kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

আবরার হত্যা মামলার রায়

বুয়েটের ২০ ‘ছাত্রের’ মৃত্যুদণ্ড

৫ জনের যাবজ্জীবন, ৩ জন পলাতক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বুয়েটের ২০ ‘ছাত্রের’ মৃত্যুদণ্ড

গতকাল রায়ের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। ছবি : কালের কণ্ঠ

মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ রাব্বীকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা দেশের সব মানুষকে ব্যথিত করেছে। এমন নৃশংস ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার আলোচিত আবরার হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত এই মন্তব্য করেন। ওই মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ বুয়েটের বহিষ্কৃত ২০ শিক্ষার্থীর ফাঁসি এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। পাশাপাশি তাঁদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান রায় ঘোষণা করেন।

সাজাপ্রাপ্ত ২৫ আসামির সবাই ছিলেন বুয়েটের শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ঘটনার পরপরই জড়িতদের বিচারের দাবি উঠলে ছাত্রলীগ থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন পলাতক। এই তিনজনেরই মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

গ্রেপ্তার থাকা ২২ আসামিকে গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে এনে হাজতখানায় রাখা হয়। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে তাঁদের এজলাসে তোলা হয়। দুপুর ১২টায় বিচারক সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু করেন।

রায় শুনে অনেকটা স্বাভাবিক ছিলেন আসামিরা। কিন্তু বাইরে অপেক্ষমাণ তাঁদের মা-বাবাসহ স্বজনদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অবশ্য কারাগারে নেওয়ার জন্য প্রিজন ভ্যানে তোলা হলে কয়েকজনকে কাঁদতে দেখা গেছে।

দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ বুয়েটের একজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে। সেই মামলায় বুয়েটেরই ২০ জন সাবেক ছাত্রের ফাঁসির দণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে। দেশের শিক্ষাঙ্গনে এটা বড় ঘটনা বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বুয়েটের উপাচার্য ও শিক্ষার্থীরা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। 

রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই রায় প্রত্যাশিত ছিল। যাদের ধরা হয়েছে, তাদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা এত বেপরোয়া ছিল যে তারা কোনো কিছু তোয়াক্কা করেনি। ফলে প্রমাণ পেতে সমস্যা হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আবরারকে যেভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে, তা অকল্পনীয় ছিল। ফলে বিচারক যিনি ছিলেন তাঁর পক্ষেও এর বাইরে রায় দেওয়া সম্ভব ছিল না। এই রায়ই দেশবাসীর প্রত্যাশিত ছিল।’

এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘শিক্ষকরাজনীতি, ছাত্ররাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, হল প্রশাসন—সব নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এই যে একটা ছেলেকে মেরে ফেলল, আর এতগুলো ছেলের শাস্তি হলো—এটা দেশের একটা বিপন্নতার চিত্র। এই বিপন্নতা আমাদের দেশে আমরা চাই না।’

গতকাল এই মামলার রায় ঘিরে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত এলাকায় নিহত আবরারের স্বজন, সহপাঠী, আসামিদের স্বজন, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মীসহ নানা শ্রেণির মানুষের উপস্থিতি ছিল। আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।

আবরার ফাহাদের স্বজন ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাঁরা ন্যায়বিচার পাননি। তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন। আসামিদের স্বজনরা গণমাধ্যমের সঙ্গে খুব একটা কথা বলতে রাজি হননি। তবে বেশ কয়েকজনকে বিলাপ করতে দেখা গেছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘২০১৯ সালের ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে বুয়েটের শেরেবাংলা আবাসিক হলের ক্যান্টিনে এবং পরদিন রাত ১০টার পর আসামিরা দফায় দফায় মিটিং করেন। তাঁরা ৬ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে ৭ অক্টোবর ভোর পর্যন্ত শেরেবাংলা আবাসিক হলের ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর রুমে আবরার ফাহাদকে চড়, থাপ্পড়, লাথি, কিল, ঘুষি মারেন; ক্রিকেট স্টাম্প, স্কিপিং রোপ দিয়ে নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করেন। আবরারের সঙ্গে এমন নির্মম, নিষ্ঠুর আচরণ বাংলাদেশের সব মানুষকে ব্যথিত করেছে। মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে আর কখনো না ঘটে তা রোধকল্পে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হলো।’

