kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দেশ স্বাধীন হলেও পুরো স্বস্তি পাইনি

৫০ বছর পার করেছে বাংলাদেশ। বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশ এখন জীবনসায়াহ্নে। তাঁদের মধ্য থেকে ৮০ বছর পেরিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখছেন কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিরা

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দেশ স্বাধীন হলেও পুরো স্বস্তি পাইনি

তাজুল ইসলাম

মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ ও মিলনমেলার মঞ্চের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। সেদিকে অপলক দৃষ্টি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. তাজুল ইসলামের। চোখে জমছিল অশ্রু। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম বললেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কতা মনে অইলে বুকটা ফাইট্টা যায়। শেখ সাহেব বাইচ্চা থাকলে দেশটা আরো কত সুন্দর অইতো!’

তাজুল ইসলাম বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তবু বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসের মতো অনুষ্ঠানে ডাক পেলে ছুটে যান। নব্বই পেরোনো এ মানুষটি গতকাল বুধবার সকালেও ছুটে এসেছিলেন পৌর এলাকার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরের অনুষ্ঠানে। বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। সেখানেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বাসুদেব ইউনিয়নের আহরন্দ গ্রামে।

ভাষা চত্বরে বসে কথা হওয়ার সময় জানালেন, যুবক বয়সী ও স্বাস্থ্যবান ছিলেন বলে যুদ্ধ শুরুর পর বাড়ির সবাই তাঁকে লুকিয়ে রাখতেন। গ্রামের পরিচিত একজনকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধে যোগ দেওয়ার বিষয়টি ভাবতে থাকেন। কিন্তু পরিবার সম্মতি দিচ্ছিল না। একদিন তাঁর বড় ভাই সাবুদ আলীকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে গেলে যুদ্ধে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার তখন দুই সন্তান। পাকা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যুদ্ধে যেতে বাড়ির কেউ আর বাধা দেয়নি। মা করফুননেছা বলে দেন আমাকে আল্লাহর নামে ছেড়ে দিয়েছেন। দেশ স্বাধীন করে যেন বাড়ি ফিরি।’ এরপর তাজুল ইসলাম প্রশিক্ষণের জন্য চলে যান ভারতে। দেশে ফিরে ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন ও ক্যাপ্টেন শর্মার নেতৃত্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, আখাউড়া ও আশুগঞ্জ এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেন। আশুগঞ্জে যুদ্ধ চলাকালে দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর পান। আনন্দে মন ভরে যায়।

যুদ্ধের বিশেষ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘একদিন আমাদের ওপর আক্রমণ হলেও নেতৃত্বে থাকা ক্যাপ্টেন শর্মা গুলির নির্দেশনা দিচ্ছিলেন না। আমি আর সহযোদ্ধা মহিউদ্দিন একটা বাংকারে আটকা পড়ি। একসময় আর বিপক্ষের ফায়ারিংয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না। তখন বুঝতে পারি, তাদের গুলি শেষ। এরপর আক্রমণের নির্দেশনা পাই।’ আরেকবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের বরিশল এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর খাবারের মজুদ শেষ হয়ে যায়। তখন তারা সেখান থেকে সরে যাওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করেন। তাজুল জানান, দুবারই তাঁরা অনেক পাকিস্তানি সেনাকে হতাহত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কয়েকটি যুদ্ধে তাঁর সঙ্গের অনেক মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন।

মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম কথার ফাঁকে কিছু বিষয়ে আক্ষেপও করলেন। বললেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আমরা মুক্তিযোদ্ধারা পুরো স্বস্তি পাইনি। বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছে। এরপর অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতেও সংকোচবোধ করতেন। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। তবে কিছু রাজাকার এখনো সক্রিয়।’

 



সাতদিনের সেরা