kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

১৫০ দখলদার

বরগুনার খাকদোন নদ খেয়ে ফেলছেন তাঁরা

মিজানুর রহমান, বরগুনা   

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বরগুনার খাকদোন নদ খেয়ে ফেলছেন তাঁরা

খাকদোন নদ। বরগুনা শহরের উপজেলা পরিষদের সামনের অংশে বালু ফেলে দখল করে নিয়েছে একটি চক্র। ছবিটি গত ফেব্রুয়ারিতে তোলা। গতকাল পর্যন্ত এই চিত্র বদলায়নি। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরগুনার সঙ্গে দেশের অন্য অঞ্চলের নৌযোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম খাকদোন নদ। দখল, দূষণ আর নাব্যতা সংকটে এখন এই নদ। দখলদারদের মধ্যে আছেন স্থানীয় প্রভাবশালী, সাবেক জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী। এঁদের তালিকা করে প্রশাসন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করলেও পরে তা থেমে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দখলের কারণে খাকদোন নাব্যতা হারাচ্ছে। এই নদের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে এর সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১৫টি প্রাকৃতিক খালও মরে যাবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিষখালী-পায়রা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদের ১৫ কিলোমিটার মরা খালে পরিণত হয়েছে। বাকি ৯ কিলোমিটার নদের অস্তিত্ব থাকলেও মাত্র ছয় কিলোমিটার কোনো রকম নৌচলাচলের জন্য সচল আছে। দখলের কারণে ওই ছয় কিলোমিটার নদও সংকুচিত হয়ে গেছে।

কার্গোচালক (সুকানি) সানাউল্লাহ বলেন, ভাটার সময় পানি কম থাকায় খাকদোন নদে ঢোকা যায় না। জোয়ারের জন্য দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিষখালী নদীতে নোঙর করে অপেক্ষা করতে হয়।

বিআইডাব্লিউটিএর বরগুনা নদীবন্দর কর্মকর্তা মামুন অর রশিদ বলেন, ‘নদের দক্ষিণ পারে ১৫০ জন অবৈধ দখলদার রয়েছেন। নিয়ামতি এলাকায় বিষখালী নদীতে খননকাজ চলছে। সেখানে কাজ শেষ হলে খাকদোন নদের খনন শুরু হবে।’ 

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, বরগুনা নদীবন্দর সচল রাখতে প্রায় প্রতিবছর সরকার খাকদোন নদের ছয় কিলোমিটার এলাকা খনন করে। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছর নদটি খনন করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই আবার জোয়ারে পলি এসে ভরাট হয়ে যায়। পাশাপাশি দুই পাশ দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদটি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, একসময় খাকদোন প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার চওড়া ছিল। এই নদ দিয়ে একসময় বড় বড় পণ্যবাহী জাহাজ চলত। তবে বছরের পর বছর দুই তীর দখলের কারণে নদ সরু হয়ে আসছে। নদটি বিপন্ন হলে বরগুনার পরিবেশ ও ব্যবসা-বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়বে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খাকদোন নদের দক্ষিণ পারের পোটকাখালী এলাকা থেকে মাছ বাজার ব্রিজ পর্যন্ত অনেকগুলো অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। শহরের কাঠপট্টি এলাকায় নদ দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে কাঠ বাজার।

বরগুনা-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী ফারহান-৮ লঞ্চের মাস্টার শামীম হোসেন বলেন, বরগুনা ঘাট থেকে বিষখালী মোহনায় যেতে স্বাভাবিকভাবে ১০ থেকে ১২ মিনিট লাগে। কিন্তু নাব্যতা সংকটে এখন সময় লাগে ৫০ মিনিট। এ ছাড়া লঞ্চ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হয়।

দখলদার যাঁরা

শহরের ক্রোক থেকে মাছ বাজার পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় বিআইডাব্লিউটিএর তালিকায় ১৫০ জন দখলদারের নাম রয়েছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন বরগুনা পৌরসভার সাবেক মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি উপজেলা পরিষদের সামনে তাঁর তিনতলা ব্যক্তিগত কার্যালয়ের পেছনে নদ ভরাট করেছেন। আবার ক্রোক এলাকায় নদ ভরাট করে বালু ও পাথরের ব্যবসা করছেন।

শাহাদাত হোসেন স্বীকার করেন, উপজেলা পরিষদের সামনে ও ক্রোক এলাকায় তাঁর দুটি স্থাপনা রয়েছে। এতে নদের কিছু অংশ পড়েছে। প্রশাসন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলে তিনি ওই অংশ ছেড়ে দেবেন।

তালিকায় বরগুনা জেলা বণিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জহিরুল হক পনুর নামও আছে। তিনি নদ দখল করে দুটি স্থাপনা করেছেন। তবে জহিরুল বলেন, তিনি নদ দখল করে কোনো অবৈধ স্থাপনা করেননি। তিনি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ডিসিআর নিয়েছেন। তবে তা নবায়ন করা নেই। যখনই প্রশাসন চাইবে তিনি স্থাপনা সরিয়ে নেবেন।

দখলদারদের তালিকায় আরো আছেন বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবুল হোসেন তালুকদার, বরগুনা রাইফেল ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মোল্লা, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলম মোল্লার মেয়ের জামাই বাদল খান, পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফারুক সিকদার, সাবেক বিএনপি নেতা রুস্তম আজাদ, ব্যবসায়ী জসিম, মিলন মৃধা, নাজিম আলী প্রমুখ।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারুক সিকদার দাবি করেন, তিনি নদের জমি দখল করেননি। ২০ বছর আগে তাঁর নামে জমি ছিল। এখন নেই। সেই জমিতে অন্য একজন ঘর তুলে বসবাস করছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বরিশাল বিভাগের সমন্বয়কারী লিংকন বাইয়ান বলেন, ‘নদের দুই পার অবৈধ দখলের কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পলি জমে নদ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমরা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আইনের আশ্রয় নেব।’

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী কাইছার আলম বলেন, খাকদোন নদের উৎসস্থল থেকে পায়রা নদী পর্যন্ত খনন হবে। এ নিয়ে তাঁদের একটি সমীক্ষা কমিটি কাজ করছে।

জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, নদ খনন করে মাটি ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। জায়গা পেলে দ্রুত খননকাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে ইউপি নির্বাচন শেষ হলেই অবৈধ দখল উচ্ছেদ শুরু হবে।



সাতদিনের সেরা