করে না। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তি ও আলোচনায় রোহিঙ্গাদের উল্লেখ করা হয় ‘রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী’ হিসেবে। মিয়ানমারের আপত্তির কারণে অনেক দেশ ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি বিবৃতি, বিজ্ঞপ্তি ও আলোচনায় ব্যবহার না করলেও এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।

ঢাকায় জাপান দূতাবাসের গতকালের বিজ্ঞপ্তিতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। জাপান দূতাবাস জানায়, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জরুরি মানবিক সহায়তা হিসেবে ২০ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান সরকার। এর মধ্যে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) মাধ্যমে ১০ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়া হবে। আর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডাব্লিউএফপি) দেওয়া হবে ১০ লাখ মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, ‘এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিবেদিত সেবার আমি প্রশংসা করি। ’

জাপানের রাষ্ট্রদূত বলেন, গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ভাসানচরে সহায়তার মৌলিক কাঠামো। এর আওতায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নির্বিঘ্ন ও সুদৃঢ় কার্যক্রমকে জাপান সমর্থন করে।

রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, ওই দ্বীপে জাতিসংঘ ক্রমবর্ধমান মানবিক ও সুরক্ষা চাহিদা পূরণ করবে বলে জাপান আশা করে। জাপানের আরো প্রত্যাশা, তাদের এই সহায়তা ভাসানচরে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সেবা কার্যক্রম জোরদার করবে।

জাপান দূতাবাস জানায়, ভাসানচরের বাইরে রোহিঙ্গাদের বড় অংশ কক্সবাজারে। সেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহায়তা অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জাপান ভাসানচর ও কক্সবাজার—দুই স্থানেই রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওগুলোর প্রতি সাহায্য অব্যাহত রাখবে।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। তারা মূলত মিয়ানমার সীমান্তের কাছে কক্সবাজারে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। কক্সবাজার থেকে এ পর্যন্ত ৯ দফায় প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে। কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা আছে সরকারের। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

 

 



সাতদিনের সেরা