kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

দূরপাল্লার বাস কেড়ে নিল এক পরিবারের তিনজনকে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দূরপাল্লার বাস কেড়ে নিল এক পরিবারের তিনজনকে

যাত্রাবাড়ীতে বাসের চাপায় অটোরিকশায় থাকা একই পরিবারের তিনজন মারা গেছেন। তাঁদের সঙ্গে থাকা সাত বছর বয়সী মিষ্টি আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরিশাল থেকে পরিবারটি লঞ্চে রাজধানীর সদরঘাটে এসেছিল ভোরে। উদ্দেশ্য মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক স্বজনকে দেখতে যাওয়া। তার আগে একটু বিশ্রাম নিতে মাতুয়াইলে আরেক স্বজনের বাসায় যাচ্ছিল তারা। গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল মা ও শিশু হাসপাতাল সংলগ্ন সড়কে তাদের বহন করা অটোরিকশাটি পৌঁছলে দূরপাল্লার সেন্ট মার্টিন পরিবহনের একটি বাস চাপা দেয়।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাস্থলেই পরিবারটির তিন সদস্য মারা যান। নিহতরা হলেন আব্দুর রহমান (৬৫), তাঁর মেয়ে শারমিন (৩৮), তাঁর স্বামী রিয়াজুল (৪৮)। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে শারমিনের মেয়ে বৃষ্টি আক্তার (৬) ও অটোরিকশার চালক মো. রফিক (৪২)।   

অন্যদিকে গতকাল রামপুরায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় এক অটোরিকশাচালক মারা গেছেন। নিহতের নাম রাজিব হাওলাদার (৩৮)। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই স্কুল শিক্ষার্থীসহ আরো সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।

মাতুয়াইলের দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর বিষয়ে স্থানীয় থানার এসআই বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, সকালে সেন্ট মার্টিন পরিবহনের একটি বাস অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়। এতে অটোরিকশায় থাকা সবাইকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহতদের চিকিৎসা চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার সময় বাসটি বেপরোয়া গতিতে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে বাসটি অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়। দুর্ঘটনাস্থলের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।

এ ঘটনায় গতকাল সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে স্বজনদের হাহাকারে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। নিহত আব্দুর রহমানের ছেলে তানভীর আহমেদ জানান, তাঁদের বাড়ি বরিশালের উজিরপুরে। তাঁর মা মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর অবস্থা গুরুতর। মাকে দেখতে গ্রামের বাড়ি থেকে বাবা, বোন, ভগ্নিপতি ও তাঁদের এক সন্তান ঢাকায় আসে। ভোরে সদরঘাট নেমে মাতুয়াইলে তাঁর বাসায় যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় তারা।

থানায় মামলা : যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাযহারুল ইসলাম বলেন, মাতুয়াইল মাতৃসদন হাসপাতালের সামনে অটোরিকশাটি রাস্তা ক্রস করে উত্তর পাশ থেকে দক্ষিণ পাশে আসার মুহূর্তে কাঁচপুর থেকে ঢাকামুখী একটি বাস পেছন থেকে সজোরে চাপা দেয়। এ ঘটনায় পরিবহন আইনের ১০৫ ও ৯৮ ধারায় একটি মামলা করা হয়েছে। বাসটি আরামবাগ থেকে জব্দ করা হলেও চালক পলাতক জানিয়ে ওসি মাযহারুল বলেন, চালক ও বাসটির হেল্পারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। নিহত তিনজনের ময়নাতদন্ত গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে শেষ হয়। তাঁদের মরদেহ রাতেই গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হবে।

এতিম হলো বৃষ্টি : অসুস্থ নানিকে হাসপাতালে দেখতে মা-বাবা আর নানার সঙ্গে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছিল বৃষ্টি। অটোরিকশায় চেপে সেখানে যাওয়ার পথে সবাইকে হারিয়ে ছয় বছরের মেয়েটি এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) শয্যাশায়ী। ঢামেকের ২০৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বৃষ্টি বিপদমুক্ত জানিয়ে দায়িত্বরত একজন চিকিৎসক জানান, ‘বৃষ্টির মাথায় আঘাত লেগেছে। আপাতত মনে হচ্ছে বিপদমুক্ত। তবে ৭২ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না। ’

