kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এখন রাজনৈতিক সমস্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এখন রাজনৈতিক সমস্যা

ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা বলে অভিহিত করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের ফলে গত ৫০ বছরে দারিদ্র্য ব্যাপক কমেছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে। আর কোনো দেশে বৈষম্য বেড়ে গেলে কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে টাকা পাচারও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর এক হোটেলে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। তিনি সেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সম্মেলটি ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এবারের সম্মেলনের উদ্দেশ্য—দেশের আর্থ-সামাজিক ইস্যুতে করা গবেষণাগুলোর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়নের লক্ষ্য ঠিক করা।

প্রধানমন্ত্রী লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। আমাদের সরকারের ধারাবাহিক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের কারণে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের স্তরে পৌঁছতে চাই। এ লক্ষ্যে আমরা রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন শুরু করেছি। রূপকল্প-২০৪১ অর্জনের জন্য প্রয়োজন মেধা ও শ্রমের যথাযথ সমন্বয়। এ প্রেক্ষাপটে আগামী তিন দিনব্যাপী বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।’

অধিবেশনে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করতে গবেষণার ওপর জোর দিয়ে অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত প্রবাস আয় ও রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছে। প্রবাস আয়ের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

পোশাক খাতের হাত ধরে বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি

পৃথক অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, পোশাক খাতের হাত ধরে বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও অনেক ক্ষেত্রে অপশাসন রয়েছে। সুশাসনকে পাশ কাটানো হয়েছে। এসব কারণে রানা প্লাজা, তাজরীন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকরা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় কাজ করছেন।

রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমাদের বেসরকারি উদ্যোক্তারা সফল ভূমিকা পালন করেছে। গত ৪০ বছরে ওষুধ, চামড়া, শিপবিল্ডিং, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প বিকাশ লাভ করেছে। তবে আমাদের রপ্তানি ক্ষেত্র বহুমুখীকরণ করতে হবে।’

রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাজারে ভালো একটি অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। করোনাকালে অনেক ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছে।’ এ সময় তিনি এনজিওগুলোর ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। এতে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। তারা সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে।

রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলা করা। আগামী দিনের ব্যবসার ধরন নিয়ে চিন্তা করা। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে কী করণীয়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা।

বাংলাদেশে আঞ্চলিক বৈষম্য নেই

সম্মেলনে আরেক অধিবেশনে ‘বাংলাদেশ ইন কমপারেটিভ পারসপেক্টিভ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএস মহাপরিচালক বিনায়েক সেন। তিনি বলেন, গত ৩০ বছরে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে নানা খাতে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। উৎপাদন খাতের অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, নগরায়ণসহ নানা খাতে প্রতিবেশীদের পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।

বিনায়েক সেন বলেন, ভারতের তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, কেরালা যেভাবে এগিয়ে গেছে; উত্তর প্রদেশ ও বিহার সেভাবে এগিয়ে যায়নি। এটা যেন ভারতের মধ্যে অন্য ভারত। একইভাবে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে, ঠিক সেভাবে পিছিয়েছে বেলুচিস্তান। কিন্তু বাংলাদেশে এমন বৈষম্য নেই।

প্রণোদনার কারণে বেড়েছে জিডিপি

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ‘বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু বৈষম্য বাড়ছে। তবে আমি মনে করি, পরবর্তী বাজেটে সরকারকে উচ্চাভিলাষী চিন্তাধারা বাদ দিতে হবে। কারণ এটা করতে গিয়ে আমাদের ঋণের মুখে পড়তে হয়। যা মোটেও সুখকর নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘করোনাকালীন বাংলাদেশে জিডিপি বেড়েছে, তার অন্যতম কারণ বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে সরকারের অর্থ বিতরণ।’

আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, “গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ বদলে গেছে। গত এক দশক ‘গেম চেঞ্জার’ দশক ছিল। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন হচ্ছে।”

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমি হাওরের ছেলে। গ্রামীণ উন্নয়নে আমি কাজ করছি। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, কমিউনিটি ক্লাব, হাওর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রকল্পে আমি বেশি নজর দিয়ে থাকি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এসব খাতে নজর দেওয়ায় বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।’

সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রমুখ। তিন দিনব্যাপী এবারের সম্মেলনে মোট ২৭টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। আজ দিনব্যাপী সাতটি সেশনে ১৩টি প্রবন্ধ প্রকাশ করা হবে। 



সাতদিনের সেরা