রায়ে বলা হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত্ত আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আসামিরা নির্মমভাবে একজন মেধাবী ছাত্রকে হত্যা করেছেন বিধায় তাঁদের প্রতি কোনো প্রকার সহানুভূতি দেখানোর সুযোগ নেই। এ কারণে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করাই যুক্তিযুক্ত।

দণ্ডিত হলেন যাঁরা 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামি হলেন পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, কেমিকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার ওরফে অপু, পানিসম্পদ বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, কেমিকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুয়েট ছাত্রলীগের উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সদস্য মুনতাসির আল জেমি, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সদস্য মুজাহিদুর রহমান। এঁরা ছিলেন পদধারী নেতা এবং ১৩ থেকে ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী।

এ ছাড়া যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী হোসেন মোহাম্মদ তোহা, বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মাজেদুর রহমান মাজেদ, নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম বিল্লাহ, যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী এ এস এম নাজমুস সাদাত, যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মোর্শেদ অমত্য ইসলাম, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ মোর্শেদ উজ জামান মণ্ডল জিসান ও পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী এহতেশামুল রাব্বি তানিম, আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত ও এস এম মাহমুদ সেতু ছিলেন শাখা ছাত্রলীগের কর্মী। এঁদের মধ্যে ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীই বেশি। এঁদের মধ্যে মোর্শেদ উজ জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মুজতবা রাফিদ পলাতক।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতাসিম ফুয়াদ, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড প্রকৌশল বিভাগের মুয়াজ ওরফে আবু হুরায়রা এবং পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আকাশ হোসেন।

দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ ৪৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য দিয়ে আসামিদের অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ যেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে না ঘটে, সেই প্রত্যাশায় এই রায় দেওয়া হয়েছে।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘ঘটনার যারা মাস্টারমাইন্ড ছিল তাদের এ মামলায় আনা হয়নি। ওই ঘটনায় বুয়েটের যে অবহেলা ছিল, সেটা আমরা যুক্তিতর্কসহ উপস্থাপন করেছি। কিন্তু সে বিষয়টি সামনে আসেনি। বিচারক পাঞ্জাবের একটি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এ রায়ে আসামিরা ন্যায়বিচারবঞ্চিত হয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।’

রায় শোনার পর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন আদালতে উপস্থিত আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতে এই রায় বহাল থাকলে তবেই শতভাগ সন্তুষ্ট হব। তবে এ রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয় সে দাবি জানাচ্ছি।’ 

আসামিদের স্বজনরাও গতকাল আদালতে হাজির হন। রায় শোনার পর কয়েকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁরা কথা বলতে চাননি। প্রিজন ভ্যানের সামনে ইশতিয়াক আহম্মেদ মুন্নার মা কুলসুম আরা সুলতানা বিলাপ করে বলেন, ‘আমার ছেলে ঘটনার সময় ছিল না।’ একই দাবি করেন অমিত সাহার মা দেবী সাহা। তিনি বলেন, ‘যে ঘটনার সময় বাড়িতে ছিল তারও বিচার করছে। ফেসবুকের পোস্টের কারণে আমার ছেলের বিচার হচ্ছে।’

ফিরে দেখা

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি থেকে অচেতন অবস্থায় আবরার ফাহাদ রাব্বীকে উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন আবরার ফাহাদ। শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন তিনি।

৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় আবরারের বাবা হত্যা মামলা করেন। ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর ২৫ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ২৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারের আদেশ দেন আদালত। এরপর গত বছরের ৫ অক্টোবর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। গত ৪ মার্চ তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত ১৪ নভেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।



সাতদিনের সেরা