kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

সিদ্ধিরগঞ্জে উৎকণ্ঠার আভাস

এস এম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ থেকে    

১৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সিদ্ধিরগঞ্জে উৎকণ্ঠার আভাস

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সানারপাড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণ পাশেই নারায়ণগঞ্জের মিজমিজি এলাকা। গতকাল শনিবার দুপুরে মহাসড়ক থেকে নেমে ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে এগিয়ে দেখা গেলে দেখা যায় দুই পাশ ঢেকে আছে নির্বাচনী পোস্টারে। এর সবই কাউন্সিলর প্রার্থীদের।

দোকানের সামনে ছোট জটলা।

বিজ্ঞাপন

কথা হলো সাইফুল ইসলাম নামের স্থানীয় এক বাসিন্দার সঙ্গে। সাইফুল বলেন, ‘এইখানে ভোট কাউন্সিলরগোই। মেয়র তো একজন হইবো। কাউন্সিলর কেডা হয় সেটা নিয়াই পরিবেশে চাপা গরম আছে। ’

সাইফুলসহ কয়েকজন জানালেন, সাত খুনে নিহত নজরুল ইসলাম ছিলেন মিজমিজির নেতা। গত সিটি নির্বাচনে তাঁর স্ত্রী সেলিনা বিউটি প্রার্থী হয়েও বিএনপির প্রার্থী ইকবাল হোসেনের কাছে হেরে যান। ইকবালের সেই জনপ্রিয়তায় চ্যালেঞ্জ হয়ে এবার এসেছেন স্থানীয় প্রার্থী, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া রাজু। নজরুলের একসময়ের সহযোগী রাজুকে সমর্থন দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শিমরাইল এলাকায় পাওয়া গেল তিন-চারটি ওয়ার্ডের শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী উৎকণ্ঠার আভাস। নারায়ণগঞ্জ-চট্টগ্রাম রোডের টেম্পোস্ট্যান্ডের চায়ের দোকানদার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এইখানে সবাই ব্যাপক পাওয়ারফুল। এখনো কোনো ঝামেলা হয় নাই ঠিকই, তবে আমরা ভোটাররা এইখানে একটু ভয়েই আছি। ’

রফিকুলসহ কয়েকজন বললেন, সাত খুনের মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনের ভাই নূর উদ্দিন ৪ নম্বর ওয়ার্ডে এবং ভাতিজা শাহজালাল বাদল ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী। একইভাবে সিদ্ধিরগঞ্জের অন্তত ১০টি ওয়ার্ডে লড়ছেন বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী প্রার্থীরা।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের আগের দিন এক ডজন ওয়ার্ডে ঘুরে ভোটারদের চোখেমুখে এ রকমই উদ্বেগ আর আতঙ্ক দেখা গেছে। তাঁরা বলছেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক প্রার্থী রয়েছেন, যাঁরা হত্যা, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, অর্থ আত্মসাৎ, নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত। ভোটারদের আশঙ্কা, অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে নেমে এরই মধ্যে বুঝতে পেরেছেন সুষ্ঠু ভোট হলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারবেন না তাঁরা। তাই গতকাল পর্যন্ত পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও ভোটের দিন সংঘাতের আশঙ্কা উঁকি মারছিল সবার মনে।

যেকোনো মূল্যে অবশ্য নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক ও শান্ত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জাহিদুল আলম গতকাল বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এলাকায় শান্তি বিনষ্ট হতে পারে—এমন কোনো অবস্থা হতে দেওয়া যাবে না। এ জন্য বহিরাগত কাউকে এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হবে না।

আজকের নির্বাচনে নাসিকের ২৭টি ওয়ার্ডের নারীসহ মোট প্রার্থী ১৮২ জন। তাঁদের মধ্যে সংরক্ষিত আসনে নারী ৩৪ জন। বাকি ১৪৮ জন পুরুষ প্রার্থী লড়ছেন ওয়ার্ডগুলোতে।

