kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

এক ইনিংসে ১০ উইকেট

স্বপ্নের মুম্বাইতেই এজাজের কীর্তি

সাইদুজ্জামান   

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বপ্নের মুম্বাইতেই এজাজের কীর্তি

জিম লেকার ও অনিল কুম্বলের পর এজাজ প্যাটেল। টেস্ট ইতিহাসে তৃতীয় বোলার হিসেবে এক ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়লেন নিউজিল্যান্ডের এই বাঁহাতি স্পিনার। ছবি : এএফপি

আট বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে অকল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এরপর যতবার জন্মস্থান মুম্বাইয়ে এসেছেন, ততবার ওয়াংখেড়েতে খেলার স্বপ্ন নিয়ে ফিরেছেন এজাজ ইউনুস প্যাটেল। তাঁর আজন্ম সেই সাধ গতকাল পূর্ণ হয়েছে মুম্বাই টেস্টে ভারতের প্রথম ইনিংসের সব উইকেট নিয়ে। ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়া তৃতীয় বোলার নিউজিল্যান্ডের এই বাঁহাতি স্পিনার। তবে পারফেক্ট টেন-এর অনার্স বোর্ডে জিম লেকার ও অনিল কুম্বলের নিচে থেকেও রোমান্টিসিজমের সবচেয়ে বড় ঢেউ তুলেছেন এজাজ প্যাটেল।

শুরুতে বলে নেওয়া ভালো, মাত্রই একাদশ টেস্ট খেলতে নামা এজাজ প্যাটেলের ক্যারিয়ার ইংল্যান্ডের জিম লেকার কিংবা ভারতের কুম্বলের মতো ঝকমকে হতে না-ও পারে। ৩০ বছর বয়সে অভিষিক্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নিউজিল্যান্ডারের বয়স এখনই তেত্রিশ। ওদিকে ৬১৯ উইকেট নেওয়া কুম্বলে এখনো সবচেয়ে বেশি টেস্ট জেতানো ভারতীয় বোলার। আর ৪৬ টেস্টে ২১.২৪ গড়ে ১৯৩ উইকেট নেওয়া জিম লেকারের ওপর বাজি ধরেই ১৯৫৬ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে শুকনো উইকেট তৈরি করেছিল ইংল্যান্ড। প্রথম ইনিংসে ৯ এবং পরেরটায় অস্ট্রেলিয়ার সব উইকেট নিয়ে এই ইংরেজ অফস্পিনার যে রেকর্ড গড়েছেন, তা এখনো অক্ষত। টেস্ট বাদ দিন, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই লেকারের ১৯ উইকেটের পর সেরা ১৭ উইকেট। সেখানে এজাজ প্যাটেলকে সর্বশেষ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স উড়িয়ে এনেছিল নেট বোলার হিসেবে।

তবে ইনিংসে ১০ উইকেট পাওয়ার ব্যাপারটা তো আর শুধু বোলিং সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে না, ভাগ্যও লাগে। ১৯৯৯ সালে দিল্লি টেস্টে কুম্বলের কীর্তি গড়া পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের আরেক স্পিনার হরভজন সিংও বোলিং করেছিলেন। ১৯৫৬ সালের অ্যাশেজের আগে ফিঙ্গার স্পিন খেলায় অনভ্যস্ত অস্ট্রেলিয়াকে বিপাকে ফেলার পরিকল্পনায় লেকারের পাশাপাশি বাঁহাতি স্পিনার টনি লককেও রেখেছিল ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে লেকার যে উইকেটটি পাননি, সেটি যথারীতি টনি লকের। ওয়াংখেড়েতে ভারতের ১০৯.৫ ওভারের ইনিংসে টিম সাউদি, কাইল জেমিসন কিংবা উইলিয়াম সমারভিলের ভাগ্যে এক-দুইটা উইকেট তো জুটতেই পারত। বিরামহীন নিখুঁত লাইন ও লেন্থে বোলিংয়ের পুরস্কার মেলে ঠিকই, তবে সেটিও পারফেক্ট টেন ভাগ্যবানদেরই জোটে। সেই তিনি লেকার কিংবা কুম্বলে—যিনিই হোন না কেন।