বৃষ্টির বাবা নিহত রিয়াজুল ছিলেন একটি এনজিওর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার), মা গৃহিণী, আর নানা মাছ ব্যবসায়ী। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের উজিরপুরে। বৃষ্টির বড় মামা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টির আর কেউ রইল না। এক ঝড়েই ভাগ্নি আমার এতিম হয়ে গেল। ’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভালোই চলছিল আমার এই বোনের সংসার। শাহরিয়ার নামে বৃষ্টির আট বছর বয়সী এক ভাই গ্রামে রয়েছে। ’

রামপুরায় আটোরিকশাচালক নিহত : রাজধানীর রামপুরায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় এক অটোরিকশাচালক মারা গেছেন। তাঁর নাম মো. রাজিব হাওলাদার (৩৮)।

রামপুরা থানার এসআই মোমিনুল রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে রামপুরা বাজার এলাকা দিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে যাওয়ার সময় একটি কাভার্ড ভ্যান পেছন দিক থেকে চাপা দিলে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে মারাত্মক আহত চালককে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করার পর গতকাল সকাল ৬টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় কাভার্ড ভ্যানটি জব্দ করা হয়েছে। চালক পুলিশ হেফাজতে।

নিহতের ভাই মিজান জানান, বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রিয়ামতি গ্রামে তাঁদের বাড়ি। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে খিলগাঁও সিপাহীবাগ এলাকায় থাকতেন রাজিব।

মাদারীপুরে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু : বৃহস্পতিবার রাতে মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। নিহতরা হলো ধুরাইল ইউনিয়নের চাষাড় গ্রামের লোকমান ফরাজীর ছেলে নাঈম ফরাজী (১৪) এবং জহির ফরাজীর ছেলে জনি ফরাজী (১৫)। তারা স্থানীয় একটি স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়ত।

ধুরাইল ইউনিয়নের জালালপুর আইডিয়াল হাই স্কুলের মাঠে নাঈম ও জনি ব্যাডমিন্টন খেলে রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিল। পথে আড়িয়ালখাঁ নদের ব্রিজের গোড়ায় ভাঙা রাস্তার পাশের পিলারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যায় তারা।

নওগাঁর পত্নীতলায় নিহত ২ : গতকাল সকালে পত্নীতলার নজিপুর-সাপাহার সড়কে কমরজাই নকুচা এলাকায় মালবাহী ট্রাক্টরের চাপায় দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন উপজেলার দিবর ইউনিয়নের বড় মহারন্দি পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত ময়েজ উদ্দিনের ছেলে ফারুক হোসেন এবং একই গ্রামের জুয়েল রানার স্ত্রী বুলবুলি আক্তার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাইসাইকেল আরোহী নিহত : গতকাল সকাল  সাড়ে ৭টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের পেয়ারাপুর কাচারি এলাকায় অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে রাকিব আলী (১৮) নামের এক বাইসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহত রাকিব রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নের পিরগাছি গুপ্তমানিক নকাটিতলা গ্রামের রুবেল আলীর ছেলে।

গোপালগঞ্জে প্রতিবন্ধী কিশোর নিহত : গোপালগঞ্জে বাসের চাপায় শাওন শেখ (১৬) নামের এক বাকপ্রতিবন্ধী কিশোর নিহত হয়েছে। গতকাল বিকেলে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের সদর উপজেলার চন্দ্রদিঘলিয়া বাসস্ট্যান্ডে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শাওন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের তেবাড়িয়া গ্রামের মাহবুর শেখের ছেলে।

সরিষাবাড়ীতে বাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ১ : জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে যাত্রীবাহী বাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে সাউফ আহমেদ জিসান (২৮) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আহত হন মোটরসাইকেলের আরেক আরোহী। গতকাল সকালে উপজেলার ভাটারা-শ্যামগঞ্জ কালিবাড়ী সড়কের তরপাড়া ব্রিজ এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত সাউফ আহমেদ জিসান রাজধানীর স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং উত্তীর্ণ হয়েছেন।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। ]



সাতদিনের সেরা