kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

পদত্যাগ, প্রজ্ঞাপন একই দিনে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পদত্যাগ, প্রজ্ঞাপন একই দিনে

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান গতকাল পদত্যাগপত্র জমা দিলে তা অনুমোদন করেছেন রাষ্ট্রপতি। এর মাধ্যমে তাঁর মন্ত্রিত্বের অবসান ঘটল। গত রাতেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

এর আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মুরাদ হাসানের পদত্যাগপত্রের সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

বিজ্ঞাপন

সেখান থেকে অনুমোদনের পর তা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে পাঠানো হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, নারীদের প্রতি অবমাননাকর বক্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগ থেকেও বাদ পড়তে যাচ্ছেন মুরাদ হাসান। এরই মধ্যে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগ তাঁকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ কেন্দ্রে পাঠিয়েছে।

গত সোমবার দুপুরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান। চট্টগ্রামে পাঁচতারা রেডিসন ব্লু হোটেলে উঠেছিলেন তিনি। রাতে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাঁকে ফোন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা জানান। এরপর তিনি ঢাকায় ফেরেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে মুরাদ হাসান তাঁর জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে পদত্যাগপত্র পাঠান। পরে গিয়াস উদ্দিন তা প্রিন্ট করে সকাল ১১টার দিকে

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে যান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মূল পদত্যাগপত্র পাঠাতে বলা হলে মুরাদ হাসান লোক মারফত পদত্যাগের মূল কপি পাঠিয়ে দেন। তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের একান্ত সচিবের কাছে পৌঁছে বিকেল ৩টায়।

প্রধানমন্ত্রী বরাবর দেওয়া পদত্যাগপত্রে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ব্যক্তিগত কারণে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের আবেদন করেন মুরাদ হাসান। তবে পদত্যাগপত্রে নিজের নিয়োগ পাওয়ার সালটিও ভুল লেখেন মুরাদ।

দল থেকেও বহিষ্কার হচ্ছেন

মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর দলীয় পদও হারাতে যাচ্ছেন মুরাদ হাসান। গতকাল বিকেলে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় মুরাদ হাসনকে জেলা কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতির আবেদন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে পাঠানো হয়।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, জেলা কমিটির কোনো নেতাকে বহিষ্কারের এখতিয়ার কেবল কেন্দ্রীয় কমিটির। দল থেকে বহিষ্কারের পর জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুরাদ হাসানকে সংসদ থেকেও পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারে আওয়ামী লীগ।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, দলীয় শাস্তির একাধিক স্তর আছে। যেমন, পদ থেকে অব্যাহতি ও প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার। গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করতে হলে কারণ দর্শানো নোটিশ দিতে হয়। অভিযুক্ত সদস্যকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। তারপর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে অপরাধের মাত্রা, পারিপার্শ্বিকতা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, মুরাদ হাসানের বর্ণ ও নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ক্ষুব্ধ। নেতাদের কেউ মুরাদ হাসানের মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ তাঁকে সংসদ সদস্য রাখা হলে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন।

গতকাল সকালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে দলের আগামী কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে।

জেলার পদ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ কেন্দ্রে

আমাদের জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে ডা. মুরাদ হাসানকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। গতকাল সন্ধ্যায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। রাতেই এ সিদ্ধান্তের চিঠি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বরাবর পাঠানো হয়।

সভা শেষে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ বলেন, মুরাদ হাসান তাঁর সাম্প্রতিক বিব্রতকর, অসাংবিধানিক, অরাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আচরণের কারণে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। তিনি শেখ হাসিনার সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছেন। এসব কারণে জেলা আওয়ামী লীগের জরুরি সভায় মুরাদ হাসানকে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সভার এই সিদ্ধান্ত দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে রাতেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।  

২০১৫ সালের ২০ মে অনুমোদন পাওয়া জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে পদ পেয়েছিলেন মুরাদ হাসান।   