অপরাধের পূর্ব ইতিহাসের কারণে শঙ্কা সিদ্ধিগঞ্জের ওয়ার্ডগুলোতেই বেশি।

১ নম্বর ওয়ার্ডে গত নির্বাচনের কাউন্সিলর ওমর ফারুক প্রভাবশালী হলেও তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবদুর রহিম। এই ওয়ার্ডের নির্বাচন নিয়েও জনমনে উৎকণ্ঠা আছে।

২ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন ২৭টি মামলার আসামি হয়ে কিছুটা কোণঠাসা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাত খুনে নিহত নেতা নজরুল ইসলামের একসময়ের সহযোগী আমিনুল হক ভূঁইয়া রাজু শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারাও তাঁর পক্ষে।

৩ নম্বর ওয়ার্ডে নূর হোসেনের ভাতিজা শাহজালাল বাদল গত নির্বাচনে কাউন্সিলর হয়েছেন। এবারও শক্ত প্রার্থী তিনি। তাঁর প্রতিপক্ষ তোফায়েল আহমেদও যুবলীগ নেতা। তাই লড়াই হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

৪ নম্বর ওয়ার্ডে নূর হোসেনের সাবেক ক্যাশিয়ার মাদক মামলার আসামি আরিফুল হক হাসান সাবেক কাউন্সিলর। শ্রমিক লীগ নেতা আব্দুল মতিন মাস্টারের ছেলে আরিফুল হাসানও গড়ে তুলেছেন একটি আলাদা বলয়। স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধে নূর হোসেনের পরিবারের প্রতিপক্ষ হয়ে গেছেন তিনি। এবার নূর হোসেনের ভাই মিয়া নূর উদ্দিন প্রার্থী। নূর হোসেনের সহযোগীরা তাঁর হয়েই কাজ করছে।

সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন কারাগার থেকে এলাকায় যোগাযোগ করেছেন বলে এলাকাবাসীর মধ্যে খবর ছড়িয়েছে। সম্প্রতি কাশিমপুর কারাগারে তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোন উদ্ধার করে কারা কর্তৃপক্ষ। নূর হোসেনের নিজস্ব একাধিক প্রার্থী এবং তাঁর সহযোগীরা সক্রিয় থাকায় এলাকাবাসীর মধ্যে অজানা আতঙ্ক কাজ করছে।

৫ নম্বর ওয়ার্ডে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির গিয়াস উদ্দিনের ছেলে গোলাম মোহাম্মদ সাদরিল প্রার্থী। এতে শঙ্কায় রয়েছেন অনেক ভোটার। গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ সাদরিলের নামে ২৭টি মামলা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টারও অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী।

৬ নম্বর ওয়ার্ডে থানা যুবলীগের আহ্বায়ক একসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী মতিউর রহমান মতি ফের প্রার্থী হয়েছেন। বর্তমান কাউন্সিলর মতির ঠেলাগাড়ির বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম ঝুড়ি প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থানে।

৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবিরের ছেলে তানজীম কবির সজুর বিরুদ্ধেও আছে অনেক অভিযোগ।  

৮ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর রুহুল আমিন মোল্লা এগিয়ে থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বী মহসিন ভুঁইয়া একটি প্রভাবশালী মহলের সমর্থন পেয়েছেন।

৯ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর ইস্রাফিল প্রধান আগে বিএনপি করলেও আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে হয়েছেন ব্যাপক প্রভাবশালী। তাঁর প্রতিপক্ষ বিলাল হোসেন বেশ কোণঠাসা।

১০ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ইফতেখারুল আলম খোকনের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের নিয়ে প্রচার চালানোর অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মশিউর রহমান গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। কোথাও গুরুতর কোনো অভিযোগ নেই। ছোটখাটো কিছু অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলো আমরা সমাধান করছি তাৎক্ষণিক। আমরা মাঠেই টহলে আছি। ’



সাতদিনের সেরা