সামর্থ্যে লেকার এবং কুম্বলের সমকক্ষ নিজেকেও ভাবছেন না এজাজ প্যাটেল। নির্দিষ্ট দিনে সাবেক দুই গ্রেটের সমানই ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদ পেয়েছেন এই নিউজিল্যান্ডার। তবে ঘুরেফিরে যুক্তির নানা অলিগলি ঘুরে এজাজের কীর্তিকে অবিশ্বাস্য মনে হতে বাধ্য।

স্পিন বোলিং ভারতীয়দের চেয়ে আর কোনো দেশ বেশি ভালো খেলার দাবি এখনো করেনি। এই বিবেচনায় বাঁহাতি স্পিনার এজাজ প্যাটেল আগের দুই কীর্তিমানের চেয়ে দুটা নম্বর বেশি দাবি করতেই পারেন। ইনিংসে প্রথমবার ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়া লেকার বোলিং করেছিলেন স্পিন সহায়ক উইকেটে এবং এমন এক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, যাদের কাছে ফিঙ্গার স্পিনার তখন চরম বিস্ময়। আর দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা কুম্বলের বরাবরের প্রিয়। নাম বদলে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম হলেও এটা কুম্বলের মৃগয়াভূমি হিসেবেই স্মরিত হয়, ৭ টেস্টে মাত্র ১৬.৭৯ গড়ে যে ৫৮ উইকেট সাবেক এই ভারতীয় লেগস্পিনারের!

কুম্বলের সঙ্গে একটা জায়গায় অবশ্য মিল আছে এজাজ প্যাটেলের। দুজনেরই ক্রিকেটজীবন শুরু হয়েছিল মিডিয়াম পেসার হিসেবে। মিডিয়াম পেস বোলিং করেই অকল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে টিম সাউদির সঙ্গে যৌথ সর্বোচ্চ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। তবে এজাজ দ্রুতই বুঝে গিয়েছিলন যে ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতা দিয়ে ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। এরপরই ১৯৯২ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বোলিং সূচনা করা দীপক প্যাটেলের কাছে স্পিন বোলিংয়ের দীক্ষা নিয়েছেন এজাজ। একাদশ টেস্টে এসে গড়েছেন ইতিহাস।

মোহাম্মদ সিরাজের উইকেট তুলে পারফেক্ট টেন কীর্তি গড়ার পরের দৃশ্যটা অভাবিত—ভারতের ড্রেসিংরুমের সামনে বসে থাকা রবিচন্দ্রন অশ্বিন দাঁড়িয়ে হাততালিতে অভিনন্দিত করছেন এজাজকে। ওয়াংখেড়ের গ্যালারিও অভিবাদন জানিয়েছে ‘ঘরের ছেলে’কে। ক্রিকেটীয় চর্চায় এটা নিখাদ স্পোর্টসম্যানশিপ। কিন্তু ‘সাবেক’ হলেও শৈশবে ভিন দেশে পাড়ি জমানো এজাজ ইউনুস প্যাটেল তো মুম্বাইকারই!

তাই ১৯৫৬ সালের পর ১৯৯৯ পেরিয়ে ২০২১ সালের ৪ ডিসেম্বরের গল্পের আবেগ একটু বেশিই। স্বপ্নের মাঠে এমন ঘোরলাগা অভিষেকের আর কোনো ইতিহাস নেই। গ্রেটনেসে অনীল কুম্বলে এবং জিম লেকার যতই এগিয়ে থাকুন, এজাজ প্যাটেলের লোকগাঁথা অনন্য হয়েই থাকবে।



সাতদিনের সেরা