kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

করোনার দুই বছর সংবিধান রক্ষার অধিবেশন

নিখিল ভদ্র   

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনার দুই বছর সংবিধান রক্ষার অধিবেশন

একাদশ জাতীয় সংসদে গত তিন বছরে ১৬টি অধিবেশন বসেছে। এই তিন বছরের মধ্যে দুই বছরই গেছে করোনায়। এই সময়ের অধিবেশনগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত। সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম হয়ে পড়েছে গতিহীন।

বিজ্ঞাপন

অনেক কমিটি বৈঠকের বিষয়ে সাংবিধানিক নির্দেশনাও মানেনি। এ অবস্থায় আজ তিন বছর পার করছে একাদশ জাতীয় সংসদ।   

এই সংসদের যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি।  

করোনাসহ নানা অসুস্থতায় গত তিন বছরে ২২ জন সংসদ সদস্য মারা গেছেন। এখন অর্ধশতাধিক মন্ত্রী-এমপিসহ সংসদের দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত আছেন। একজন সংসদ সদস্য দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে বিদেশের কারাগারে আছেন।

সংসদ সচিবালয় থেকে জানা গেছে, চলতি সংসদের ১৬টি অধিবেশনের মধ্যে গত বছরের ছয়টি অধিবেশনের মেয়াদ ছিল মাত্র ৪৮ কার্যদিবস। এর মধ্যে বাজেট অধিবেশনও ছিল। গত বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে সংসদে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আগের বছরের পাঁচটি অধিবেশনের মেয়াদ ছিল ৫৩ কার্যদিবস। আর এই সংসদের প্রথম বছরের পাঁচটি অধিবেশন চলেছিল ১০৪ কার্যদিবস।

করোনা পরিস্থিতিতে স্থবির ছিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো। সর্বশেষ অধিবেশনটিও করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ২৭ জানুয়ারি শেষ করা হয়েছে। তবে এই সময়ে ৩২টি বিল পাস করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচন কমিশন গঠন আইন।

চলতি সংসদের তিন বছর পূর্তির বিষয়ে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাকালেও সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন নিয়মিত বসেছে। অধিবেশনের মেয়াদ কম হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ আলোচনা সংসদীয় কার্যক্রমকে অর্থবহ করে তুলেছে।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা হলেও সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ যতটুকু কার্যকর থাকবে, দেশে গণতন্ত্র ততটুকুই ফলপ্রসূ হবে। আমাদের গণতন্ত্র ততটা সুখকর নয়। তাই সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা ও সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হবে। ’

একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১০ দিনেই ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এবং অন্যান্য বিষয়ে ১১টিসহ মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি গঠন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর নিয়ম মেনেই কমিটিগুলোর বৈঠক শুরু হয়। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে কমিটিগুলো গতি হারিয়ে ফেলেছে। মূলত সংসদ সদস্যদের কম আগ্রহই এর কারণ বলে বলা হচ্ছে। আর করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর কমিটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। গত বছরের মে, জুন, জুলাই—তিন মাস কমিটির বৈঠক হয়নি।

বিশ্লেষকরা এবং সংসদের বিরোধী দলের সদস্যরা বলছেন, করোনাকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল। কিন্তু সে রকম সক্রিয়তা দেখা যায়নি। স্বাস্থ্য খাতে অর্থের অপচয়সহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তা নিয়ে কমিটিতে আলোচনা হয়নি।

এই সময়ে করোনা সংকটের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও বন্যা হলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি নিশ্চুপই ছিল। পেঁয়াজ, আলু, চালসহ নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়লেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কোনো হেলদোল ছিল না। আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনায় ভূমিকা দেখা যায়নি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির। বস্ত্র ও পাট এবং শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এই সময়ে কোনো বৈঠক করেনি।

একমাত্র নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি বিধি অনুযায়ী বৈঠকের সংখ্যা পূর্ণ করে। এই কমিটি গত তিন বছরে সর্বোচ্চ ৪১টি বৈঠক করেছে। আর সরকারি হিসাব কমিটি সর্বোচ্চসংখ্যক ৬৩টি বৈঠক করেছে। এই কমিটির একই দিনে তিনটি বৈঠকের বিষয়টি আলোচিত ছিল। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক আটটি কমিটি মোটামুটি সক্রিয় ছিল। বাকি ৩১টি কমিটির বৈঠকের সংখ্যা ছিল শূন্য থেকে ৬-এর মধ্যে। বৈঠকে সদস্যদের উপস্থিতিতেও আগ্রহের অভাব ছিল। কয়েকটি বৈঠকে কোরাম সংকট দেখা দেয় বলে সংসদ সচিবালয়ের তথ্যে জানা যায়।

আলোচিত সংসদ সদস্য পাপুল

গত বছরে সংসদের সব থেকে আলোচিত ঘটনা ছিল কুয়েতের আদালতে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মোহাম্মদ কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সাজার ঘটনা। মানব ও অর্থপাচারের দায়ে কুয়েতের আদালতের রায়ে সাজা হওয়ায় তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হয়।

সংসদ সচিবালয় প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়, ‘কুয়েতের ফৌজদারি আদালতে ঘোষিত রায়ে নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ড হওয়ায় লক্ষ্মীপুর-২ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য নন। ’

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংসদ সদস্যের বিদেশে আটক ও ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর এমপি পদ হারানোর ঘটনা এটিই প্রথম।

 



সাতদিনের সেরা