kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ১৭ মে ২০২২ । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩  

ডিসি সম্মেলন শেষ

জনপ্রতিনিধিরা সম্মান পান না সমন্বয় নেই

ওমর ফারুক   

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জনপ্রতিনিধিরা সম্মান পান না সমন্বয় নেই

সংসদ সদস্য (এমপি) থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময় প্রশাসনের কাছ থেকে যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) আরো সংবেদনশীল হওয়া উচিত বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, ‘এটা খুব দুঃখজনক, প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হয় না। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনের শেষ দিনে ডিসিদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে এসে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

 

২৬৩টি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে তিন দিনের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে। দুই ডজনের বেশি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ২১ অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ মাঠ পর্যায়ের এই প্রশাসনিক প্রধানদের কিছু দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন। অন্তত দুজন মন্ত্রী নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে প্রশাসনের ওপর ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।

গতকাল শেষ দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন সম্মেলন থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘জেলা পর্যায়ে তথ্য চাওয়ার পর সেগুলো পেতে দেরি হয়। ফলে তথ্যের অভাবে বিদেশিদের সঙ্গে দেনদরবার করতে পারি না। আমাদের ওপর চাপ আসে। তাঁরা যেন ত্বরিত ব্যবস্থা নেন। ব্যক্তিবিশেষের তথ্য চাইলে সহজে আসে না। ’  এর আগে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছিলেন, স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার থেকে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু হয়। গতকাল তা শেষ হয়েছে। তিন দিনে ৫৫টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রধান অধিবেশনে অংশ নেন। গতকাল শেষ দিনে প্রতিরক্ষা, পানিসম্পদ, নৌপরিবহন, মৎস্য ও প্রনিসম্পদ, তথ্য ও সম্প্রচার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্র, ভূমি, ধর্ম, আইন ও বিচার, সেতু, রেলপথ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিবেশন ছিল।

যেসব বিষয়ে আলোচনা হলো : চিংড়ি চাষিদের কৃষিঋণের আওতায় আনা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা; মজুদদারি, কালোবাজারি, ভেজাল ও মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা; কিশোর গ্যাং ও উগ্রবাদ নিয়ে আলোচনায় তা নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদের কর্মচারীদের তিন বছর পর বদলির ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যসূচিতে ট্রাফিক আইন ও ভূমি সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর ফলন ভালো হওয়ায় ভারত থেকে টমেটো আমদানি না করার সিদ্ধান্ত হয় সভায়। তামাক চাষিদের তামাকের পরিবর্তে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দিয়ে সরিষা, সূর্যমুখী, আখ, চিনাবাদাম, ভুট্টা, ব্রকোলি, অ্যাস্পারাগাস, স্ট্রবেরি, চেরি, মাল্টা ও বিভিন্ন মসলাজতীয় ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করা এবং তামাক চাষে ব্যবহৃত এসওপি সার আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব এসেছে সভায়।

দুই মন্ত্রীর ক্ষোভ : পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু দুঃখ আছে। আমাদের এক কোটির বেশি প্রবাসী আছেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, দেশে ঠিকমতো পাসপোর্ট পান না। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পান না। দেশে এলে হয়রানির শিকার হতে হয়। সময়মতো তাঁরা বিবাহ সনদ, জন্ম সনদ—এগুলো পান না। তাঁরা মারা গেলে ডেড বডি (মরদেহ) আনতে যেসব তথ্য লাগে, সেগুলো ঠিকমতো পাই না। ’ তিনি বলেন, ‘দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের কোনো পাসপোর্ট তৈরি করে না, এনআইডি দেয় না। শুধু তথ্য সংগ্রহ করে দেশে পাঠায়। সেগুলো ফেরত যেতে এত দেরি হয় যে প্রবাসীরা অসন্তুষ্ট হন। আমরা আশা করব, ডিসি সাহেবরা মোর সেনসিটিভ হবেন, যাতে এ ধরনের সেবা ত্বরান্বিত হয়। ’

আব্দুল মোমেন আরো বলেন, ‘আমরা বলেছি যে আমাদের সহকর্মীরা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা, সংসদ সদস্যরা বলেছেন যে স্থানীয় প্রশাসন কিংবা অন্য সরকারি অফিসে অনেক সময় সেই ধরনের সম্মান দেয় না। কিংবা তাঁরা যেহেতু নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের কিছু কমিটমেন্ট রয়েছে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করার জন্য বলেছি। এটা খুব দুঃখজনক যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ হয় না। ’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলেছি, স্থানীয় প্রশাসন যে কাজগুলো নিজেরা করতে পারে, তারা সেগুলো ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। এর ফলে সবাই ঢাকাকেন্দ্রিক হচ্ছে। এ ব্যাপারে তাঁদের (ডিসিদের) সজাগ থাকতে বলা হয়েছে। আমি বলেছি, সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির বিষয়ে তাঁরা যেন শক্ত অবস্থান নেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের প্রশংসাও করেছি। গত কভিডের সময় তাঁরা যেভাবে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন তার জন্য দেশবাসী তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। ’

সম্মেলন সূত্র জানায়, উন্নয়ন প্রকল্প এলাকার পরিবেশ, জমির শ্রেণি এবং সামাজিক প্রভাব বিষয়ে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন একজন ডিসি। সম্মেলনে সেটি নাকচ করে দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এ ছাড়া আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ভূমি ও গৃহহীনদের দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও জমি সাশ্রয়ের জন্য বহুতল ভবন করার প্রস্তাব ছিল, কিন্তু সায় দেয়নি সরকার।  

পরিকল্পনামন্ত্রী গত বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। এটা কাটিয়ে উঠলে প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে। তিনি বলেন, ‘বৈঠকে জেলা প্রশাসকরা চেয়েছিলেন প্রকল্প বাস্তবায়নে যেন জেলা পর্যায়ে কমিটি করা হয়। আমরা বলেছি, কমিটির প্রয়োজন নেই। এলাকার ভেতরে কাজ দেখার অধিকার ডিসিদের আছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে ঘন ঘন যোগাযোগ করি, চিঠি দিই। সেগুলো অনুযায়ী আপনারা কাজ করবেন। ’

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বক্তব্য দেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সব আলোচনা, প্রস্তাব, সুপারিশ ধরে নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ডিসিদের জন্য নির্দেশনা তৈরি করবে। এটা সমন্বয় করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।  

 



সাতদিনের সেরা