kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

বিশেষ লেখা

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সৃষ্টিকে সংরক্ষণ ও কাজে লাগাতে হবে

আসিফ মুনীর

১৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সৃষ্টিকে সংরক্ষণ ও কাজে লাগাতে হবে

আসিফ মুনীর

এ বছরকে একটু আলাদাভাবেই আমরা দেখতে চাই। বাংলাদেশের ৫০ বছর পার হলো। সেই জায়গা থেকে চিন্তা করলে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন আছে, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে আদর্শিক চিন্তা-ভাবনা ছিল, সেটা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারলাম বা পারলাম না।

এই মূল্যায়ন হওয়া দরকার বিভিন্নভাবে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, সরকারিভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ও ব্যক্তি পর্যায়েও মূল্যায়ন দরকার। সে ক্ষেত্রে আমার যেটা মনে হয়, শহীদ বুদ্ধিজীবীরা, আমাদের বাবারা তো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেছিলেন। সেই চর্চার অনেক কিছুই লিখিতভাবে আছে। একটা মূল জায়গা যদি ধরি, এই লিখিত ফর্মগুলো আমরা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে পারি। যেমন—তাঁদের রচনাগুলো প্রকাশনার ব্যবস্থা করা। কিছু কিছু হয়তো হয়েছিল বাংলা একাডেমির উদ্যোগে, কিন্তু সেগুলো অনেক আগের এবং এখন সেভাবে পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয়ত, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকার বিষয়টি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা বা তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ করার প্রথম উদ্যোগ এসেছিল সম্ভবত বাংলা একাডেমি থেকে। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দেখছি। এই উদ্যোগগুলো আরো আগে হলে যেটা সুবিধাটি হতো তা হলো, সুনির্দিষ্টভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে জানা যেত। দেরিতে তালিকা তৈরিতে এক ধরনের বিভ্রান্তিও তৈরি হয়।

বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস হিসেবে ধরা হচ্ছে ১৪ ডিসেম্বরকে। কিন্তু অনেকেই বলে, বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হয়েছে তো ১৯৭১ সালের সেই ২৫ মার্চ থেকেই। এটি যেমন সত্যি, তেমনি পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্যও আছে।

ডিসেম্বরে যে হত্যাকাণ্ড, সেটা তালিকা করে করা। এটা অনেক আগে করা তালিকা। এটার প্রস্তুতি চলেছে পুরো পাকিস্তান আমলে। আমাদের বাবারা বিভিন্ন সময় পাকিস্তান সরকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হুমকি পেয়েছেন। তাঁদের কারাগারেও নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁদের অনেকেই ছিলেন ভাষাসৈনিক। সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই এঁরা মার্কামারা ছিলেন পাকিস্তানের কাছে। সেই মার্কামারা লোকজনের তালিকা করে ওরা তাঁদের হত্যা করেছে। অন্য শহীদ বুদ্ধিজীবীরা সবাই হয়তো ওই তালিকায় ছিলেন না। অথবা ওরা হয়তো দেখেছে, তালিকার মধ্যে কারা বাকি আছে তাঁদের একবারে শেষ করে দিই।

এই প্রেক্ষাপট নিয়ে লোকজনের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের মধ্যেও রয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর আমরা কেন শুধু একাত্তরে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করছি? আসলে তা নয়। এটা প্রযোজ্য সব শহীদ বুদ্ধিজীবীর জন্য। তবে পার্থক্যটাও বোঝার বিষয় আছে। আমি আবারও বলব, ঐতিহাসিক যে ব্যাপারটি, কেন তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল, কেন কিছুটা পার্থক্য রয়েছে বুদ্ধিজীবী হত্যার ধরনের ক্ষেত্রে এবং এই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অবদানটি আসলে কী—এসব স্পষ্ট করা দরকার।  

আমি কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, আপনাদের বাবাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান কী? তখন আমি বলেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময়, যুদ্ধ চলাকালে তাঁদের অবদান সবচেয়ে কম। তাঁদের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে মুক্তির যে যুদ্ধ, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল—এই সময়ে। ওই সময় থেকে তাঁরা টার্গেট হয়েছেন। কেন? তাঁরা মুক্তির পক্ষে কথা বলেছেন, লিখেছেন বলেই। যে কথাগুলো তাঁরা লিখেছেন, বলেছেন, এগুলো বিস্মৃতির জায়গায় চলে যাচ্ছে বলেই দু-একজন প্রশ্ন করছে।

আমরা দিবস পালন করার সময় তাঁদের নামগুলো বলছি, তাঁদের ধরে নিয়ে যাওয়ার কাহিনি বলছি। এতে তাঁদের অবদানকে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছি শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে। তাঁরা যে বঙ্গবন্ধুসহ রাজনীতিবিদদেরও অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন, সেই অনুপ্রেরণা কিন্তু এখনো কাজে লাগবে। তাঁদের লেখা অনেক গল্প, সাহিত্য, প্রবন্ধ, কথিকা এখনকার জন্যও সমকালীন ও প্রযোজ্য।

আমাদের যে চার মূলনীতি বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা—এই চারটি বিষয়ে তাঁরা ক্রমাগত তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে বলে গেছেন, এর স্বরূপটা কী হওয়া উচিত? আমার বাবা (শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী) ভাষা নিয়ে অনেক ধরনের গবেষণার কাজ করেছেন, সেগুলো লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এগুলো এখনো আছে। এগুলো খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। উনি বাংলা টাইপরাইটার নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৬৫ সালে বাংলা টাইপরাইটারের জন্য উন্নতমানের কি-বোর্ড ‘মুনীর অপটিমা’ উদ্ভাবন করেন।

কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এ ধরনের বিষয় সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সৃষ্টি, সেই সৃষ্টিকে সংরক্ষণ, আমাদের পাঠ্যপুস্তক, আমাদের জাতীয় নীতি নির্ধারণের কাজে লাগাতে হবে। এটা প্রয়োজন।

লেখক : শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী ও লেখক লিলি চৌধুরীর ছোট ছেলে।



সাতদিনের সেরা