kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

আপত্তির মুখে সংসদে ইসি গঠন বিল পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আপত্তির মুখে সংসদে ইসি গঠন বিল পাস

বিএনপির সংসদ সদস্যদের প্রবল আপত্তির মুখে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে বহুল আলোচিত ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’।

বিলে অনুসন্ধান কমিটিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুই বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী রাখার বিধান রাখা হয়েছে। অনুসন্ধান কমিটির কাজ ১০ দিনের পরিবর্তে ১৫ দিনে শেষ করতে বলা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি সংসদে পাসের প্রস্তাব করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক।

বিজ্ঞাপন

তিন ঘণ্টা আলোচনা শেষে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

এর আগে বিলের ওপর দেওয়া জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলোর নিষ্পত্তি করেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্যরা বিলের ওপর এসব প্রস্তাব দেন।

অধিবেশনে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন অনুসন্ধান কমিটিতে দুজন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী রাখার প্রস্তাব দেন। আইনমন্ত্রী এই প্রস্তাব গ্রহণে সায় দিলে, সংসদ তা ভোটে গ্রহণ করে।

বিলে বলা ছিল, রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করবেন, যার সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক। এখন রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী রাখার বিধান যুক্ত করা হলো।

বিলে অনুসন্ধান কমিটির কাজ ১০ কার্যদিবস করার বিধান রাখা হয়েছিল। সেটি এখন ১৫ কার্যদিবস করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমামের এসংক্রান্ত সংশোধনী সংসদ গ্রহণ করে। ফখরুল ইমামের মোট সাতটি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান, মুজিবুল হক চুন্নু ও পীর ফজলুর রহমান এবং বিএনপির রুমিন ফারহানার তিনটি করে সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ এবং জাসদের হাসানুল হক ইনুর একটি করে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

বিলের ওপর বিভিন্ন শব্দ ও ছোটখাটো কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সংসদ সদস্যদের ৬৪টি সংশোধনী প্রস্তাবের ২২টি আইনমন্ত্রী গ্রহণ করেন, যা সংসদের ভোটে পাস হয়।

বিলটি পাসের সময় জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, খসড়া আইনটি তড়িঘড়ি করে আনা হয়েছে।

সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ শেষে আইনমন্ত্রী বলেন, এই বিলে যত সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছে, এর আগে কখনো এত বেশি সংশোধনী কোনো বিলে গ্রহণ করা হয়নি।

সংসদে পাস হওয়া বিলটি সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো হবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। রাষ্ট্রপতি সই করার পর গেজেট আকারে প্রকাশ হলেই প্রথমবারের মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে আইন পাবে বাংলাদেশ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা যা বললেন

বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা হারুনুর রশিদ আইনটি পাসকে সরকারের কূটকৌশল আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সংবিধানে বলা আছে, নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব ইসিকে সহায়তা করা। কিন্তু না করলে কী হবে, তা বলা নেই। এসব নিয়ে একটি পুরো আইন হওয়া উচিত।

বিএনপির আরেক সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে একটি ইল্যুশন হিসেবে সামনে আনা হয়। তিনি বলেন, আদালত বলেছিলেন সংসদ চাইলে আরো দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে সব দল এই ব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দিয়েছিল। এই আইন শুধু বিএনপি নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুধীসমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে। এটিকে ইসি গঠনের আইন না বলে অনুসন্ধান কমিটি গঠনের আইন বলা যেতে পারে। সার্চ কমিটিতে সরকারি দল, সংসদের প্রধান বিরোধী দল ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের একজন করে প্রতিনিধি থাকলে স্বচ্ছতা থাকত। প্রস্তাবিত আইনে শুধু সরকারের ইচ্ছায় ইসি গঠন হবে। ওই কমিশন স্বাধীন হবে না, হবে সরকারের নির্বাচনবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন না করে এই আইন করা হলে তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে শ্যাল শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়েই কাজ করতে হবে। আইনে না থাকলেও যেটা হবে তা হলো, অনুসন্ধান কমিটি ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবে। সেই প্যানেল যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি পাঁচজন নির্বাচন করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ দেবেন। তবে এটা যে অসাংবিধানিক, তা নয়।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, দেরিতে হলেও আইনটি হচ্ছে। অনেকে আইনটিকে তড়িঘড়ির কথা বলেছেন। কিন্তু এর আগে তো বলা হয়েছিল, ১৫ দিনে এই আইন করা সম্ভব। তাহলে তড়িঘড়ির প্রশ্ন আসছে কেন?

জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘বাংলাদেশে কি বিচারপতি ও আমলা ছাড়া বিশ্বাস করার মতো কেউ নেই? রাজনীতিবিদ বা সংসদ সদস্যদের কি বিশ্বাস করা যায় না? আওয়ামী লীগ এত বড় রাজনৈতিক দল, বলেন আপনাদের জন্ম ক্যান্টনমেন্টে হয়নি, তাহলে আপনারাও কেন বিচারপতি ও আমলার ওপর নির্ভর করবেন?’

জাপার রওশন আরা মান্নান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর চাহিদার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার এই আইন করছে। কিন্তু সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ রেখে কিভাবে আইনটি হবে, জানি না। ’

পীর ফজলুর রহমান বলেন, এই আইন নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করলে আরো সমৃদ্ধ হতো।

গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে গিয়ে যে আইন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি, এই আইনে তার প্রতিফলন ঘটেনি। আইনটিতে বঙ্গবন্ধুর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিল নেই। ’

সরকারের শরিক দলের সদস্যরা যা বললেন

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, এর আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, আইনটি করার জন্য সময় প্রয়োজন। এই আইন নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। তিনি নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করেন।

জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, অনুসন্ধান কমিটি যে ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবে তাঁদের নাম ঠিক করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি অনুসন্ধান কমিটিকে কোনো পরামর্শ দিতে পারবেন না—এমনটি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

ওয়ার্কার্স পার্টির মোস্তফা লুত্ফুল্লাহ বলেন, যাঁরা দ্রুত আইন দাবি করেছিলেন, আইনটি করার উদ্যোগ নেওয়ার পর তাঁরাই আবার উল্টে গেলেন। অনুসন্ধান কমিটি যেসব নাম প্রস্তাব করবে, সেগুলো জাতীয় সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটিতে পাঠানোর বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

আইনমন্ত্রী যা বললেন

সংসদে নির্বাচন কমিশন গঠন বিল পাস নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আমি বলেছি, এটা তড়িঘড়ি করে করার আইন নয়, এটা সত্য। বর্তমান কমিশনের মেয়াদের মধ্যে আইন করা সম্ভব নয়, এটাও বলেছি। কারণ আমি বলেছিলাম, করোনাকালে সীমিত সময়ের জন্য সংসদ বসে, এর মধ্যে এই আইন পাস করা কঠিন হবে। সংসদকে শ্রদ্ধা জানিয়েই এটা বলেছিলাম। ’ মন্ত্রী বলেন, ‘সুজনের একটি প্রতিনিধিদল আমার কাছে গিয়ে আইনের একটি খসড়া দিয়ে পাসের প্রস্তাব করে। আমি আইনটি পাস করার জন্য সময় লাগবে বলে তাদের জানাই। তারা অর্ডিন্যান্স করে এটা করার প্রস্তাব দেয়। আমি বললাম, সংসদকে পাস কাটিয়ে এই আইন করব না। সংসদে নেওয়া ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ এই আইন আমরা করব না। ’

আনিসুল হক বলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যেসব দল সংলাপ করতে গেছে এবং যারা যায়নি তারা সবাই নতুন আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি আইনের বিষয়ে তাঁর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। এরপর বিলটি আনা হয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা