kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

ঢাকায় সড়কে পাঁচ মৃত্যু নিয়ে পুলিশ

চালকের বেপরোয়া মনোভাবই দায়ী

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৪ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




চালকের বেপরোয়া মনোভাবই দায়ী

রাজধানীতে গত কয়েক দিনে তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ প্রতিটি ঘটনায় চালকের দায়িত্বহীনতার তথ্য পেয়েছে।

গতকাল রবিবার দুর্ঘটনা এলাকার থানাগুলোর ওসিদের সঙ্গে কথা বলেছে কালের কণ্ঠ। প্রাথমিক তদন্তের তথ্য উদ্ধৃত করে তাঁরা বলেছেন, চালকের খামখেয়ালি আর বেপরোয়া গতির কারণেই ওই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

এই কর্মকর্তারা বলেন, কোথায় কেমন গতিতে গাড়ি চালাতে হবে, যাত্রীদের বাস থেকে নামানো-ওঠানোর সময় গতি কেমন থাকবে, দুই গাড়ির মাঝখানে কোনো মানুষ থাকলে কিভাবে গাড়ি টানতে হবে—এসব বিষয়ে চালকদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু এই পাঁচটি ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে এসব ক্ষেত্রে চালকদের ঘাটতি দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনও মনে হয়েছে। মূলত এ কারণেই যাত্রাবাড়ীতে এক পরিবারের তিনজন, মগবাজারে দুই বাসের মাঝে পড়ে এক শিশু, ওয়ারীর জয়কালী মন্দির এলাকায় বাস থেকে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বলেছে, তারা ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, ভুক্তভোগীর স্বজনদের অভিযোগসহ অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে।

পাঁচটি ঘটনাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। শুধু যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় চালক ও হেলপার গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্য ঘটনাগুলোয় অভিযুক্ত চালক, হেলপার ও কন্ডাক্টরদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তিনটি ঘটনায় পাঁচ মৃত্যু : ২১ জানুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার মাতুয়াইলে বেপরোয়া গতির সেন্টমার্টিন পরিবহনের একটি বাস একটি অটোরিকশাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই একই পরিবারের মোহাম্মদ আবদুর রহমান বেপারী (৬০), শারমিন আক্তার (৩৫) ও সিরাজুল ইসলাম কুদ্দুস (৪০) মারা যান। পরের দিন মানিকগঞ্জ সদর ও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ওই বাসের চালক দেলোয়ার হোসেন ওরফে দিদার (৪০) ও হেলপার কোরবান আলীকে (২৫) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১০।

র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক মেজর শাহরিয়ার জিয়াউর রহমান বলেন, চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণেই তিনজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর জনরোষ থেকে বাঁচতে চালক ও হেলপার পালিয়ে যান।

জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাযহারুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, পেছন থেকে বাসটি অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়। চালক বেপরোয়া না হলে এমনটি ঘটত না।  

ওই দুর্ঘটনায় মা-বাবাকে হারিয়ে শাহারিয়ার খান (১১) ও বৃষ্টি (৬) নামের দুই শিশু এতিম হয়েছে। শাহারিয়ার খান ঘটনার সময় গ্রামের বাড়িতে ছিল। আর মা-বাবার সঙ্গে থাকা বৃষ্টি বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্বজনরা এই বাচ্চাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পাচ্ছেন না।

গতকাল দুপুরে দুই শিশুর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে আমাদের বরিশালের আগৈলঝাড়া প্রতিনিধি জানান, শিশু শাহরিয়ার ‘আমাকে আম্মু-আব্বুর কাছে নিয়ে চল। আমাকে কে নিয়ে যাবে স্কুলে, কে ভাত খাইয়ে দেবে। আমার ছোট বোন বৃষ্টিকে কে দেখবে। আমরা কার কাছে থাকব...’ বলে কান্নাকাটি করছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে কিছুটা সুস্থ হয়ে বৃষ্টিও মা-বাবাকে খুঁজছে। হাসপাতালে শিশুটিকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে তার মামি সোনিয়া পারভীন। তিনি বলেন, ও ভয়ের মধ্যে (ট্রমায়) আছে। বাচ্চা মানুষ। একটু পর পর খালি বলছে মা কই? আমি মায়ের কাছে যাব। মা-বাবা আর নানাকে চোখের সামনে হারিয়েছে মেয়েটি।

বৃষ্টির বড় মামা নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভালোই চলছিল আমার বোনের সংসার। এক ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। ’

এর আগের দিন গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর ওয়ারীর জয়কালী মন্দির এলাকায় বাস থেকে পড়ে ইরফান আহমেদ (৪৮) নামের এক যাত্রী নিহত হন। নিহত ইরফান নবাবপুর এলাকার একটি ইলেকট্রিক দোকানের কর্মী ছিলেন। তবে স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পাঁচ টাকার ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে ইরফানকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় বাসের কন্ডাক্টর।

বসের চালক, হেলপার, কন্ডাক্টর—সবাই পলাতক।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহত ইরফানের সহকর্মী আব্দুল কাদের বলেন, বাসের কন্ডাক্টর মোজাম্মেলের সঙ্গে ইরফানের ভাড়া নিয়ে তর্কবিতর্ক হয়। এক পর্যায়ে হাতাহাতি হলে মোজাম্মেল কিল-ঘুষি মেরে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে নিচে ফেলে দেয়।

ওয়ারী থানার ওসি কবির হাওলাদার বলেন, ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ভাড়া নিয়ে তর্কবিতর্কের জেরে ওই যাত্রীকে চলন্ত বাস থেকে কার্যত ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

একই দিন (২০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর মগবাজার মোড়ে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুই বাসের মাঝে চাপা পড়ে রাকিব (১৪) নামের এক কিশোর নিহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুই বাসের প্রতিযোগিতায় এ ঘটনা ঘটেছে। নিহত রাকিব মগবাজার এলাকায় ফুটপাতে মাস্ক বিক্রি করত।

জানতে চাইলে রমনা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, মূলত বাসচালকদের দায়িত্বহীনতা ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই ওই কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্যই এসেছে। বাস দুটির চালকই এই ঘটনার জন্য দায়ী।

রাজধানীতে প্রায়ই ঘটছে এমন দুর্ঘটনা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান বলেন, বেশির ভাগ দুর্ঘটনায় চালকের অনেক দোষ-ত্রুটি পাওয়া যায়। বিশেষ করে বেপরোয়া গাতি একটা সমস্যা। তবে সড়কে নিরাপত্তার বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগ সতর্ক আছে।

 



সাতদিনের সেরা