গত কয়েক মাসে মুরাদের পরিবর্তন লক্ষ করেছি : তথ্যমন্ত্রী

গতকাল সচিবালয়ে মুরাদ হাসানকে নিয়ে কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহ্মুদ। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে তাঁর মধ্যে আমি কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করেছি। তাঁর কিছু বক্তব্য ও ঘটনা সরকার এবং দলকে বিব্রত করেছে। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগ করার জন্য বলেছেন।

মুরাদ হাসান সংসদ সদস্য পদে থাকছেন কি না—জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য এবং বিষয়টি জাতীয় সংসদের।

শাহবাগ থানায় মামলার আবেদন

আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, গতকাল মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে একটি মামলার আবেদন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সাবেক জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া ও শামসুননাহার হলের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্যের অভিযোগ তুলে এ মামলার আবেদন করা হয়েছে। রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুন অর রশীদ এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ’

রংপুর ও সরিষাবাড়ীতে মুরাদের কুশপুত্তলিকা দাহ

আমাদের সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, মুরাদ হাসানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের খবরে তাঁর নির্বাচনী এলাকা জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে আনন্দ মিছিল, কুশপুত্তলিকা দাহ ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আল আমিন হোসাইনের নেতৃত্বে একটি আনন্দ মিছিল আরামনগর বাজার ট্রাক মালিক সমিতির মোড় থেকে শুরু করে উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীরা মুরাদ হাসানের কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আল আমিন হোসাইন বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের নির্যাতন করেছেন। তাঁর নানা অপকর্মে আমরা লজ্জিত ছিলাম, কিন্তু বলতে পারিনি। ’

পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মঞ্জুরুল ইসলামের নেতৃত্বে শিমলা বাজার থেকে আনন্দ মিছিল বের হয়। মিছিলটি আরডিএম স্কুল রোড ও বাস টার্মিনাল সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বঙ্গবন্ধু চত্বরে এসে শেষ হয়।

আমাদের পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি জানান, মুরাদ হাসানের আপত্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন ও কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে রংপুর মহানগর যুবদল ও ছাত্রদল। গতকাল মঙ্গলবার সকালে নগরীর গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচি থেকে মুরাদ হাসানকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।

সোমবার চট্টগ্রামে ছিলেন মুরাদ হাসান

চট্টগ্রাম থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, পদত্যাগের আগের দিন সোমবার চট্টগ্রামে অবস্থানের বিষয়টি গোপন রাখেন মুরাদ হাসান। তথ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর হোটেলে অবস্থানের বিষয়ে অবগত ছিল না জেলা প্রশাসন ও নগর পুলিশ প্রশাসন। গত সোমবার দুপুরে হোটেলে দুই বেডের একটি কক্ষ ভাড়া নেন মুরাদ হাসান। মঙ্গলবার সকালে এক বন্ধুর বাসায় যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু রাতেই হোটেল থেকে বের হয়ে যান তিনি।

জানতে চাইলে নগর পুলিশের উপকমিশনার (নগর বিশেষ শাখা) মনজুর মোরশেদ গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উনার চট্টগ্রামে আসার বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো প্রগ্রাম পাইনি। ’

অভিযোগ পেলে মুরাদ হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে ডিবি

চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহির সঙ্গে মুরাদ হাসানের ফাঁস হওয়া ফোনালাপের বিষয়ে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গতকাল দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে শুধু তথ্য প্রতিমন্ত্রী নয়, এই বিষয়ে জানতে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

হারুন অর রশীদ বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলতে গত সোমবার রাতে চিত্রনায়ক ইমন ডিবি কার্যালয়ে আসেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁর মোবাইল থেকে এ অডিও ফাঁস হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা এখনো তদন্ত করছি এটা। ’

সেদিন ফোনালাপের পরে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে এখনো আসেনি। আমরা প্রয়োজনে সবার সঙ্গেই কথা বলব। ’

হারুন অর রশীদ বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ যদি অভিযোগ করেন এবং আমাদের ডিবি সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ আসে তাহলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। মাহি এখন দেশের বাইরে। তিনি দেশে ফিরলে প্রয়োজনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

 



সাতদিনের সেরা